করোনা চিকিৎসায় অত্যাধুনিক ভেন্টিলেটর তৈরি করলেন বগুড়ার যন্ত্রবিজ্ঞানী

❏ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২১, ২০২০ ফিচার

সাখাওয়াত হোসেন জুম্মা, বগুড়া প্রতিনিধি: করোনা ভাইরাস বিশ্ব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হয় বলে এই ভাইরাসের আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরাও মারা যাচ্ছেন। তৈরী হয়নি করোনা ভাইরাস প্রতিষেধক ও টিকা। তাইতো দেশের এমন ক্রান্তিকালে যন্ত্রচালিত অটোমেশিন পোষাক আবিস্কার করেছেন বগুড়ার যন্ত্রবিজ্ঞানী আমির হোসেন।

উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা এই অটোমেশিন পোষাক। তবে এটি চিকিৎসা কাজে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) আদলে তৈরি করা হয়েছে। ফলে এই পোষাক ব্যবহার করে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের নিরাপদে চিকিৎসা দিতে পারবেন চিকিৎসক ও নার্সরা।

এ মেশিন ব্যবহার করে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দেয়া হলে চিকিৎসক কিংবা নার্সদের করোনায় আক্রান্তের সুযোগ থাকবে না, সর্বদা থাকবেন তারা সম্পূর্ন নিরাপত্তার মধ্যে। অনেকটা নির্ভয়ে তারা করোনায় আক্রান্ত রোগীর সামনে কাজ করতে পারবেন। বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরি এই পোশাকের ভিতর থেকেই যন্ত্রের মাধ্যমে কথা বলতে পারবেন চিকিৎসক কিংবা নার্সরা যা স্পিকারের মাধ্যমে বাহিরে সবাই শুনতে পারবেন বলে দাবী করেন ওই যন্ত্র বিজ্ঞানী।

এই অত্যাধুনিক ভেন্টিলেটর তৈরী করা যন্ত্র বিজ্ঞানীর নাম আমির হোসেন। ১৯৪০ সালের দিকে তার বাবা ধলু মেকার বগুড়া শহরের ঠিকাদারপাড়া লেনে প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ গড়ে তোলেন। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধকালীন সময়ে তৎকালীন বগুড়ার ডিসির নির্দেশে ধলু মেকার সতর্কতামূলক সাইরেন মেশিন তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার বাবা ধলু মেকার নিজ প্রচেষ্টায় হস্তচালিত লেদ মেশিন তৈরি করে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যাবসায়িক মহলে আলোচনায় আসেন। এরপর তার বাবা ১৯৮৮ সালে মারা যাওয়ার পর রহিম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের দায়িত্ব নেন আমির হোসেন।

যন্ত্র বিজ্ঞানী আমির হোসেনের হাতেখড়ি হয় তার বাবা ধলু মেকারের কাছেই। পিতা ধলু মেকারের আট ছেলেমেয়ের মধ্যে আমির হোসেন চতুর্থ। পিতার মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় গবেষণা। প্রকৌশলী আমির হোসেন ২০০৩ সালে বুয়েট থেকে বিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি ও জিটিজেড থেকে কৃষি সামগ্রী উদ্ভাবনের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।

আর তখন থেকেই যন্ত্র তৈরীর ক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য যাত্রা শুরু হয়। নিজের মেধা ও গবেষণায় তৈরী করেন জ্বালানিবিহীন গাড়ি, অটোব্রিকস মেশিন, ধানকাঁটা মেশিন, অটো জৈব ও মিশ্র সার, ভুট্টা মাড়াই মেশিন, পাট প্রক্রিয়া জাতকরণ মেশিন, ফিশ ফিড ও পোলট্রি ফিড, পাম প্রসেসিং মেশিনসহ একাধিক কৃষি যন্ত্রপাতি। এবার সম্প্রতি বিশ্বে করোনা ভাইরাস সংক্রমনে কাবু মানুষদের রক্ষায় নিজস্ব গবেষণায় যন্ত্রচালিত অটোমেশিন পোষাক তৈরী করা জীবানুনাশক মেশিন তৈরীর কাজে মনোনিবেশ দিয়েছেন ওই যন্ত্র বিজ্ঞানী আমির হোসেন।

