• আজ ২৯শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ডাবল সেঞ্চুরির পথে পেঁয়াজ, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ দাম বাংলাদেশে

১:৪৫ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- নানা পদক্ষেপের পরও পেঁয়াজের দামের পাগলা ঘোড়ার রাস কিছুতেই টেনে ধরতে পারছে না সরকার। এবার ঘূর্ণিঝড় বুলবুলকে ইস্যু বানিয়ে এই নিত্যপণ্যটির দাম আরেক দফা বাড়িয়ে দিয়েছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী।

গতকাল বুধবার দেশি পেঁয়াজ পাইকারিতে কেজি ১৬৫ ও খুচরায় ১৯০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, এই দাম দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও সর্বোচ্চ। জানা গেছে, বাংলাদেশের পর শ্রীলঙ্কায় ১৬০, পাকিস্তানে ১৪০ ও ভারতে ৬০-৬৫ টাকায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ভারতীয় পেঁয়াজ না আসা পর্যন্ত দাম বাড়বে। যদিও দেশটি থেকে পুরনো ও সংশোধিত ঋণপত্রের (এলসি) পেঁয়াজ ছাড়ের বিষয়ে আগামীকাল শুক্রবার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে দেশটির বাজারেও পেঁয়াজের দাম চড়া এবং তারাও পণ্যটি আমদানি করছে।

এদিকে মিসর ও তুরস্ক থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের বড় তিনটি চালান কয়েক দিনের মধ্যে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যে পেঁয়াজ পাইকারিতে ৪০-৪১ টাকায় বিক্রির কথা আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত দাম না মানার পরও অভিযান বন্ধ রাখায় রেকর্ড দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে বলে ক্রেতাদের অভিযোগ।

এদিকে গত মঙ্গলবার শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মোহাম্মদ হুমায়ূন পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আছে দাবি করার পর দাম আরও বাড়ছে বলে অনেকে মনে করছেন। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্পআয়ের মানুষ। অবস্থা এমন যে, বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব জায়গায় এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পেঁয়াজ’। যারা আগে বাজারে গিয়ে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতেন তারা এখন কিনছেন এক কেজি।

অনেকেই আবার বলছেন, পেঁয়াজ না খেলে কি হয়? পেঁয়াজ ছাড়া কি রান্না হয় না? অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করলেও দাম এতটা বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারণ বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে রয়েছে।

মালিবাগ বাজারের খোরশেদ বাণিজ্যালয়ের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের পর পেঁয়াজের দাম আবারও বেড়েছে। সরবরাহ কম থাকায় আমরাই পেঁয়াজ পাইনি। অন্যান্য সময় তিন-চার বস্তা করে কিনলেও মঙ্গলবার দেশি ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ পেয়েছি কেবল দুই বস্তা করে।

একই বিষয়ে আবার ভিন্নমত পোষণ করেছেন অন্য বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলেও বাজারে পণ্য মজুদের ওপর তার প্রভাব পড়তে অন্তত দুই থেকে তিন দিন সময় লাগার কথা। অথচ ঝড়ের পরদিনই পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে একটি সিন্ডিকেট। এর পেছনে আমদানিকারক ও দুষ্ট ব্যবসায়ী চক্রের কারসাজি তো আছেই; সেই সঙ্গে সরকারের ব্যর্থতাও রয়েছে।

তাদের মতে, সরকার বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করলেও তা আমলে নেয়নি আমদানিকারকরা। দফায় দফায় বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তারা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখানে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কারসাজি তেমন একটা নেই। আমদানিকারকদের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী তারা পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। তবে রাজধানীর বেশকিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী, বিশেষ করে শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা আমদানির পর দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়িয়ে বাজারে পেঁয়াজ ছেড়েছেন।

শ্যামবাজারের লাকসাম বাণিজ্যালয়ের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান অবশ্য বলেন, আমদানিকারকরা বিভিন্ন সময়ে সরবরাহ কমিয়ে, চালান দেরি করে দাম বাড়িয়েছেন। তার পর তারা যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেই বাড়তি দামেই বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। সেগুলো পাইকারি বাজারে পৌঁছানোর পর আবারও দাম বাড়িয়েছে কিছু লোভী ব্যবসায়ী। চালান কম থাকায় শেষ দিকে পাইকারি বাজারে সব আড়তদার পেঁয়াজও পাননি। এ সুযোগে সেই লাভের গুড় খেতে মরিয়া হয়ে উঠছে অনেকে।

এ বিষয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক ও শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি আবদুল মাজেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আড়তে মালই নেই, দাম দিয়ে কী হবে? ১৪০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ কিনে কেউ তো ৯০ টাকায় বিক্রি করতে পারবে না। মিয়ানমারেরও এখন কেনা পড়ছে ১২৫ টাকা দামে। কিন্তু বিক্রি করতে বলছে ৮৫ টাকায়। ব্যবসায়ীরা কি এখন লোকসান দিয়ে বিক্রি করবে? অথচ সরকারের থেকে বলা হয়েছে নির্ধারিত দামে না বেচলে জেল জরিমানা। তাই অনেকেই পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অবস্থা আরও খারাপ হবে। আমার ধারণা, ভারতের পেঁয়াজ বাজারে না ঢুকলে দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর কমতে পারে ডিসেম্বরে নতুন পেঁয়াজ উঠলে।’

পাইকারিতে দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর খুচরা বাজারে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, একেক বাজারে একেক রকমের দাম। এমনকি একই বাজারেও দামের পার্থক্য রয়েছে। এসব দোকানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১৮০-১৯০, মিয়ানমারের ১৬০-১৭০ ও মিসরের ১৫০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

পেঁয়াজের এই সংকট শুরু হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার পর। দুই সপ্তাহ আগেই অবশ্য দেশটি ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ৮৫০ ডলার বেঁধে দেয়। ভারতীয় পেঁয়াজ বন্ধের পর দেড় মাস হতে চলল, ব্যবসায়ীরা তাকিয়ে আছেন, কবে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর আমদানি করা পেঁয়াজ দেশে পৌঁছায়। অবশ্য তা-ও দু-চার দিনে আসছে না। সব মিলিয়ে মানুষকে ভুগতে হতে পারে আরও সপ্তাহ দুয়েক।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান একসময় বাণিজ্যসচিব ছিলেন। এরপর এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চেয়ারম্যান পদে চাকরি করেছেন। তিনি দু-একবার পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা ছাড়াতে দেখেছেন, তবে ১৫০ টাকার বেশি নয়।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, সীমিত আয়ের মানুষের মোট আয়ের ৪০ শতাংশ যায় বাড়িভাড়ায়। বাকি টাকার ৮০ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে তারা। দাম বেড়ে গেলে ধার-কর্জ, সঞ্চয় কমানো অথবা বাজার করা কমানো ছাড়া উপায় থাকে না। তিনি বলেন, মূল্যবৃদ্ধির মূল শিকার গরিব মানুষ।