স্কুটি ফিরে পেয়ে আপ্লুত শাহনাজ, পুলিশের পক্ষ থেকে পেলেন উপহারও

৪:২৩ অপরাহ্ন | বুধবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৯ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা- রাইট শেয়ারিং এ বাইক চালানো সংগ্রামী নারী শাহনাজ আক্তারের চুরি যাওয়া বাইকটি উদ্ধার করে তার কাছে হস্তান্তর করেছে তেজগাঁও পুলিশ। বুধবার তেজগাঁও ডিসি অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে স্কুটিটি তাকে হস্তান্তর করা হয়।

এ সময় দুদিন ধরে রাইড শেয়ার করতে না পারার কারণে তেজগাঁও ডিভিশনের পক্ষ থেকে তার বাচ্চাদের জন্য ১০ হাজার টাকা উপহার দেয়া হয়।

এর আগে রাতেই অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে শাহনাজ আক্তারের স্কুটিটি উদ্ধার করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে প্রতারক জনিকে আটক করা হয়।

রোজগারের একমাত্র অবলম্বন ফিরে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন শাহনাজ। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ছিনতাই হওয়া স্কুটি ফিরে পেয়ে ‘স্কুটি না, যেন আমি আমার রিজিক ফিরে পেয়েছি। পুলিশ এত দ্রুত আমার বাইক ফিরিয়ে দিয়েছে। এজন্য আমি বাংলাদেশ পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞ।

আমি ইন্ডিয়ান চ্যানেলের ক্রাইম পেট্রোল সিরিজ দেখেছি, এমন উদ্ধার অভিযান শুধু টিভিতে হয় জানতাম। বাস্তবে পুলিশ রাতারাতি এমন একটি অভিযান করে আমার রিজিক ফিরিয়ে দিতে পারবে, এটা আমার বিশ্বাস ছিল না। স্কুটি ফিরে পেয়ে আমি খুবই খুশি।

এর আগে উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার সাংবাদিকদের বলেন, জনি নামের এক যুবকের সঙ্গে শাহানাজ আক্তার পুতুলের সখ্যতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে শাহনাজের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে স্থায়ী চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখায় ছিনতাইকারী জনি। তার ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (১৫ জানুয়ারি) এয়ারপোর্ট ও তালতলাসহ বিভিন্ন শাহনাজ ও জনি ঘোরাঘুরি করে, বিকেল ৩ টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ফুটপাতের টং দোকানের সামনে তারা দুজনে চা পান করেন।

এ সময় জনি, শাহনাজের কাছ থেকে স্কুটি চালানোর নিয়ম কানুন শেখার কথা বলে জন্য চাবি নেন। চাবি নেওয়ার পর স্কুটি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলে, তাৎক্ষণিকভাবে শেরেবাংলা নগর থানা স্কুটি উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে। পরে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে জনিকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে ছিনতাইকৃত স্কুটিসহ জনিকে গ্রেফতার করা হয়।

ডিসি বিপ্লব কুমার বলেন, আইনগত যতটুকু সহযোগিতা দেওয়ার আমরা দিয়েছি। তবে সামাজিকভাবে তেঁজগাও পুলিশের পক্ষ থেকে এই উদ্যমী নারীকে ১০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

আরও পড়ুন-

শাহনাজের স্কুটি ইস্যুতে ফেসবুকজুড়ে প্রশংসায় ভাসছে পুলিশ প্রশাসন

রবিউল ইসলাম (রবি), সময়ের কণ্ঠস্বর- জীবিকা হিসেবে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং বেছে নেওয়া শাহনাজ আক্তার পুতুলকে এরই মধ্যে অনেকে চিনে থাকবেন। মাত্র দুই মাস ধরে এ পেশায় আসলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন তিনি।

দেশে সম্প্রতি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং সেবা জনপ্রিয় হলেও নারী বাইকারদের সংখ্যা এখনও অত্যন্ত সামান্য। রাজধানীতে যে কয়েকজন নারী এই সেবার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন, তাদের মধ্যে সাহসী এই নারী বাইকার অন্যতম।

এর পেছনে কারণও রয়েছে, প্রধান হলো- বাইক শেয়ারিংয়ে নারী-পুরুষে তিনি ভেদাভেদ করতেন না।  গত ১১ জানুয়ারি অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট রাফিউজ্জামান শাহনাজের জীবন সংগ্রাম নিয়ে ফেসবুকে একটি পোষ্ট করেন, যেটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। তারপর থেকে আরও প্রশংসার জুয়াড়ে ভাসতে থাকেন জীবন যুদ্ধে জয়ী এই শাহনাজ।

