করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে করোনা ভাইরাস কি সত্যিই ছড়ায় ?

১১:২৩ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, জুন ২, ২০২০ ফিচার
মৃতদেহে করোনা

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা-  মৃতদেহে কতক্ষণ করোনা ভাইরাস বেঁচে থাকে? করোনা ভাইরাসের জীবাণু একজন মৃত ব্যক্তির দেহে কত সময় সক্রিয় থাকে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক চলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

কোভিড-১৯ এ কেউ মারা যাওয়ার পর সেই মৃতদেহ থেকে কি সংক্রমণ ছড়াতে পারে? করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে কি জীবিতরা সংক্রমিত হতে পারেন? তার শেষকৃত্য করাটা কি নিরাপদ? তাছাড়া, করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তিকে কি কবর দেয়া উচিত? নাকি দাহ করা উচিত?

এমন নানা প্রশ্ন ঘুরছে মানুষের মনে। সঠিক তথ্যের অভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক বিদ্বেষ। করোনা আক্রান্ত ব্যাক্তির লাশ দাফনে বাধা দিয়ে এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। করোনাভাইরাসে যারা মারা যাচ্ছেন তারা তো আমাদেরই কেউ। তাদের শেষ বিদায়টুকু সম্মানের সঙ্গে সম্পন্ন না করে আমরা জড়িয়ে পড়ছি দ্বিধা আর দ্বন্দে! সবমিলিয়ে এমন দুর্যোগে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মানবিকতা। এ পরিস্থিতি কারোই কাম্য নয়। সঠিক তথ্য জানলে এমন অনাকাংখিত পরিস্থিতি এড়িয়ে বাঁচতে পারে আমাদের মানবিক মুল্যবোধ।

করোনায় মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে করোনা ভাইরাস কি সত্যিই ছড়ায় ? কি ধরনের সতর্কতা থাকলে আমরা করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যাক্তির শেষকৃত্যে নিরাপদে অংশগ্রহণ করতে পারি? এখন পর্যন্ত জানা সব তথ্য নিয়ে এই রিপোর্ট ।

করোনায় মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে করোনা ছড়ায় কিনা এই বিতর্ক শুরু থেকেই। যেকারণে মৃতদেহ সৎকারে শুরু থেকেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে আসা হচ্ছে। পিপিই ব্যবহার করে খুব সতর্কতার সাথে লাশের সৎকার করা হচ্ছে। সারা দুনিয়া জুড়েই দেখা যাচ্ছে এই দৃশ্য- করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লোকদের শেষকৃত্য হচ্ছে, কিন্তু তাদের মৃতদেহের পাশে প্রিয়জনদের কেউ নেই শোক প্রকাশের জন্য।

এসব দৃশ্য দেখে মানুষের মনে ভয় ছড়িয়ে পড়ছে। তার কারণ শুধু মৃত্যুভয় নয়, মৃতের প্রতিও একটা ভয়। এই অবস্থায় মৃত ব্যক্তির লাশ অনেকেই স্পর্শ করতে চাচ্ছেন না। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যারা মারা গেছেন তাদের দাফন হচ্ছে নীরবে, কম সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতেই!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে জানিয়েছে, মারা যাওয়ার পর মানুষের শরীরে জীবাণু বেশির ভাগই দীর্ঘ সময় জীবিত থাকে না।

এরপরেও সঠিক জানার অভাবে করোনা মৃতদের শেষকৃত্য সম্পাদন নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ভুল ধারণা এবং ভুল প্রচারণার কারণেই এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ঘটেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই নিশ্চিত করেছেন যে, করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাইরাস ছড়ানো বা কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও-‘হু’ বলছে, করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯-এ আক্রান্তের মরদেহ থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায় না। করোনায় মৃতের দেহ থেকে করোনা সংক্রমিত হওয়ার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত ‘হু’ পায়নি।

নির্দেশনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও-‘হু’ বলছে, কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময় মরদেহের নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ফর দ্য সেফ ম্যানেজমেন্ট অব অ্যা ডেড বডি ইন দ্য কন্টেক্সট অব কভিড-১৯) করা সম্ভব। হেমোরেজিক ফিভার (যেমন : ইবোলা, মারবার্গ) ও কলেরা ছাড়া অন্য কোনো রোগে মারা যাওয়া ব্যক্তির দেহ থেকে সাধারণত রোগের সংক্রমণ ঘটে না।

যারা করোনায় মৃত ব্যক্তির দেহ তত্ত্বাবধান (যদি ময়নাতদন্ত করা হয়ে থাকে) করবেন, তাদের নিরাপত্তা অবশ্যই প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তাদের হাত পরিষ্কারের ব্যবস্থা ও পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) থাকে, তাড়াহুড়ো করে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা উচিত নয়। যারা মৃতদেহ দাফনের জন্য প্রস্তুত করবেন, তাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যিনি গোসল করাবেন তিনি মেডিকেল মাস্ক, গ্লাভস, ডিসপোজেবল গাউন ও চোখে গগলস পরবেন। মৃতদেহ কাপড় দিয়ে মোড়ালেই হবে। কোনো ব্যাগের দরকার নেই।