তার কাজে সাহায্য করেন তার দ্বিতীয় মেয়ে আসমা খানম আশা ও তৃতীয় মেয়ে তাহিয়া খানম। তবে এ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার ও সনদ পেয়ে খ্যাতি লাভ করেছেন ওই যন্ত্র বিজ্ঞানী আমির হোসেন।

এ প্রসঙ্গে যন্ত্র বিজ্ঞানী আমির জানান, এ যন্ত্রের মধ্যে আপনা আপনি অক্সিজেন তৈরি হবে এবং তা থেকে গোটা পোশাকে ছড়িয়ে পড়বে যাতে পোশাকের ভিতরের মানুষ সহজেই নি:শ্বাস নিতে পারে। এই মেশিনটি সম্পূর্ণ আইসিটিইউ(ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটের) আদলেই তৈরি করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস ছাড়াও জন্ডিস, যক্ষা, ডেঙ্গুজ্বর সহ সকল সংক্রমন রোগীকে এই যন্ত্রটির মধ্যে ঢুকিয়ে সংক্রমন রোধ করে নিরাপত্তার সাথে চিকিৎসা দেয়া যাবে। এই মেশিন নিজে নিজেই অক্সিজেন তৈরী করবে যা থেকে রোগী স্বাস্থ্যসস্মতভাবে অক্সিজেন গ্রহণ করবে।

বগুড়ার যন্ত্র বিজ্ঞানী আমির হোসেনের তৈরি যন্ত্রচালিত পোশাক যেমন নিরাপত্তায় ডাক্তার, নার্স চিকিৎসা করতে পারবে তেমনি এই যন্ত্রটি আইসিইউ আদলে করোনা ভাইরাস জনিত রোগীকে যন্ত্রের ভিতরে ঢুকিয়ে নিরাপদে রাখা যাবে। আবার আটোমেটিক ভাবে চিকিৎসার সুবিধার্থে বাহির করা যাবে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে তার দুটি প্রযুক্তির যন্ত্রটির প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিকে সংযোগ করিলে এতে করে চিকিৎসার মান আরোও উন্নত ও সহজতর হবে। দীর্ঘদিন এই পোশাক শরীরে রাখা যাবে। শরীরে স্বাস্থ্যগত কোন প্রতিক্রিয়া হবে না। পোশাকটি জীবাণুমুক্তকরণ যন্ত্র তৈরি কাজেও তিনি হাত দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

যন্ত্র বিজ্ঞানী আমির হোসেন আরও বলেন, সারাদিনে চলাফেরার কারণে পোশাকে জীবাণু আটকে থাকলে পোশাকের গায়ে লেগে থাকা জিবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত হয় নাই। তাই এমন যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে যাতে মেশিনে মধ্যে ৩০ সেকেন্ড ঢুকে আবার বেরিয়ে আসলে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত হয়ে যাবে খুব সহজেই এই যন্ত্রের মাধ্যমে। তবে এ যন্ত্রটি হাসপাতাল, ব্যাংক, বীমা, সেনাবাহিনীদপ্তর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সংযোগ করে শতভাগ জীবাণুমুক্ত নিরাপত্তায় আনা যাবে করোনায় আতঙ্কিত মানুষদের।

তাছাড়াও তিনি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ভেন্টিলেটর যন্ত্র তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। উন্নত প্রযুক্তির কাচামাল ব্যবহার করে কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সফলতার সাথে প্রায় ৪০ ভাগ কাজ এগিয়েছেন। তবে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা পেলে এই কাজগুলো সহজভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন। জীবানুমুক্তকরণ এই যন্ত্র আবিস্কার করা হলে শুধু দেশের চাহিদা মেটানোই নয়, বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে বলে বলে এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেন ওই যন্ত্রবিজ্ঞানী।