• আজ ২৬শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ময়নাতদন্তের অপেক্ষায় লাশ,  সুখ নিদ্রায় আরএমও (ভিডিও সহ)!

❏ শুক্রবার, এপ্রিল ২৬, ২০১৯ ঢাকা
Gazipur

পলাশ মল্লিক, বিশেষ প্রতিনিধি: হাসপাতালের মর্গের সামনে না খেয়ে লাশ গ্রহনের অপেক্ষায় নিহতের ছোট ভাই এবং স্বজনরা। ময়না তদন্তের পর লাশ দেয়া হবে তাদের। পুলিশের পক্ষ থেকে সকল কাগজপত্রের কাজ সম্পন্ন করার পরও হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে লাশ বুঝে না পেয়ে অপেক্ষা করছেন নিহতের স্বজনরা। ১৫ঘন্টা যাবৎ তাদের এ অপেক্ষা!

গতকাল(২৫এপ্রিল)বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের সালনা ফরেস্ট অফিসের সামনে রাস্তা পারাপাড়ের সময় ময়মনসিংহগামী এনা পরিবহনের গাড়ি চাপায় নিহত হন শিমুলতলী মাইক্রো স্ট্যান্ডে ২০ বছর ধরে জুতা সেলাই ও কালি করে জীবিকানির্বাহ করা শ্যামলাল রবিদাস(৪৭)। গাড়ির চাপায় মাথা থেতলে যাওয়া শ্যামলাল ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পুলিশ ঘটনা স্থল থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করে রাত নয়টার দিকে গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। নান্দাইল শহরের হতদরিদ্র বুধুলাল রবিদাসের ছেলে শ্যামলাল রবিদাস দক্ষিণ সালনা এলাকায় স্ত্রী ও কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন।

দূর্ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই হাসপাতালের মর্গের সামনে হাজির হন নিহতের স্বজনরা। রাতে লাশের ময়নাতদন্ত না করায় তারা অপেক্ষা করতে থাকেন হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই। রাত পেরিয়ে ভোর, সকাল গড়িয়ে দুপুর কিন্তু প্রিয়জনের লাশটি নিতে পারেনি শ্যামলালের পরিবার। শুক্রবার সকাল ৯টায় পুলিশ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে নিহতের স্বজনদের সাথে নিয়ে থানার আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করে দিলেও হাসপাতালের অবহেলার কারণে লাশ নেয়া সম্ভব হয়নি তাদের।

নিহতের স্বজনদের দাবি পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হয়েছে। নিহতের আর্থিক অবস্থার কথা জেনে নিহতের স্বজনদের পুলিশের পক্ষ থেকে সকালের নাস্তার ব্যবস্থাও করা হয়। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১টা ৩০মিনিট পর্যন্ত লাশের ময়না তদন্ত না করায় হাসপাতাল কতৃপক্ষের সেবার বিষয়টি তাদের শতভাগ নিরাশ করেছে। প্রচন্ড গরমের লাশের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে বলেও তারা জানান। তাদের মতে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকায় লাশ ঠিক রাখার জন্য যেসকল ব্যবস্থা গ্রহন করার দরকার তা তারা করতে পারবেন না। তাছারা লাশটি ময়মনসিংয়ের নান্দাইলে নিতে সময়ও লাগবে। সার্বিক দিক বিবেচনায় প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে যায় সময়ের কণ্ঠস্বর। এ বিষয়ে কথা বলতে আরএমও প্রণয় ভূষণ দাসের রুমের সামনের বারান্দার তিন পাশের গেটে তালা ঝুলতে দেখে বিভিন্ন পথ ঘুরে তার রুমের সামনে গিয়ে রুমের দরজা একটু খুলে ভিতরে তাকালে তার চেয়ার খালি দেখা যায়। রুমের ভিতরে অন্যকেউ আছেন কিনা তা দেখতে দরজা আরেকটু খুলতেই দেখা যায় আরএমও প্রণয় ভূষণ দাস পাশের সোফাতে ঘুমাচ্ছেন। দরজায় নক করে প্রণয় কুমারের ঘুম ভাঙ্গিয়ে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করেন সময়ের কণ্ঠস্বরের বিশেষ প্রতিনিধি। সাংবাদিক পরিচয় পেতেই ঘুম থেকে উঠে বসেন তিনি। শ্যাম লালের বিষয়ে কথা বলতেই তিনি বলেন, বার বার মর্গে যাওয়া সম্ভব না। “নিহতের স্বজনদের লাশ পাবার অপেক্ষার চেয়ে প্রণয় ভূষণের মর্গে যাওয়া যে অনেক বেশি কষ্টের তা তার কথাতেই পরিষ্কার হয়ে যায়”।  গতকাল রাত নয়টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত এ দীর্ঘসময় কেন লাশের ময়না তদন্ত হলো না কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন ২টার দিকে করে দিব। দীর্ঘ সময় ময়না তদন্তের কাজটি না হলেও সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার ২৫ মিনিটের মধ্যে ময়নাতদন্তের কাজ শেষ করেন তিনি। সাংবাদিকরা মর্গের সামনে নিহতের স্বজনদের সাথে আলাপ কালে ১টা ৪৫ মিনিটে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই প্রণয় ভূষণ জানিয়ে দেন ময়নাতদন্তের কাজ শেষ। মর্গ সহকারী (ডোম) মোহাম্মদ আলী কোথায় যেন গেছে, তিনি আসলে লাশ নিতে পারবেন।

দায়িত্ব ফেলে কর্মস্থলে ঘুমানো প্রসঙ্গে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) প্রণয় ভূষণ দাস বিকেল পাঁচটা ৫৩ মিনিটে মুঠোফোনে সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, “শুক্রবার দিন, বন্ধের দিনতো তাই একটু রেস্টে (বিশ্রাম) ছিলাম”। ঘুমের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কোথায় ঘুমাইলাম ভাই? শেষ পর্যন্ত তিনি ঘুমননি বলে দাবি করেন। ময়নাতদন্ত প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ‘লাশ মর্গে আসার কথা তাকে জানানো হয়নি। তিনি আরো বলেন, ময়নাতদন্ত করার দায়িত্ব হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের। আমি তাদের সহযোগীতা করি। শুক্রবার দিনগুলোতে বা বিভিন্ন বন্ধের দিনগুলোতে আমি ফরেনসিক বিভাগকে সহযোগীতা করে থাকি।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আমীর হোসাইন রাহাত সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, “আজ ছুটির দিন হলেও আরএমও সাহেবের ডিউটি সার্বক্ষণিক। অফিসে তো ঘুমানোর জায়গা না, ডেফিনেটলি এটা অনুচিত।”

তিনি বলেন, ‘আজ আমি ছুটিতে আছি। আগামিকাল অফিসে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেব। যদি আরএমওর কর্র্তব্যে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করব।’

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুদক এখনও অভিযান পরিচালনা করেনি। না জেনে, না দেখে তো বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর দেখা যাবে।