‘পরপুরুষের কাছে আমি আর এসব বলতে বলতে পারছি না, আমায় ক্ষমা করো’

১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, মে ১৯, ২০১৯ দেশের খবর, রাজশাহী

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- অপহরণের পর আসামির স্বজনের হুমকি আর অপমানে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আকতার বর্ষা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

চলে যাবার আগে বর্ষা লিখেছিল- ‘নিজের লজ্জার কথা বার বার সবাইকে বলতে বলতে আমি নিজের কাছে অনেক ছোট হয়ে গেছি। প্রতিদিন পরপুরুষের কাছে আমি আর এসব বলতে বলতে পারছি না। অপরাধীকে শাস্তি দিলেই তো আর নিজের মানসম্মান ফেরত পাব না। তাই আমাকে ক্ষমা করো।’

আত্মহত্যার আগে নিজের লেখা চিঠিতে মা-বাবার উদ্দেশ্যে এসব কথা লিখেছে জেলার মোহনপুর উপজেলার বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আকতার বর্ষা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মোহনপুর উপজেলা সদরের নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে সে আত্মহত্যা করে।

এদিকে মোহনপুর থানা পুলিশ শুক্রবার রাতে সুমাইয়ার বাবা আব্দুল মান্নানের মামলায় তিনজনকে আটক করেছে। এরা হলেন, সকিনা বেগম, খালাতো ভাই রাব্বি ও খালু রাসেল।

এর আগে গত ২৭ এপ্রিল পুলিশ সুমাইয়াকে উত্যক্তকারী মুকুল হোসেন ও তাকে সহায়তাকারী সুমাইয়ার বান্ধবীকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠায়। ঘটনার পর থেকে আসামির পরিবারের লোকজন প্রতিনিয়ত সুমাইয়া ও পরিবারের লোকজনকে গালাগাল করছিল।

সুমাইয়ার বোন জানান, বাকশিমুল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া স্কাউট দলের সেকেন্ড ক্যাপ্টেন ছিল। স্কুলে যাতায়াতের সময় প্রায় ৬ মাস ধরে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল পাশের বাড়ির আনিস উদ্দিনের ছেলে মুকুল। তার প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে বিষয়টি সুমাইয়া বাড়িতে জানিয়েছিল। তারা উপজেলা নারী ভাইস চেয়ারম্যানকেও এ ঘটনা জানিয়েছিলেন। তবে তারা ভাবতেই পারেননি, সুমাইয়াকে অপহরণ করার মতো ঘটনা ঘটাবে মুকুল।

তিনি আরও জানান, গত ২৩ এপ্রিল প্রাইভেট পড়তে যেতে চায়নি সুমাইয়া। তার সহপাঠী প্রতিবেশী সোনিয়া অনেকটা জোর করেই সেদিন তাকে নিয়ে যায়। এরপর সোনিয়া বাড়ি ফিরলেও সুমাইয়া আসেনি।

পুলিশ জানায়, ওই দিন সন্ধ্যায় স্থানীয়রা খানপুর বাগবাজার এলাকা থেকে সুমাইয়াকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। সুমাইয়াকে উদ্ধার করে প্রথমে মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়।

নিহতের পারিবার থেকে জানানো হয়, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সুমাইয়া পুকুরে গোসল করতে গেলে আসামি পক্ষের লোকজন তাকে কটূক্তি করে। সুমাইয়া বাড়ি ফিরে বিষয়টি মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের জানায়। পরে বিকেল চারটার দিকে সুমাইয়া খাতায় মা-বাবার উদ্দেশ্যে চিঠি লেখে।

চিঠিতে সুমাইয়া লিখেছে, ‘প্রিয় মা-বাবা, প্রথমেই তোমাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। তোমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছি, অনেক আদর, অনেক ভালোবাসা। কিন্তু একটা মেয়ের কাছে তার মানসম্মানটাই সবচেয়ে বড়।’

এ চিঠি লেখার পর পাশের শোবার ঘরে বাঁশের আড়ার সঙ্গে গলায় ওড়নার ফাঁস দিয়ে সুমাইয়া আত্মহত্যা করে। পরে পরিবারের সদস্যরা তার লাশ উদ্ধার করে।

সুমাইয়ার মা ফরিদা বেগম বলেন, সুমাইয়া বাড়ি ফিরে তাদের জানায়, সহপাঠী সোনিয়া তাকে প্রাইভেট পড়ার জন্য ডেকে নিয়ে যায়। পরে সে রুমাল দিয়ে তার নাক ধরে। এরপর সুমাইয়া অচেতন হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরে সে নিজেকে বাড়ি থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে বাগবাজার এলাকায় দেখতে পায়। নিজের শরিরে থাকা জামার বদলে অন্য জামা দেখতে পায়। তার পাশে তখন অভিযুক্ত মুকুল ও দেলোয়ার নামের একজন ভ্যানচালক ছিল। তবে পুলিশ অপহরণ মামলায় দেলোয়ারকে আসামি করেনি। জামা বদল থাকায় ধারণা করা হচ্ছিল, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।

ফরিদা বেগম আরও বলেন, ২৭ এপ্রিল মামলার পর মুকুলকে গ্রেফতার করা হলে শুরু হয় চরম গালাগাল ও হুমকি। আসামিরা বাড়ি এসে মেয়েদের এসিড নিক্ষেপের হুমকি দেয়। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। গত বৃহস্পতিবার গোসল করতে গেলে সুমাইয়াকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দেওয়া হয়। এতে অভিমানে মেয়েটি আত্মহত্যা করে।

সুমাইয়ার বাবা আবদুল মান্নান বলেন, ‘বাইরে বের হলে তার মেয়েকে বাজে কথা শুনতে হতো। আমাদেরও বাজে কথা শুনতে হতো। মেয়ে বলত, বাবা, আমার জন্য তোমাদের বাজে কথা শুনতে হচ্ছে। ওরা বলে, আমার কারণে নাকি বোনদের বিয়ে হবে না।’