🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ শুক্রবার, ১১ আষাঢ়, ১৪২৮ ৷ ২৫ জুন, ২০২১ ৷

দাতের ইমপ্লান্ট চিকিৎসাঃ কেন, কোথায়, কিভাবে করবেন? খরচ কত ?

teeth implant teatment
❏ শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৯ আপনার স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্য ডেস্ক- দাঁতের আধুনিক চিকিৎসায়, হারানো দাঁত প্রতিস্থাপনে ডেন্টাল ইমপ্লান্ট এখন বেশ নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। সাফল্যের হার প্রায় ৯৬ শতাংশেরও বেশি হওয়ায় দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়ছে।

ডেন্টাল ইমপ্লান্ট কী ?

ডেন্টাল ইমপ্লান্ট হলো টাইটানিয়াম বা টাইটানিয়াম সংকর ধাতুর ছোট স্ক্রু, যা হারানো দাঁত প্রতিস্থাপনে ব্যবহূত হয়। টাইটানিয়াম হলো একমাত্র ধাতু, যা আমাদের দেহ কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই গ্রহণ করে এবং হাড়কে এর চারপাশে বাড়তে দেয়। শরীরে টাইটানিয়াম আরও অনেক চিকিৎসায় ব্যবহার হয়, যেমন-এর প্লেট ও স্ক্রু ভাঙা হাড় জোড়া দিতে বা শরীরের কৃত্রিম জোড়া সন্ধি বানাতে ইত্যাদি।

কীভাবে কাজ করে আমাদের দাঁতের দুটো অংশ। একটি রুট বা শেকড়, যা হাড়ের ভেতর থাকে আর অন্যটা ক্রাউন বা মুকুট, যা আমরা দেখতে পাই। দাঁতের শেকড় দাঁতকে হাড়ের সঙ্গে ধরে রাখে এবং শক্ত ও মজবুত রাখে। আর মুকুট অর্থাৎ যাকে আমরা দাঁত বলি তা দিয়ে আমরা খাদ্য চর্বণ ও পেষণ করি। ডেন্টাল ইমপ্লান্টেরও দুটো অংশ।

একটা টাইটানিয়াম স্ক্রু, যা হাড়ের মধ্যে বসানো হয় এবং অন্যটা এর ক্রাউন বা দাঁত, যা টাইটানিয়াম স্ক্রুর ওপর বসানো হয়। এই টাইটানিয়াম স্ক্রু হাড়ের মধ্যে বসানো হলে তা হাড়ের সঙ্গে জোড়া লেগে যায় এবং দাঁতের শেকড়ের মতো কাজ করে; যার ওপর পরে কৃত্রিম দাঁত বসানো হয়। দেখা যাচ্ছে, টাইটানিয়াম ইমপ্লান্ট সব দিক থেকেই আমাদের স্বাভাবিক দাঁতের মতো আর এটা কাজও করে স্বাভাবিক দাঁতের মতোই।

কারা নেবেন এই চিকিৎসা?

যাদের মুখের হারানো দাঁত আছে, তাদের জন্যই ডেন্টাল ইমপ্লান্ট। যদিও হারানো দাঁতকে অনেকভাবে প্রতিস্থাপন করা যায়, যেমন-ডেন্টাল ব্রিজ বা ডেনচারের মাধ্যমে। কিন্তু ব্রিজ করতে যেমন ভালো কিছু দাঁত কাটতে হয়, ডেন্টাল ইমপ্লান্ট বসাতে সে রকম কিছুই করতে হয় না।

যাদের দাঁত নেই যাদের মুখে কোনো দাঁত নেই, তারা সাধারণত বাঁধানো দাঁতের পাটি বা কমপ্লিট ডেনচার ব্যবহার করে; যা আকারে বেশ বড় হওয়ায় অনেক সময় মুখে ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে, ভালোমতো খাওয়া-দাওয়া তো দূরের কথা। এসব রোগীর জন্য ডেন্টাল ইমপ্লান্ট আশীর্বাদস্বরূপ।

ডেন্টাল ইমপ্লান্টের ওপর বসানো পুরো দাঁতের পাটি শুধু সুদৃঢ় আর মজবুতই নয়, আকারেও অনেক ছোট হওয়ায় রোগীর জন্য আরামদায়কও বটে। যারা আগে প্রচলিত ডেনচার দিয়ে শুধু নরম ধরনের খাবারই খেতে পারত, তারা ইমপ্লান্টের ওপর বসানো ডেনচার দিয়ে আবার স্বাভাবিক খাবার ।

