• আজ ৩রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রংপুর জেলা ও মহানগর আ’লীগের সম্মেলন কাল, সিলেকশন নয় ইলেকশন চায় তৃণমূল

২:০৪ অপরাহ্ন | সোমবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৯ দেশের খবর, রংপুর

সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর প্রতিনিধি- রংপুর মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা বিরাজ করছে। সিলেকশন নয় ইলেশনের মাধ্যমে পছন্দের নেতা নির্বাচিত করতে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে নানান হিসাব নিকাশ শুরু হয়েছে।

দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আগামীকাল রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সম্মেলনে ক্লিন ইমেজ নিয়ে কে হচ্ছেন জেলা-মহানগরের সভাপতি ও সম্পাদক এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সম্মেলন ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে নগরীর দেওয়ানবাড়ি রোডের মহানগর আওয়ামী লীগ ও বেতপট্টিস্থ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়।

সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ সমর্থকদের নিয়ে গোপনে বৈঠক করে দল ভারী করার চেষ্টা করছেন। আর এজন্য কার্যালয়ে প্রভাব দেখাতে কিছু নেতাকে সামনে-পেছনে কর্মী বাহিনী নিয়ে চলাফেরা করতেও দেখা যাচ্ছে নিয়মিত। পদ প্রত্যার্শী নেতারা কেন্দ্রিয় নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে তৃণমূলের কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন নিয়মিত।

অনেক প্রার্থীই ইতিমধ্যেই ওয়ার্ড সভাপতি-সম্পাদকের মাধ্যমে কাউন্সিলরদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন। ফলে কে হচ্ছেন নতুন কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক তা নিয়ে দলের নেতাকর্মীসহ রংপুরের সর্বত্রই চলছে আলোচনা। সম্মেলনকে ঘিরে রংপুরের আওয়ামী রাজনীতির চিত্রই যেন পাল্টে গেছে।

এদিকে সম্মেলনে পদ প্রত্যাশীরা ব্যাপক শোডাউন করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে কাজ করছেন। নগরীর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পোষ্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে নিজের ছবিসহ দলীয় নেতৃবৃন্দের ঝুলিয়ে প্রচারনা চালানো হচ্ছে। তবে এবারে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় হাইকমান্ড নেতাদের অতীত কর্মকান্ডের হিসাব-নিকাশ করছেন। ফলে বর্তমান নেতৃবৃন্দের অনেকেই আতঙ্কে আছেন। যাদের অতীত কর্মকা- নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে পূর্বে আর্থিক অবস্থা এবং বর্তমান আর্থিক সম্পদের উৎস কী তা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। এমন খবর পাওয়া গেছে দলের কেন্দ্রীয় একটি বিশ্বস্ত সূত্রে।

শুধু তাই নয় বর্তমান সরকারের সফলতা সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচার প্রচারনায় বর্তমান নেতৃত্ব কেমন ভূমিকা রেখেছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দলীয়ভাবে চাঁদাবাজি, প্রভাব দেখিয়ে সরকারি কাজে টে-ারবাজি, চাকরির নামে টাকা হাতিয়ে নেয়া, বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্বে থেকে প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করার সাথে জড়িত থাকাসহ নানা কর্মকা- এবারের নেতা নির্বাচনে গুরুত্ব পাবে। এমনটি বলছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও। তবে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে বর্তমান জেলা ও মহানগর নেতৃত্ব সম্পর্কে হতাশাও আছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল মঙ্গলবার রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে রংপুর জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে দলের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির। সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন আওয়ামীলীগের সভাপতি ম-লীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন।

এতে প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখবেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ এইচএন আশিকুর রহমান এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেলন হক ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এছাড়াও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

এদিকে সম্মেলনকে সফল করতে সকল প্রস্তুুিিত সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই অর্থ উপ-কমিটি, মঞ্চ-সাজসজ্জা ও শৃঙ্খলা উপ-কমিটি, আপ্যায়ন উপ-কমিটি, অভ্যর্থনা উপ-কমিটি, প্রচার উপ-কমিটি, দপ্তর উপ-কমিটিসহ বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করে নেতাকর্মীদের মাঝে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া হয়েছে।

