• আজ ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ঘূর্ণিঝড় ফণী: জীবন বাঁচাতে শহরের দিকে ছুটছে বাগেরহাটের উপকূলবাসী

❏ শুক্রবার, মে ৩, ২০১৯ খুলনা, দেশের খবর

শেখ সাইফুল ইসলাম কবির, স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট: উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মানুষের মনে আতঙ্কের নাম সাইক্লোন সিডর। ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে ভয়াবহ সেই সিডর। সিডরের প্রভাবে নদীতে পানি বেড়ে গিয়ে ডুবে, গাছের চাপায় ও ঘরের নিচে পড়ে মারা গেছে অসংখ্য মানুষ। পানিতে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়েছে নদীতে। ভয়াবহ সেই স্মৃতি কেউ আজও ভুলতে পারেনি। আর এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো উপকূলীলের মানুষগুলোই। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’ এমন অবস্থা হয়েছে ‘সিডর’ বিধ্বস্ত শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলাবাসীর।

সাইক্লোন সিডরের পর ঘূর্ণিঝড় নার্গিস, আইলা, হ্যারিকেন, মোরা এবং বর্তমানে ঘূর্ণিঝড় ফণী নাম নিয়ে আর্ভিভাব হয়েছে সাগরে। যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে উপকুলে। এ কারনে জীবন বাঁচাতে নদীরপাড় ও চরাঞ্চলে বসবাস করা মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বরগুনা শহরে আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য আসা শুরু করেছে।

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বাগেরহাট জেলা আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়েছিল। বলেশ্বর নদের জলোচ্ছ্বাসে শরণখোলা উপজেলায় ব্যাপক প্রাণহানী হয়েছিল। গৃহহীন হয়ে পড়েছিল কয়েক লাখ মানুষ। রাস্তার দু’পাশের গাছপালা উপড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল বাগেরহাট। সরকারী হিসাবে সিডরে মারা গিয়েছিল ৯০৮ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। তবে বেসরকারী হিসাবে প্রাণহানীর সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজারের বেশী। সিডরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুন্দরবন।

সরকারী হিসেবে সিডরের আঘাতে বাগেরহাট জেলায় ৬৩ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছিল। আহত হয়েছিল ১১ হাজারের বেশী মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৮২টি পরিবার, ৩৬৭ কি:মি পাকা রাস্তা, ৮৬২ কি: মি: কাঁচা সড়ক, প্রায় ৬৫ কি:মি: বাঁধ এবং ৭৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মংলা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শরণখোলা উপজেলা এবং এই উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়ন। সিডরের পর সরকারীভাবে জেলায় মোট ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা হয়েছিল ৪৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

শুক্রবার (৩ মে) সকালে মোরেলগঞ্জ সদর উপজেলারগ্রাম থেকে রওয়ানা করে খুলনা শহরের এক আত্মীয় বাড়ীতে এসেছেন রিজিয়া বেগম ও তার পরিবার। তিনি ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর সাইক্লোন সিডরে ঘর হারিয়েছেন। তাই সেই ভয়কে কেন্দ্র করে আগেই তারা এলাকা ছেড়েছেন।

বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী সাউথখালী গ্রামের লিপি বেগম জানান, আমার স্বামী সিডরে মারাগেছে। আমি পরিবারের কাউকে আর হারাতে চাইনা। সেজন্য ছেলে-মেয়ে নিয়ে প্রাণে বাঁচতে আত্মীয় বাড়ি বাগেরহাট এসেছি। ঘূর্ণিঝড় কমলে আবার বাড়ি চলে যাবো।

একই গ্রামের শাহজাহান খান ও রিপন হাওলাদার বলেন, ছেলে-মেয়ে ও ভাই সিডরে হারাইছি। নদী ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি-জায়গা জমি সব গেছে। এহন ভূমিহীন হয়ে রাস্তার পাশে থাকতে হয়।

বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী উত্তর সাউথখালী গ্রামের ছত্তার ফকির বলেন, ‘পোলা মাইয়্যাসহ ঘরবাড়ি সব হারিয়ে নিঃস্ব জীবন কাটছে কোন মতে। সরকার ও এনজিও থেকে সহযোগিতা পেয়ে বছরের ৬ মাস খেয়ে পড়ে থাকতে হয়। কিন্তু মোগো কেউ কাজের ব্যবস্থা করে দেয় না। মোর ভাইবাগাররা কাজ করতে ঢাকা ও চিটাগাং চলে গেছে। মোগো যদি এহন নিত্য কাজ দেয় তাহলে খেটে পরে জীবন বাছবে’।

একই গ্রামের শাহজাহান খান ও রিপন হাওলাদার বলেন, ছেলে-মেয়ে ও ভাই সিডরে হারাইছি। নদী ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি-জায়গা জমি সব গেছে। এহন ভূমিহীন হয়ে রাস্তার পাশে থাকতে হয়। যদি কমংস্থানের সুযোগ হইতো তাহলে জমি কিনে থাহার ঘর বানাইতাম। মোগো এহন সাহায্যে লাগবে না, কাজ করার জায়গা কইর‌্যা দিবে সরকার। এভাবে অনেক পরিবার এখন কর্মসংস্থানের জন্য তাকিয়ে আছে ওই এলাকার মানুষ।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ২৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। জেলা সদরসহ নয়টি উপজেলায় একটি করে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে এবং ৭৫টি ইউনিয়নে ৭৫টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ফণীর নিকটবর্তী এলাকায় বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার মানুষের জীবন ও জানমাল রক্ষা করতে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ভবনও প্রস্তুত করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বারবার মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।

সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিলসহ রেড ক্রিসেন্ট, ফায়ার সার্ভিস ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কয়েক শত স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসবের পাশাপাশি জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য জেলার সর্বত্র মাইকিং করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে।।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং এর কাছাকাছি দ্বীপ ও চরগুলো ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। অপরদিকে কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতর আরও জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা,বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, এবং এর কাছাকাছি দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা,বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, জেলা এবং এর কাছাকাছি দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিসহ ঘন্টায় ৯০ থেকে ১১০ কি. মি. বেগে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, বাংলাদেশের উপকূলে শুক্রবার সন্ধ্যায় আগে কিংবা পরে আঘাত হানবে ফণী। ওই সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে মাঝারি থেকে বড় আকারের ঝড় বয়ে যাবে।