যাঁরা মুখ ও দাঁতের যত্ন সঠিকভাবে নেন না, তাঁদের তো বটেই, এমনকি যাঁরা নেন, তাঁদেরও দাঁত পড়ে যায়। বিশেষ করে ক্যারিজ হয়ে বহু সময়ই দাঁত এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, আর তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। মাঢ়ির অসুখের (জিনজিভাইটিস ও পেরিওডন্টাইটিস) কারণেও দাঁত হারানোর ঘটনা ঘটে।প্রয়োজন হলে সুস্থ প্রতিটি মানুষের মুখেই ইমপ্লান্ট বসানো যায়। মাঢ়ির সুস্থতা এবং চোয়ালের হাড়ের সঠিক পুরুত্ব থাকলে ইমপ্লান্ট সফল হয় বেশি।

যাঁরা মুখ ও দাঁত ঠিকমতো পরিষ্কার রাখেন না, যাঁদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে ইমপ্লান্ট করতে বাধা নেই) ও হার্টের অসুখ আছে, কিংবা যাঁরা ক্যান্সারের জন্য রেডিওথেরাপি (মুখ, ঘাড় ও চোয়ালের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে) নিচ্ছেন, যাঁরা চেইন স্মোকার, তাঁদের ইমপ্লান্ট না করাই ভালো।

একসময় এসব ক্ষেত্রে নকল দাঁত (ডেনচার) বসানো ছাড়া বিকল্প ছিল না। পরে ডেন্টাল ক্রাউন (ক্যাপ) ও ব্রিজ তৈরি করা সম্ভব হয়। ক্যাপ ব্রিজ স্থায়ীভাবে প্রতিস্থাপন করা হয় বলে খোলার বিড়ম্বনা থাকে না। তবে তাতেও এমন কিছু অসুবিধা আছে, যা রোগীদের মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

যেমন, ব্রিজ স্থায়ীভাবে বসাতে হলে পাশে থাকা ভালো দাঁতকে সাপোর্ট হিসেবে নিতে হয়, যা বহু ক্ষেত্রেই অসুবিধা সৃষ্টি করে। ডেন্টাল ইমপ্লান্ট আবিষ্কৃত হওয়ার পর সেই অসুবিধাটা দূর হয়েছে। পাশের দাঁত বা দাঁতগুলোকে সাপোর্ট (অ্যাবাটমেন্ট) হিসেবে ব্যবহার না করে হাড়ের ভেতর কৃত্রিম শিকড় (টাইটানিয়াম) বসিয়ে দিব্যি আসল দাঁতের মতো দাঁত তৈরি করা যায়, ব্যবহারও করা যায় তেমনভাবেই। উন্নত দেশগুলোতে এই ইমপ্লান্ট শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর ধরে।

গত কয়েক বছরে ইমপ্লান্ট পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের দেশে আগে ইমপ্লান্ট হতো না। কিন্তু এখন হচ্ছে; এবং উন্নত বিশ্বের মতো একই পদ্ধতিতে। ইমপ্লান্ট বিষয়ে দেশের বেশ কয়েকজন ডেন্টিস্ট বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।

ইমপ্লান্টের সুবিধা 

ইমপ্লান্ট দেখতে এবং ব্যবহার করতে আসল দাঁতের মতোই। দাঁত যেভাবে মাঢ়ির হাড়ের সঙ্গে শিকড়ের মাধ্যমে লাগানো থাকে, ইমপ্লান্টও একইভাবে বসানো হয়।

অনেকেই ডেনচার (নকল দাঁত) ব্যবহারের কারণে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চারণও যথাযথ হয় না। ইমপ্লান্টে এ ধরনের কোনো অসুবিধা হয় না। বাড়তি দাঁত লাগানো হয়েছে_এমন অস্বস্তিও লাগে না। * নকল দাঁত ব্যবহারে অনেকেরই খেতে অসুবিধা হয়। কিন্তু ইমপ্লান্টের ক্ষেত্রে তা হয় না। পাশের দাঁতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