এবারের কাউন্সিলে আওয়ামীলীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী, পারিবারিক ইতিহাস ও বিগত সময়ের দলের জন্য ত্যাগীদের মুল্যায়ন করা হবে। এই সম্মেলনে রংপুর মহানগরীর ৩৩ ওয়ার্ড কমিটির সাড়ে ৪শত জন ও জেলার আট উপজেলার সাড়ে ৩শত জন কাউন্সিলর রয়েছে। কাউন্সিলরা তাদের ভোট অথবা মতামতের ভিত্তিতে রংপুর মহানগর ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নির্বাচিত করবেন। এদিকে রংপুর মহানগর ও জেলায় নতুন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক কে হবেন এমন আলোচনা চলছে নেতাকর্মীসহ চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে হাটবাজারের সর্বত্রই।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রংপুর মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদক পদে দুই ডজন নেতার নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান জেলা কমিটির কোষাধ্যক্ষ-রংপুর চেম্বার আব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম বর্তমান মহানগর কমিটির সভাপতি সাফিয়ার রহমান সাফি, সহ-সভাপতি কায়সার রাশেদ খান শরীফ, শামীম তালুকদার, ডা. দেলোয়ার হোসেন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি ও রংপুর সদর উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি আতাউজ্জামান বাবু, ২০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক বাবু তুষার কান্তি ম-ল, যুগ্ম সম্পাদক নওশাদ রশীদ, রওশানুল ইসলাম সংগ্রাম, এ্যাড. দিলশাদ হোসেন মুকুল, সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গির আলম তোতা, কোষাধ্যক্ষ সামসুর রহমান কোয়েল, প্রচার সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মিলন, মহানগর শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ মজিদ, আওয়ামীলীগ নেতা এসএম মিল্টন।

অন্যদিকে, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, জেলা সহ-সভাপতি সাবেক নারী সাংসদ অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়ার নাম শোনা যাচ্ছে। সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাজেদ আলী বাবুল, সাংগঠনিক সম্পাদক তুহিন চৌধুরী, এ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, মোতাহার হোসেন ম-ল মওলা, দপ্তর সম্পাদক তৌহিদুর রহমান টুটুল আলোচনায় রয়েছেন।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু বলেন, দলের সম্মেলন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। গত ১৪ই সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে রংপুর টাউন হলে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় আমি জোরালোভাবে সম্মেলনের আহ্বান জানিয়েছি। কেন্দ্রীয় নেতারা ওই সভাতেই আগামী ২৬শে নভেম্বর সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করেন। এবার আমি কোনো পদেই নির্বাচন করছি না। তবে দল যদি চায় তাহলে আমি থাকবো।

রংপুর জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছি। দল যদি চায়, আমি মহানগর সভাপতি পদটি আশা করতেই পারি।

জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবুল কাশেম বলেন, সম্মেলন কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। এবার আমি মহানগর সভাপতি পদে নির্বাচন করতে চাই। এজন্য সব স্থরের নেতাকর্মীদের কাছে ছুটে যাচ্ছি।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিয়ার রহমান সাফি বলেন, দলের দায়িত্ব নেয়ার পর অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মহানগর আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা হয়েছে। ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেছি। দলের ক্রান্তিলগ্নে ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতে থাকবো। আশা করছি দল অবশ্যই মূল্যায়ন করবে।

প্রসঙ্গত: সর্বশেষ ২০০৭ সালে সাফিয়ার রহমান সাফিকে সভাপতি ও বাবু তুষার কান্নি ম-লকে সাধারণ সম্পাদক করে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। আর ১৯৯৭ সালে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন হয়। ২০০৬ সালে রংপুর জেলা সম্মেলন আহ্বান করা হলে দলের দুই গ্রুপের বিরোধের জেরে প- হয়ে যায়। পরে আহবায়ক কমিটি দ্বারা জেলা আওয়ামী লীগ পরিচালিত হয়। ২০০৯ সালে প্রয়াত আবুল মনছুর আহমেদকে সভাপতি ও এ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজুকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা আওয়ামীলীগের ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় কমিটি। পরে আবুল মনসুর আহমেদের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ।