• আজ ৩রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

চীনে লাখো মুসলিমকে নির্যাতনের দলিল ফাঁস

১১:৫৬ অপরাহ্ন | সোমবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৯ আন্তর্জাতিক
fas

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ চীনে কয়েক লাখ উইগার মুসলিমকে গোপন বন্দীশালায় আটকে রেখে কিভাবে তাদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে তার কিছু দলিলপত্র সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে।

বিবিসি জানায়, অতীতে অনেকবার উইঘুরদের বন্দি করে রাখার সরকারি দলিল ফাঁস হলেও সম্প্রতি আইসিআইজে কর্তৃক ফাঁস হওয়া নতুন নথিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখার সুযোগ হয়েছে। নতুন সরকারি নথিতে উঠে এসেছে কিভাবে উইঘুরদের বন্দির মতো ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে আটকে রাখা হয়েছে এবং তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

যদিও চীন সরকার বরাবরই দাবি করে আসেছে, পশ্চিম জিনজিয়াং অঞ্চলে গড়ে তোলা ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে উইঘুরদের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

তবে ফাঁস হওয়া নতুন সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিরাপত্তা ও উচ্চ প্রযুক্তি সংবলিত ক্যাম্পগুলোতে উইঘুরদের সঙ্গে বন্দির মতো আচরণ করা হচ্ছে। সেখানে উইঘুরদের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের নামে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নিজস্ব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের ওপর নানা রকম নির্যাতনও চালানো হচ্ছে।

আইসিআইজের অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত তিন বছর ধরে চীন সরকার জিনজিয়াং প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিটেনশন ক্যাম্প গড়ে তুলেছে। উইঘুরদের চরমপন্থা থেকে দূরে রাখতে এবং তাদের চীনা জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির শিক্ষা দেয়ার জন্য এসব ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি বেইজিংয়ের। যদিও বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।

এদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে যুক্তরাজ্যের চীনা দূতাবাস দাবি করে, বেইজিং এর বিরুদ্ধে আইসিআইজে মিথ্যা ও ভুয়া সংবাদ প্রচার করছে।

ধারণা করা হয়, এসব শিবিরে দশ লাখেরও বেশি মুসলিমকে বিনা বিচারে আটক করে রাখা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই উইঘুর সম্প্রদায়ের সদস্য।

গোপন এসব বন্দিশালার ছবি বিশ্ব এর আগেও দেখেছে। কিন্তু এখন ফাঁস হওয়া দলিলপত্র থেকে পরিষ্কার এসব শিবিরের ভেতরে আসলে কী ঘটছে। বিবিসির কাছে যেসব দলিল এসেছে, সেগুলো মূলত কীভাবে এই বন্দিশিবির চালাতে হবে তার নির্দেশনা। শিবিরের কর্মকর্তাদের জন্য এসব নির্দেশাবলী দিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

জিনজিয়াং কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি সেক্রেটারি ঝু হাইলুন ২০১৭ সালে যারা এসব শিবির পরিচালনা করেন তাদের কাছে নয় পৃষ্ঠার এই সরকারি দলিল পাঠিয়েছিলেন। তাতে বলা হয়েছে, শিবিরগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত জেলখানার মতো চালাতে হবে। বজায় রাখতে হবে কঠোর শৃঙ্খলা। কেউ যেন পালিয়ে যেতে না পারে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের এসব নির্দেশনার মধ্যে ছিল:
• কখনোই পালানোর সুযোগ দিও না।
• শৃঙ্খলা এবং শাস্তি বাড়াতে থাকো।
• কেউ আচরণবিধি ভঙ্গ করলে তাকে কঠোর শাস্তি দাও।
• স্বীকারোক্তি ও অনুতপ্ত হতে উৎসাহিত করো।
• মান্দারিন ভাষা শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দাও।
• পুরোপুরি বদলে যাওয়ার ব্যাপারে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করো।
• পুরো ভিডিও নজরদারি চালাও, কোন জায়গা যেন বাদ না থাকে।

ফাঁস হওয়া এসব দলিলে দেখা গেছে, শিবিরে বন্দী উইঘুরদের জীবনের ওপর কীভাবে নজর রাখা হচ্ছে ও কতোটা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে তাদেরকে রাখা হয়েছে। যেমন, ‘শিক্ষার্থীদের বিছানা কোথায় কীভাবে থাকবে, লাইনের কোথায় কে দাঁড়াবে, শ্রেণীকক্ষে কোথায় বসবে, কে কী শিখবে- সব নির্ধারিত থাকবে। এগুলো পরিবর্তন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।’

এসব নির্দেশনায় ঘুম থেকে ওঠা, রোল কল করা, কাপড় ধোওয়া, টয়লেটে যাওয়া, ঘর গুছিয়ে রাখা, খাওয়া দাওয়া, লেখাপড়া, ঘুমানো এমনকি দরজা বন্ধ করার বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মুখপাত্র সোফি রিচার্ডসন বলছেন, এসব দলিল আসলে এমন একটি প্রমাণ যার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘এটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রামাণিক দলিল। এই প্রমাণ এখন থাকা উচিৎ কোন বিচারিক তদন্ত কর্মকর্তার ফাইলে।‘ তিনি এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলত শাস্তি দাবি করেছেন।

লন্ডনে চীনের রাষ্ট্রদূত লিও যাও মিং এসব বন্দী শিবিরের ব্যাপারে বিবিসির সরাসরি প্রশ্নের কোন জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কিন্তু এর আগে গত সপ্তাহে তিনি হংকং-এর ব্যাপারে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন।

সেখানে বিবিসির সাংবাদিক রিচার্ড বিল্টন তাকে এসব বন্দী শিবির নিয়ে প্রশ্ন করেন।

জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘প্রথমত বলতে চাই, আপনি যেরকম বর্ণনা দিচ্ছেন, সেরকম কোন বন্দী শিবির সেখানে নেই। এগুলো আসলে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে তাদের রাখা হয়েছে সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের জন্য।’

রিচার্ড বিল্টন এরপর পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, তার মানে তিনি যা দেখে এসেছেন, তা সত্য নয়?

‘আপনি যে তথাকথিত দলিলের কথা বলছেন, সেটা পুরোটাই বানোয়াট। ভুয়া খবরে বিশ্বাস করবেন না। বানানো গল্প শুনবেন না,’ চীনা রাষ্ট্রদূতের জবাব।

কিন্তু আইসিআইজের সাংবাদিকরা বলছেন, ‘এসব দলিল আসলে মোটেই ভুয়া নয়, এগুলো মানবতা-বিরোধী অপরাধের প্রমাণ। চীন হাজার হাজার মানুষকে খাঁচায় বন্দী করে তাদের মগজ ধোলাই করছে, এবং এখন আমরা জানি কীভাবে সেটা করা হচ্ছে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা