• আজ ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পারিবারিক পার্টিতে পরিণত হয়েছে সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টি!

৮:৫১ অপরাহ্ণ | সোমবার, জানুয়ারি ২০, ২০২০ খুলনা
Shatkhira

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, সময়ের কণ্ঠস্বর :সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টি এখন পারিবারিক পার্টিতে পরিণত হয়েছে। ফলে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টির সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হন আশরাফুজ্জামান আশু। পরবর্তীতে রউফ সাহেব মারা যাওয়ার পরে ২০০৫ সালে পুন:রায় জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।  আর তখন থেকেই স্বপদে বহাল আছেন আশরাফুজ্জামান আশু। তবে তিনি শুধু নিজের পদটিকেই ধরে রাখেননি, নিজের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন পদ প্রদান করে দখলে রেখেছেন জেলা জাতীয় পার্টির গুরুত্বপূর্ণ ৫ টি পদও।

জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ন সম্পাদকের পদ দিয়েছেন ভায়রা ভাই আনোয়ার জাহিদ তপনকে, পৌর জাতীয় পার্টির সভাপতির পদ দিয়েছেন শ্যালক সৈয়দ মাহমুদ পাপা, সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রসমাজের সভাপতির পদ দিয়েছেন মেঝ ছেলে কায়সারুজ্জামান হিমেলকে,  ও সদর উপজেলা ছাত্র সমাজের সভাপতির পদ দিয়েছেন ছোট ছেলে কায়মুজ্জামান পাভেলকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টির একাধিক নেতা-কর্মীরা জানান, জেলা জাতীয় পার্টির সম্পাদক হওয়ার অনেক যোগ্য লোক সাতক্ষীরায় থাকলেও কি কারণে আশরাফুজ্জামান আশুকে প্রায় দীর্ঘ ১৮ বছর সম্পাদক বানানো হয়েছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তিনি সম্পাদক হয়ে দলকে কুক্ষিগত করার কারণে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা ঠিকমতো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না।

আশাশুনি উপজেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ন সম্পাদক টুটুল জানান, আমাদের দলের সম্পাদকের কারণে আশাশুনি উপজেলা জাতীয় পার্টি ভঙ্গুরে পরিণত হয়েছে।  যোগ্য ব্যক্তি থাকতেও আমাদের দলের সভাপতি বা সম্পাদক না করে আওয়ামীলীগের নেতাদের পছন্দের ব্যক্তিদের সভাপতি ও সম্পাদক করেছেন। এছাড়া নিজ স্ত্রী, ছেলে, শ্যালক ও ভাইরা ভাইকে জেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে পারিবারিক পার্টিতে পরিণত করেছেন। যেটি সম্পূর্ণ গঠনতন্ত্র বিরোধী। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, বর্তমানের জেলা কমিটির মেয়াদ শেষ। আগামী কাউন্সিলে তাকে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দিলে জেলা জাতীয় পার্টির কোন কূল-কিনারা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই, কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে আবেদন যোগ্য ব্যক্তিকে যেন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি বা সম্পাদক মনোনীত করা হয়।

জেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক মইনুর রশিদ জানান, জেলার সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান আশু জাতীয় পার্টিকে পারিবারিক পার্টি বানানোর ব্যাপারে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে একাধিকবার কথা বললেও তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বরং তাকে আবারও সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু কি কারণে সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তা বলতে পারবো না। যদি কেন্দ্রীয় নেতারা তাকে এ পদে না দিয়ে অন্য কাউকে দিতেন তাহলে সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টি চাঙ্গা থাকতো।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের দলের কোন কর্মসূচী ঠিকঠাকভাবে পালন করা হয় না। তাই, আগামীতে যে ব্যক্তিই জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি বা সম্পাদক নির্বাচিত বা মনোনিত হবেন, তারা যেন বর্তমান সম্পাদকের মতো পারিবারিক পার্টি না বানান সে জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সু দৃষ্টি কামনা করছি।

সম্পাদকের ঘরে ৫ পদের বিষয়ে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান আশু জানান, আমি এরশাদ সাহেবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৩ সালে যুব সংহতিতে যোগ দিয়েছিলাম। আমি যখন থেকে রাজনীতি করি ওরা তার আগে থেকে রাজনীতি করতো। সেসময় সৈয়দ মাহমুদ পাপা ও শেখ আজহার হোসেন ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টি করতো এবং এড. রহিম সাহেবের ছেলে তপন গণতান্ত্রিক পার্টি করতো। আমার রাজনীতি জীবনের ১০ বছর পরে তপন আমার ভায়রা হয়েছে ঠিক। কিন্তু তপন এর মতো পাপাও নিজ নিজ যোগ্যতায় আজকে জাতীয় পার্টির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌছায়েছেন। এবং তারা সকলে আজও জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয়।

তিনি আরও জানান, ১৯৯৬ সালে যখন জাতীয় ফ্রন্টের মাধ্যমে জাতীয় পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। তখন আমি জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হয়েছিলাম। এবং পরবর্তীতে রউফ সাহেব মারা যাওয়ার পরে ২০০৫ সালে পুন:রায় জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হয়েছি। তখন থেকে অদ্যবধি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। তবে রাজনীতিতে আমার মেঝ ছেলে ও ছোট ছেলে প্রবেশ ব্যতিক্রম।

জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন জানান, জেলা জাতীয় পার্টির বর্তমান কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ। তাই, দলের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাউন্সিল করার জন্য আমরা কেন্দ্রে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কেন্দ্রে থেকে একটি ফ্যাস্কের মাধ্যমে আমাদের কাউন্সিল না করার কথা জানায়। সেজন্য আজও আমরা জেলায় কাউন্সিল করতে পারছি না। কেন্দ্র অনুমতি দিলে যথাসময়ে আমরা কাউন্সিল করবো।

তিনি আরও জানান, আমাদের জেলা সম্পাদকের আত্মীয়-স্বজন মিলে ৫ পদে আছে ঠিকই, তবে নিজ নিজ যোগ্যতা বলে তারা এসব পদে আসীন হয়েছেন। পাপা পরপর তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। সে যদি জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতির পদ দাবি করে তাহলে আমার সভাপতির পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা জানান, জনগণের দল জাতীয় পার্টি। এটি কোন পারিবারিক পার্টি নয়। সাতক্ষীরায় দলের কোন সম্পাদকের দুর-সম্পর্কের আত্মীয় দিয়ে যদি জেলা কমিটির একাধিক পদ দখলে রাখা হয় তবে তা গঠনতন্ত্র পরিপন্থী। এখনও আমরা এ বিষয়ে কোন লিখিত অভিযোগ পায়নি। অভিযোগ পেলে দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করবো। জেলা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, প্রায় ১ বছর সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টির কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে জেলায় কাউন্সিলের কোন তারিখ আমরা এখনও নির্ধারণ করিনি। এবং ফেব্রুয়ারিতেও কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণের কোন সুযোগ নেই। তবে জেলার নেতারা কাউন্সিলের জন্য লিখিত পত্র দিলে আমরা দলীয়ভাবে কি করা যায় তা ভেবে দেখবো।

Loading...