জাতীয় পরিচয়পত্রে আটকে আছে মুক্তিযোদ্ধা নৃপেন্দ্র নাথের স্বীকৃতি

❏ মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯ রংপুর

মহিবুল্লাহ্ আকাশ, সময়ের কণ্ঠস্বর :: ডোমারে জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম ও বয়সের ভূলের কারনে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠাতে পারছেননা ভারতীয় তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা নিপেন্দ্র নাথ রায় ওরফে সিনিয়াল বর্মন। পেটের তাগিদে বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি ছ,মিলে গাছের ছাল-বাকল তুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

নাম ও বয়স দুটোই পাল্টানোর জন্য স্থানীয় নির্বাচন অফিসে আবেদন করে বছরের পর বছর ঘুড়েও এ জটিলতা থেকে তাঁর মুক্তি মেলেনি। স্বীকৃতি,সন্মানী ভাতা না পেয়ে সত্তর বছর বয়সী এই হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন।

বঞ্চিত এ মুক্তিযোদ্ধার জন্ম ১৯৫১ সালের আগষ্ট মাসে পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার উপনচৌকি ভাজনী গ্রামে দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন। বাবা কালা চাঁন রায় ও মা ঝকশ্বরীর দুই ছেলে,এক মেয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ছোট বেলায় তিনি বাবা-মাকে হারান।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন নৃপেন্দ্রনাথ রায় ভাই-বোনকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে ভারতের হলদিবাড়ির সাকাতি নামের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখানে থেকে তিনি ভারতের মুজিব ক্যাম্পে ২৮ দিনের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে ৬ নং সেক্টরের অধিনে সাব-সেক্টর কমান্ডার ইকবাল রশিদ ও প্রাটুন কমান্ডার রুস্তম আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

তিনি বলেন, আমরা ১৫০জন সশস্ত্র যুবক নভেম্বরের ১ তারিখে জলপাইগুড়ি জেলার চ্যাংরাবান্দা বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশের বুড়িমারী হেড কোয়াটারে আসি। সেখানে ২দিন থাকার পর লালমনিরহাট, রংপুর, সৈয়দপুরের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ শেষে নীলফামারীর নটখানা হেডকোয়াটারে এসে খবর পাই দেশ স্বাধীন হয়েছে। ওইদিন রাতে সহযোদ্ধাদের সাথে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে বিজয়ের উল্লাস করি। পরদিন অস্ত্র জমা দিয়ে ভারতের সাকাতি ক্যাম্প ফিরে যাই। সেখান থেকে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ী ফিরে আসি।

দেশ স্বাধীনের দুই বছর পর ডোমার উপজেলার বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের বাগডোকরা গ্রামের পানিয়াল চন্দ্র রায়ের একমাত্র মেয়ে সুকুমারী রানীকে বিয়ে করে সেখানেই তিনি স্থায়ী নিবাস গড়েন। সংসার জীবনে দুই মেয়ে,এক ছেলের বাবা হন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকায় পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার ভলিউম ৫-এর খন্ড নম্বর ১৫৩তে ৩৭৪২৯ ক্রমিক নম্বরে তাঁর নাম লেখা আছে শ্রী নৃপেন্দ্র নাথ রায়। জন্মনিবন্ধনেও একই নাম রয়েছে। তিনি ২০০৮ সালে মুক্তিযোদ্ধার সন্মানী ভাতার জন্য আবেদন করতে গিয়ে টের পান তার জাতীয় পরিচয়পত্রে নৃপেন্দ্রনাথ রায়ের বদলে সিনিয়া বর্মন নাম এসেছে। বয়স ১৯৫১’র স্থলে ১৯৬০ হয়েছে।

নাম পরিবর্তন ও বয়স সংশোধনের জন্য জমির দলিল, নাম পরিবর্তনের হলফনামা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নসহ ডোমার ও নীলফামারী নির্বাচন অফিসে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঘুরেছেন। কিন্তু নাম, বয়স কোনটাই পাল্টাতে পারেনি। এরপর গত ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ডোমার উপজেলায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই শুরু হলে সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভূক্তির জন্য আবেদন করেন। যাচাই কমিটি ৩ মাস যাচাই-বাছাই শেষে ওই বছরের মে মাসের ১১ তারিখে তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব সাবিহা সুলতানা তাঁর যাবতীয় কাগজপত্র প্রমাণাদিসহ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) পাঠিয়ে দেন। সেখানে যুদ্ধকালীন সময়ের দুজন সহযোদ্ধা এবং দেবীগঞ্জ ও ডোমার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও নীলফামারী জেলা কমান্ডারের প্রত্যয়ন রয়েছে। এরপর আর কোন খোঁজ রাখেনি এ মুক্তিযোদ্ধা।

শেষ বয়সে এসেও দিনমজুরী করে পেট চালাতে হয়। তাতে কোন দুঃখ নাই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হয়ে স্বীকৃতি ছাড়াই মারা যাব,এটা ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। এসময় তিনি স্বীকৃতি,সন্মানী ভাতা পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদিঘীর সহযোদ্ধা মনোরঞ্জন রায় বলেন, নিপেনদা আমার চেয়ে ৩-৪ বছরের বড়। আমরা একসঙ্গে মুজিব ক্যাম্পে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি।

একই গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সত্যেন্দ্রনাথ রায় প্রধান বলেন, নৃপেন্দ্রনাথ আমার সমবয়সী। মুজিব ক্যাম্পে আমরা পাশাপাশি বেডে ঘুমাতাম। সে অশিক্ষিত হলেও সহজ-সরল ছিল। একদিন ক্যাম্পে ট্রেনিং নেয়ার সময় পায়ে প্রচন্ড আঘাত পাই। নিপেন রাত জেগে আমার সেবা করেছে। রনাঙ্গঁনে তার সাথে আমার অনেক স্মৃীতি এখন চোখে জ্বল জ্বল করে ভাঁসে”। জাতীয় পরিচয়পত্রের কারণে তাঁর স্বীকৃতি আটকে থাকবে,এটা হতে পারে না। তিনি সহযোদ্ধা নৃপেন্দ্রনাথ রায় ওরফে সিনিয়িালের স্বীকৃতি,সন্মানী ভাতা পেতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবী জানান।

দেবীগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার স্বদেশ রায় বলেন, মুক্তিযোদ্ধা নৃপেন্দ্রনাথ রায়কে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাঁর নাম দেবীগঞ্জ তালিকায় আছে। গত ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ডোমার উপজেলার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা দেবীগঞ্জ উপজেলার যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে আসে। যাচাই কমিটি তাঁকে চিহ্নিত করে ডোমার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম অর্ন্তভূক্ত করার জন্য প্রত্যয়ন দিয়েছে। তাঁর ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা চাইলে আমরা এগিয়ে আসব।

ডোমার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নুরননবী জানান, ডোমার উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মুক্তিযোদ্ধা সিনিয়াল নামেই চেনে। যাচাই কমিটি নৃপেন্দ্রনাথ রায় ও সিনিয়া বর্মন নাম দুটি এক করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভূক্তির জন্য জামুকায় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে কোন খবর আসেনি।

তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা নৃপেন্দ্রনাথ রায়ের স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশন কর্তৃপক্ষের কাছে ঝুলে আছে।