🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ মঙ্গলবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ ৷ ১৮ মে, ২০২১ ৷

তাড়াশে প্রভাবশালীদের মদদে চলছে পুকুর খনন, প্রশাসন নীরব

Pabna
❏ সোমবার, জানুয়ারী ৬, ২০২০ রাজশাহী

সিরাজুল ইসলাম শিশির, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় কয়েক বছর আগেও দেখা যেত দিগন্ত জোড়া সবুজ ফসলের মাঠ। এখন সেই ফসলের মাঠে দেখা মেলে শুধু পুকুর আর পুকুর। স্থানীয় প্রভাবশালীরা একের পর এক কেটে যাচ্ছে উর্বর কৃষি জমিতে শত শত পুকুর।

প্রশাসনের নিরবতার কারণে দিন-রাত ২৪ঘন্টাই চলছে অধিকাংশ পুকুর খননের কাজ। অনেক ক্ষেত্রেই পুকুর খনন করতে গিয়ে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কের ব্রিজের মুখে মাটি দিয়ে পাড় বেঁধে দিচ্ছেন। এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পার্শ্ববর্তী জমির মালিকরা আবাদ করতে না পেরে বছরের পর বছর ফেলে রাখছেন তাদের জমি। ফলে এ উপজেলার ফসলী কৃষি জমির পরিমান কমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে।

তাড়াশ কৃষি অফিসসহ কৃষকরা জানিয়েছেন, জেলার তাড়াশ উপজেলাতেই দ্রুত হারে কমছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। গত কয়েক বছর ধরে উপজেলার সর্বত্রই উর্বর ফসলী জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। উচ্চমূল্যে জমি ভাড়া কিংবা কিনে একশ্রেণির লোক বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য নির্বিচারে পুকুর ও দীঘি খনন করছেন। ফলে উদ্বেগজনক হারে তাড়াশে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, পুকুর খনন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মধ্যে অফিস স্টাফদের পাঠালেও তারা মাটি খননযন্ত্র বেকুর চাবি নিয়ে আসেন। পরে দেনদরবারের মাধ্যমে ফিরে দেন তারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ উপজেলার থাকবে না কোন ফসলী জমি। ফলে দেখা দেবে খাদ্য শষ্যের সংকট। এমনই আশংকা করেছে কৃষি বিভাগ। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে এ উপজেলায় পুকুর দীঘির সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আর পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পুকুর খননের ফলে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন হচ্ছে। এতে পরিবেশগত প্রতিকূলতার আশঙ্কা বাড়ছে।

তাড়াশ উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, উপজেলায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমান ২৫২০০ হেক্টর। সবশেষ ২৮ জুলাই ২০১৯ এর হিসেব মতে, উপজেলায় ২৪টি ব্লকে পুকুর খননের সংখ্যা নিমগাছী প্রকল্পের আওতায় ৭৫০টি, ভূমি অফিসের আওতায় ৩৫০টি ও ব্যক্তি মালিকানায় রয়েছে ২০০০টি। নিমগাছী প্রকল্প বাদে যার মোট আয়তন ৪৩৫ হেক্টর। উপজেলায় ১৯৯৮সালের দিকে আবাদযোগ্য জমি ছিল ২৫২০০ হেক্টর। ২০১৮ সালে দিকে ছিল ১৫১৩৭ হেক্টর। বর্তমানে আবাদযোগ্য জমি কমে দাাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধেকে। ২ দশকে আবাদযোগ্য জমি কমেছে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর। সরেজমিনে তাড়াশের নওগা ইউনিয়নের মহিষলুটি, নওগা, শান্তান, ভায়াট, চৌপাকিয়া; সদর ইউনিয়নের পাচান, শলাপাড়া, জাহাঙ্গীরগাঁতী, কাওরাইল, বোয়ালিয়া, শ্রীকৃষ্ণপুর এবং মাগুড়াবিনোদ ইউনিয়নের ঘরগ্রাম, আমবাড়িয়া, দবিলাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, এ উপজেলায় ২০১৯সালে নতুন পুকুর খনন হয়েছে প্রায় তিন শতাধিক। এর মধ্যে প্রায় শতাধিক পুকুরের খনন কাজ অব্যাহত হয়েছে।

তাড়াশ থানাপাড়া শ্মশান ঘাট সংলগ্ন এলাকায় ৫২বিঘা ফসলী জমিতে পুকুর কাটছেন স্থানীয় প্রভাবশালী সুজাব হাজী। তিনি সব সময় পুকুর খনন এলাকায় তার নিজস্ব বাহিনী বসিয়ে রাখেন।

দেবিপুর গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক জব্বার সর্দার জানান, মাঠের মধ্যে একটা বড় পুকুর খনন করলে আশপাশের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে ওইসব জমিতে আর আবাদ করা যায় না। যারা জমি কেটে পুকুর কাটছেন তারা প্রায় সবাই প্রভাবশালী।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, কয়েক বছরে তাদের ইউনিয়নেই অর্ধেক আবাদি জমি পুকুরে চলে গেছে। যেটুকু জমি অবশিষ্ট ছিল নতুনভাবে তাতেও চলছে পুকুর খনন। অপরিকল্পিত পুকুর খননে জলাবদ্ধতা হয়ে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে। কমে যাচ্ছে আবাদী জমির পরিমান।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহার লুনা জানান, অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। ক্ষতির পরিমাপ নিরুপন করা না গেলেও পুকুর করে মাছ চাষে যে লাভ হচ্ছে, কৃষির ক্ষতিটা তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বেপরোয়া হারে পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটির খনন কাজ বন্ধও করে দেয়া হয়েছে। এ অভিযান চলমান থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।