ইমপ্লান্ট স্থায়ী পদ্ধতি। তাই বারবার বদলানোর প্রয়োজন হয় না। সাধারণত সারা জীবনই ব্যবহার করা যায়।প্রয়োজন হলে সুস্থ প্রতিটি মানুষের মুখেই ইমপ্লান্ট বসানো যায়। মাঢ়ির সুস্থতা এবং চোয়ালের হাড়ের সঠিক পুরুত্ব থাকলে ইমপ্লান্ট সফল হয় বেশি। তবে যাঁরা মুখ ও দাঁত ঠিকমতো পরিষ্কার রাখেন না, যাঁদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে ইমপ্লান্ট করতে বাধা নেই) ও হার্টের অসুখ আছে, কিংবা যাঁরা ক্যান্সারের জন্য রেডিওথেরাপি (মুখ, ঘাড় ও চোয়ালের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে) নিচ্ছেন, যাঁরা চেইন স্মোকার, তাঁদের ইমপ্লান্ট না করাই ভালো।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ থেকে কিছু সচরাচর জিজ্ঞাসা ও উত্তর

অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় এ পদ্ধতির বিশেষত্ব কী?

বিশেষত্বের মধ্যে যেহেতু এটা সর্বাধুনিক পদ্ধতি, খুব দক্ষ না হলে এটি করা ঝুঁকিপূর্ণ। আর রোগীদের ক্ষেত্রে  সাধারণ মানুষ অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকে যে কোন পদ্ধতিটা সঠিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে যদি পেটের কোনো অস্ত্রোপচার করা হতো, পুরো পেট কাটা হতো। এখন করা হয়  কেবল ড্রিল করে। তেমনি দাঁতের ক্ষেত্রেও এ রকম নতুন পদ্ধতি এসেছে। কাটাকাটি যত কম করা যায় এ রকমভাবে। সুতরাং একটি দাঁত নেই, এর জন্য আপনে পাশের আরো ভালো দুটো দাঁতকে ত্যাগ করলে, এটা আধুনিক বিজ্ঞান সম্মতি দেয় না। এই জন্য ইমপ্ল্যান্টকে এখন সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য করা হয়। বিশ্বে ও আমাদের দেশেও এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু হয়েছে।

ইমপ্ল্যান্ট করার জন্য রোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনারা কী করে থাকেন?

যেকোনো সার্জারির ক্ষেত্রে রোগীর কিছু পূর্বাবস্থা আছে। যেমন রোগীর স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা আছে কি না, এটা বিবেচনায় আনতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস অন্যান্য রোগ যেগুলো আছে, সেগুলোরে ক্ষেত্রে কিছু কিছু সার্জারির সীমাবদ্ধতা থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রোগী বয়সেরও একটি বিষয় আছে।

সেই জিনিসগুলো একটু বিবেচনায় থাকে। এই চিকিৎসা সারা বিশ্বেই অন্যান্য চিকিৎসার তুলনায় ব্যয়বহুল। বাংলাদেশেও এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এটি কম। এটা অত্যন্ত একটি আশাব্যঞ্জক বিষয়।

কত দিনে  পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হয় ?

প্রথমত, আমরা রোগী নির্বাচন । এটি করে একটি সময় রোগীকে বলে দেয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এটি এত সহজ একটি দাঁত তুলতে যতটুকু কষ্ট না হয়, তার চেয়েও বিষয়টি সহজ। অনেক কঠিন সার্জারি দুই-তিন ঘণ্টাও লেগে যায়। সে ক্ষেত্রে প্রথমে জায়গাটিকে নির্বাচন করা হয় , স্থানীয় অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে। ড্রিল করা হয়। এরপর ইমপ্ল্যান্টের আকার কী, কত ডায়ামিটারের লাগবে এটা আগে থেকেই দেখা হয়।

তার আগে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেয়া  হয়। এরপর প্রথম সার্জারি। দ্বিতীয়বার এক সপ্তাহ পরে, দুই সপ্তাহ পরে, তিন সপ্তাহ পরে। এরমধ্যে একটি হিলিং ক্যাপ লাগানো থাকে, সেটা খুলে আসল ফিক্সারটা বসিয়ে দেয়া হয় ।এরপর  তার ওপর মাপ  ক্রাউন করে দেয়া হয়,  এটা শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক দাঁতের মতোই থাকে ।

এটা ঠিক স্বাভাবিক দাঁতের মতোই তো হবে?

আসলে প্রাকৃতিক জিনিসের কোনো বিকল্প নেই। ইমপ্লান্ট প্রাকৃতিকের কাছাকাছি হতে পারে। সে জন্য বলা হয়, এ পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দাঁত প্রতিস্থাপনের জন্য।