তবে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর শেরে বাংলা নগর থানাধীন খামারবাড়ি এলাকা থেকে তার উপার্জনের একমাত্র সম্বল বাইকটি কৌশলে ছিনতাই করে নেন দুই দিন আগে পরিচয় হওয়া জনি নামে এক যুবক।

যেই বাইক দিয়ে রাইড শেয়ারিংএর অর্থে দুই সন্তানের লেখাপড়াসহ পুরো পরিবার চলছে, সেই বাইকটি হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন শাহনাজ আক্তার। বাইকটি উদ্ধারের চেষ্টায় মাথায় হেলমেট পরেই পাগলের মতো বিভিন্ন মহলে ছুটে বেড়াতে থাকেন। চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে, মোবাইল ফোনেও ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না তিনি।

পরে জীবন সংগ্রামী এই নারীর বাইক ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। বিপুল প্রতিক্রিয়া তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। অনেকেই পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করেন দ্রুত ব্যবস্থা নেবার জন্য। পাশাপাশি উপার্জনের একমাত্র সম্বল হারানো এই শাহানাজকে সম্মিলিতভাবে নতুন একটি বাইক কিনেও দিতে চান। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীও এ নিয়ে ফেসবুকে পোষ্ট করেন।

রাতে ফেসবুকে অনেকেই যখন শাহানাজের বাইক কিনতে অর্থ দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করছেন, তখনই জানা গেল শাহনাজ আক্তারের চুরি হওয়া স্কুটিটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে আটক করেছে প্রতারক জনিকে।

জানা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি চৌকস দল মোবাইলফোন ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে লোকেশন নিশ্চিত হয়ে প্রথমে সেই প্রতারক জনিকে গ্রেফতার করে। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার রঘুনাথপুর এলাকা থেকে স্কুটিটি উদ্ধার করে।

এদিকে শাহনাজের বাইকটি পুলিশ উদ্ধার করার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসন। তারা বলছেন পুলিশ চাইলে সবই সম্ভব, শুধু দরকার একটু স্বদিচ্ছার।ব

বুধবার দুপুরে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ফেসবুকে লিখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ। বলেছিলাম না! আমাদের সুদক্ষ পুলিশ প্রশাসন পারবে… ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ। আর ছাত্রলীগকে বোনটি পাশে পাবে যেকোনো যৌক্তিক প্রয়োজনে।

অরণ্য শোয়েভ নামে এক আইনের ছাত্র লিখেছেন, এর চেয়ে বড় খুশি একজীবনে আর কি পাওয়া যায়, ধন্যবাদ পুলিশ প্রশাসনকে। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব স্বপ্নগুলো, হারিয়ে যাক সব কান্না।

আনিদ্য মামুন নামে এক বিনোদন সাংবাদিক লিখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ, বাইকটি পাওয়া গেছে। তেজগাঁও জোনের এডিসিসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ ভাইদের ধন্যবাদ। যারা শাহনাজ আপাকে সহায়তা করতে চেয়েছিলেন, বড় মনের পরিচয় দেখিয়েছেন- সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা..

কাকন কুড়ি নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, শাহানাজের বাইক উদ্ধার করার জন্য “ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ” পুলিশ চাইলে কি না সম্ভব ? শুধু দরকার একটু স্বদিচ্ছার।।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, শাহনাজ একটি সংগ্রামী নাম। আমরাও খুব গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে অভিযান চালিয়ে স্কুটিটি উদ্ধার ও প্রতারককে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছি।

উল্লেখ্য, শাহনাজের জন্ম রাজধানীর মিরপুরেই। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, বাবা নেই, মা আর বোনেরা আছেন। ২০০০ সালে পরিবারের অমতে বিয়ে করেন একই এলাকার এক যুবককে। কিন্তু দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি, ছাড়াছাড়িও হয়নি।

দুই মেয়েকে নিয়ে মা–বোনদের সহায়তায় দিন যাচ্ছিল তাঁর। এক মেয়ে নবম ও এক মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। খুবই কষ্টে দিন যাচ্ছিল। অগত্যা বাইক নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন জীবনসংগ্রামে।