• আজ ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

‘আমার লাশের পাশে যেন মাহিবী আসতে না পারে’

❏ শনিবার, এপ্রিল ২৭, ২০১৯ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কন্ঠস্বর, ঝালকাঠি- ঢাকা ইডেন কলেজের সমাজ কল্যাণ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরিক্ষার্থী ঝালকাঠির মেয়ে মেধাবী সায়মা কালাম মেঘা (২১) আত্মহত্যার ঘটনায় একটি তিন পৃষ্ঠার সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে আত্মহত্যার ঘটনায় মাহিবী ও তার মা সেলিনা বেগমকে দায়ী করা হয়েছে।

শুক্রবার রাতে মেঘার ব্যবহৃত কাপড়ের লাগেজের ভেতর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে তার এ সুইসাইড নোট উদ্ধার করে মেঘার বাবা আবুল কালাম।

এর আগে গত রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকার কাঁঠালবাগান এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এর চারতলা বাড়ির চতুর্থ তলার একটি কক্ষ থেকে গলায় ফাঁস লাগানো তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

মেঘার বাবা আবুল কালাম বলেন, মেয়ের মৃতদেহের সাথে কলাবাগানের বাসা থেকে ব্যবহৃত কাপড়সহ মেঘার লাগেজ বাড়িতে নিয়ে আসি। মেঘার দাফনের পর মেয়ে হারানোর শোকে ওর লাগেজ আর খোলা হয়নি। মেঘার মা লাগেজটি দেখে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাই কাপড়গুলো গরিব মানুষকে দেয়ার জন্য ওর লাগেজ খুলি এবং লাগেজের ভিতর ছোট্ট ভ্যানিটি ব্যাগে আমার মেয়ের লেখা তিন পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাই। চিঠিতে ও সব লিখে গেছে। আমার মেয়েটারে মাহিবী ও তার মা সেলিনা বেগম বাঁচতে দেয় নাই।

সুইসাইড নোটে মেঘা লিখেন, ‘আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মাহীবি আর তার মা আমাকে বাঁচতে দেয়নি। আমি বার বার মাহীবির কাছে কুত্তার মতো গিয়েছি। অথচ সে আমাকে পায়ে ঠেলে তাড়িয়ে দিয়েছে। মাহিবির মা-বোন আমাকে যা-তা বলেছে। আমাদের রিলেশন এমন পর্যায় চলে গেছে যে আমি আর ফিরে আসতে পারলাম না। আব্বু-আম্মু আমাকে মাফ করে দিও। আমার লাশের আশপাশেও যেন মাহীবি আসতে না পারে।’

মেঘা আরও লিখেছেন, ‘আল্লাহ মানুষকে মেয়ে দেয়। কিন্তু সবাইকে মেয়ে দেয়া উচিত নয়। আল্লাহ যাদের অনেক টাকা-পয়সা দেয়, শুধু তাদেরই যেন মেয়ে দেয়। তাহলে আমার মতো গরিবের মেয়ে নিয়ে ওরা খেলতে পারবে না।’

এতে আরও লিখেছেন, ‘আম্মু আমি জানি আমি ছাড়া তোমার আর কেউ নেই। কিন্তু আজ আমি নিরুপায়। তুমি মুক্তা চাচিকে জিজ্ঞেস করে দেখিও আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাই আজকে আমি আত্মহত্যা করলাম। আমার ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করিও, যেন আমার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারে। আর মা তুমি, আব্বুকে সামলাইও। আব্বুকে বুঝাইও, আমি নিরুপায় হয়ে আত্মহত্যা করেছি। ইতি মেঘা।’

জানা যায়, তিন বছর ধরে ইডেন কলেজের ছাত্রী ঝালকাঠির সায়মা কালাম মেঘার সঙ্গে বরিশাল হাতেম আলী কলেজের ছাত্র ঝালকাঠির মাহিবী হাসানের প্রেমের সম্পর্ক। প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে তারা পারিবারিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও বাধা হয়ে দাঁড়ান মাহিবীর মা সেলিনা বেগম। মায়ের বাধায় মেঘাকে বিয়ে করতে টালবাহানা শুরু করেন মাহীবি।

একাধিকবার বিয়ের দিন নির্ধারণ আবার পরিবর্তন করে নতুন কৌশল অবলম্বন করেন মাহিবী ও তার পরিবার। বিষয়টি নিয়ে মাহিবীর সঙ্গে একাধিকবার বাগবিতণ্ডা হয় মেঘার। রোববারও (২১ এপ্রিল) বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে প্রেমিককে ভিডিও কলে রেখে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন মেঘা। ভিডিওতে প্রেমিকার করুণ মৃত্যু দেখেও মন গলেনি প্রেমিক মাহিবীর। মেঘার মৃত্যুর পর সহপাঠী আফরিন জাহান ও মেঘার মা রুবিনা আজাদকে ফোন দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি জানান মাহিবী।

এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বৃহস্পতিবার মেঘার বাবা আবুল কালাম আজাদ ঝালকাঠির সার্কিট হাউজ সংলগ্ন তার বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করে মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনার বর্ণনা দেন। এ সময় মেঘার মা রুবিনা আজাদ ও চাচা আবুল বাসার উপস্থিত থেকে সায়মার মৃত্যুর জন্য প্রেমিক মাহিবি হাসান ও তার মা সেলিনা বেগমের তদন্ত পূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এর আগে ওই ঘটনায় কলাবাগান থানায় মেঘার চাচা একটি মামলা দায়ের করেছেন। এতে তিনি মাহিবী ও তার পরিবারের সদস্যদের অভিযুক্ত করেছেন।

এদিকে ঘটনার পর থেকে প্রেমিক মাহিবী ও তার মা সেলিনা বেগম ঝালকাঠির বাসায় তালা লাগিয়ে পলাতক রয়েছে।