দেখে আসুন ২২৪ বছরের পুরোনো ঠাকুরগাঁওয়ের সূর্যাপুরী আমগাছ

৮:২৭ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ রংপুর
Thakurgaon

কামরুল হাসান, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ দুর থেকে দেখলেই মনে হবে বিশাল আকৃতির একটি বটগাছ। কাছে না গেলে বোঝা যাবে না এটি বটগাছ নয়, আমগাছ। প্রায় তিন একর জমিতে ডালপালা ছড়িয়ে ২২৪ বছরের বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ সুর্যাপুরী জাতের আমগাছটি। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আমজানখোর ইউনিয়নের হরিণমারী এলাকায় অবস্থিত এ আমগাছটিকে এক নজর দেখার জন্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বজনদের সাথে ছুটে আসছেন এখানে সরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যসহ নানা পেশার মানুষ। বাদ পড়েননি বিদেশীরাও।

গাছটির বয়স সম্পর্কে সঠিক ধারণা কারো নেই বলে জানালেন পৈত্রিকসুত্রে মালিকানা পাওয়া গাছটির বর্তমান মালিক দুই ভাই সাইদুর রহমান ও নুর ইসলাম। তারা জানান, পুর্ব পুরুষদের লাগানো এ গাছটির মালিকানা তারা পৈত্রিক সুত্রে পেয়েছেন। পুর্ব পুরুষদের কথা অনুযায়ী গাছটির বয়স ২২৪ বছরের বেশি।

মালিকানা পাওয়ার পর গাছটির পরিচর্যা করছেন তারা। আর্থিক সংকটের কারণে টিনের বেড়া দিয়ে গাছের চারপাশ সীমানা দিয়েছেন তারা। গাছটিকে নিয়ে বৃহৎ পরিকল্পনা থাকলেও অর্থ ভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল আকৃতির এই আমগাছটি দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে গাছটির নিচে থাকছে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। গাছটি দেখতে দর্শনার্থীদের ১০ টাকা মুল্যের টিটিক কেটে প্রবেশ করতে হচ্ছে। টিকিটের মূল্য থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে গাছটিকে পরিচর্যা এবং দুই ভাইয়ের পরিবার চলছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রশাসন এবং গাছটি দেখতে আসা দর্শনার্থীরা গাছটির পাশে একটি পর্যটন কেন্দ্র অথবা বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস দিয়ে গেছেন এবং এ নিয়ে কয়েকটি মত বিনিময় সভাও করেছেন আমগাছ চত্বরে।

জানা গেছে, গাছের আমগুলি ২০১৭, ২০১৮ এবং ২০১৯ এই ৩ বছরের জন্য দুই ভাই বিক্রি করেছিলেন স্থানীয় আম ব্যবসায়ী সোলেমান আলীর নিকট।

আম ক্রয়কারী সোলেমান আলী জানান, ‘দেড় লাখ টাকায় তিন বছরের জন্য গাছটি লিজ নিয়েছিলাম। ঝড়ে আম বিপুল পরিমাণ ঝড়ে গেলেও প্রায় ৮০ মণের উপর পেয়েছিলাম গেল মৌসুমে।এ গাছের আমের মূল্য বাজারের অন্য আমের চেয়ে দিগুন।

গাছ মালিক নূর ইসলাম বলেন, ‘সূর্যাপুরী জাতের এই গাছটির আম খুবই সুস্বাদু ও মিষ্টি। এর আগে প্রতি মৌসুমে ১০০ মণের বেশি আম পাওয়া গেলেও গত মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ মণ আম পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মানুষ অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখে আমের জন্য।’

দিনাজপুর থেকে গাছটিকে দেখতে আসা কলেজ ছাত্র সামিউল আলম বলেন, ঢাকায় লেখাপড়া করতে গিয়ে বাড়ী থেকে এক জেলার পার্শ্বেই এশিয়ার সর্ববৃহৎ আমগাছটি দেখার সুযোগ হয়নি এর আগে।

নীলফামারী থেকে আসা স্কুল শিক্ষক মমতাজ উদ্দীন জানান, ইউটিউবে আমগাছটির ভিডিও দেখেই বড় ছেলে আশিকুর রহমানের গাছটিকে সরাসরি দেখার আগ্রহ অনেক দিনের। ফেব্রæয়ারির ছুটিতে তাই স্ব-পরিবারের মাইক্রোবাস ভাড়া করে এসেছি গাছটিকে দেখতে।

শিক্ষকের ছেলে আশিকুর রহমান জানায়, ইউটিউবের ভিডিও’র চেয়ে সরাসরি গাছটি দেখে খুব ভাল লাগছে। গাছটির ছবি তুলেছি। বন্ধুদের গিয়ে দেখাব।

ওই এলাকার স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. আকালু বলেন, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসার দর্শনার্থীদের জন্য থাকা, খাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করতে পারলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এমনিতে সরকারী কর্মকর্তারা আসলে গাছটির নিচে আলোচনা সভা এবং বসে বিশ্রাম নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার খায়রুল ইসলাম সুমন বলেন, সরকারি গাছটি রক্ষনাবেক্ষণসহ গাছটির চারপাশের ঘেরাউ করে জায়গাটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। পরিকল্পনা তৈরি করে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করেছেন। আমরা আশা করছি খুব শ্রীঘ্রই এটি বাস্তবায়ন হবে। তাছাড়া গাছটির পার্শ্বে দর্শনার্থীদের জন্য একটি রেস্ট হাউজের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আমগাছটি ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী পরিদর্শন করেছেন এবং পরিদর্শনের সময় গাছটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন।

যেভাবে আসবেন আমগাছটি দেখতে :

মৈষাল ভাইয়ের মহিষের গাড়ি একসময়ের একমাত্র পথ চলার বাহন হলেও এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না। ঢাকা থেকে সড়ক পথে বিলাসবহুল বাসযোগে সরাসরি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় খুব সহজেই পৌছানো যায়। সড়ক পথে ঢাকা থেকে বালিয়াডাঙ্গীর দুরত্ব প্রায় ৪৫০ কি.মি। বিমানপথে সৈয়দপুরে পৌছে সড়ক পথে এবং রেলযোগে সৈয়দপুর অথবা দিনাজপুর পৌঁছে সড়কপথে বালিয়াডাঙ্গী নির্বিঘ্নে পৌছানো যায়। ঢাকা থেকে সরাসরি এশিয়ান হাইওয়ে বালিয়াডাঙ্গী পর্যমত্ম বিসত্মৃত রয়েছে। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় অধিকাংশ মূল সড়ক পাকা হলেও আনাচে কানাচে কাচা সড়ক পরিলক্ষিত হয়। বেলে মাটি হওয়ায় বর্ষার মৌসুমেও কাচা সড়ক চলাচলের উপযোগী থাকে। বালিয়াডাংগী হযে ডাংগী বাজার দিয়ে/লাহিড়ী বাজার দিয়ে/চৌরাস্তা দিয়ে ভ্যান, বাস, মিশুক, দিয়ে এই ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সুর্যপুরী আম গাছ পরিদর্শন করা যাবে।

Skip to toolbar