তবে, যদি মরদেহ থেকে অতিরিক্ত তরল পদার্থ বের হতে থাকে, তাহলে ব্যাগের প্রয়োজন হতে পারে। মৃতদেহে কোনো ধরনের কেমিক্যাল ছিটানোর দরকার নেই; মৃতদেহ পরিবহনের জন্য আলাদা বিশেষ কোনো পরিবহনের দরকার নেই; পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজনরা যদি শুধু দেখতে চান, তাহলে সতর্ক অবস্থানে থেকে তারা দেখতে পারবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ছোঁয়া যাবে না। মরদেহ দেখা শেষে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে; ৬০ কিংবা এর ঊর্ধ্বে যাদের বয়স, তাদের সরাসরি মরদেহের সংস্পর্শে যাওয়া উচিত নয়; নিজ নিজ ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী জানাজা, দাফন বা সৎকার করা যাবে। যারা মরদেহ দাফন করবেন, তাদের গ্লাভস পরে নিতে হবে এবং কাজ শেষে গ্লাভস খুলে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত কারও মৃত্যু হলে মৃতদেহ রোগ ছড়ায় কি ছড়ায় না, সেটা একবাক্যে বলার বিষয় নয়। যেহেতু মৃতদেহ জীবিত মানুষের মতো হাঁচি-কাশি দেয় না, সে কারণে মৃতদেহ থেকে জীবাণু বেরিয়ে আসা সম্ভব না। অতএব, এদিক দিয়ে দেখলে মৃতদেহ জীবাণু ছড়ায় না। কিন্তু মৃতদেহের লালা বা অন্য কোনো ধরনের নিঃসরণ থেকে জীবাণু ছড়াতে পারে।

তবে এটা সবার ক্ষেত্রে নয়, যিনি বা যারা মৃতদেহের গোসল করাবেন কিংবা সৎকারের প্রয়োজনে লাশের কাছাকাছি যাবেন, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে। এ কারণে মৃতদেহের গোসলের সময় অবশ্যই সাবান পানি ব্যবহার করতে হবে। গোসলের সময় সাবান পানি ব্যবহার করলে নিঃসরণ থেকে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। অতএব, কেউ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে আতঙ্কিত হয়ে দাফনে বাধা দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। কারণ দাফন হয়ে যাওয়ার পর মৃতদেহ থেকে কোনো জীবাণু ছড়ানোর কোনো সুযোগই নেই। অতএব, কবরের পাশ দিয়ে চলাচলেও কোনো সমস্যা নেই।

করোনায় মৃতদের দাফনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম অনুসরণ করার কথা বলেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর। তারা বলছেন, করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে ভাইরাস ছড়ায় না। কারণ মৃত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দেন না। তবে যিনি বা যারা মরদেহ গোসল করাবেন, তাদের যথেষ্ট সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ মৃতদেহের লালা থেকে গোসল করানো ব্যক্তির দেহে ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গত ৬ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিলেন, মৃত ব্যক্তির শরীরে করোনা ভাইরাস বাঁচতে পারেনা, তার বৃদ্ধিও হয় না। করোনায় মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য কোন ব্যক্তির শরীরে প্রসারিত হয় না। মৃত ব্যক্তিকে ধর্মীয় মত সাবান দিয়ে গোসল করালে করোনার প্রসার বন্ধ হয়।

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে নির্ভয়ে দাফনের আহবান জানিয়ে ওই বিজ্ঞপ্তিতে তিনি আরো বলেন, করোনা ভাইরাসে মৃত ব্যক্তিক নির্ভয়ে শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী দাফন-কাফন করুন। অন্যরাও নির্ভয়ে নিজ নিজ ধর্মের নিয়মানুযায়ী সৎকার করুন।

মৃতদেহ থেকে করোনা ছড়ানোর যে খবর জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, তা নাকচ করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এ ধরনের দাবির কোন ভিত্তি নেই। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলে ওই মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে তিন-চার ঘণ্টা পরে আর ভাইরাস ছড়ায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের দাবির কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। সব কিছু বিশ্বাস করতে হয় না। মারা যাওয়ার তিন-চার ঘণ্টা পরে গ্লাভস পরে সাবান দিয়ে ভালো গোসল করিয়ে মৃতদেহ কবর দিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।

ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘মৃতদেহ তিন থেকে চার ঘণ্টা পরে দাফন করে দিলে তা থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায় না। করোনার জন্য জীবিত প্রাণী দরকার হয়।’

তিন চার ঘণ্টা পরেও কবর না দিলে করোনা নয়, অন্যান্য রোগ ছড়ানো আশঙ্কা থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিন চার ঘণ্টা পরে কবর না দিয়ে রেখে দিলে অন্যান্য রোগ ছড়াবে। কবর যদি না দেয়, মৃহদেহ যদি বেশিক্ষণ পড়ে থাকে, অন্যান্য পোকা-মাকড়, মশা-মাছি ইদুর-বাদুর নানা রোগ ছড়াবে। করোনা ছড়াবে না। অন্যান্য রোগ ছড়াবে। এজন্য মরে যাওয়ার তিনচার ঘণ্টা পরে গ্লাভস পড়ে সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে কবর দিয়ে দেন। লাশ আটকিয়ে রাখেন না।

দীর্ঘ দিন বিশ্ব স্বা্স্থ্য সংস্থার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় কাজ করেছেন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মোজাহেরুল হক, তিনি মনে করেন, ভাইরাসের দীর্ঘ সময় জীবিত থাকার সুযোগ নেই। এই ভাইরাস ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, মৃতদেহ থেকে সংক্রমণের ঝুঁকির চেয়ে জীবিত ব্যক্তির মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়েই সবার বেশি চিন্তাভাবনা করা দরকার এবং সতর্ক থাকা দরকার। তাহলে আর সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।

ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা নেই বললেই চলে। শুধু মৃত ব্যক্তির ফুসফুস কিছুটা ঝুঁকি তৈরি করে। করোনা ভাইরাসে (Coronavirus) আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্যে (Cremation Of COVID-19 Victims) কোনও সংক্রমণের আশঙ্কা নেই উল্লেখ করে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যেহেতু প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, তাই সংক্রমণ ছড়ানোর কোনও আশঙ্কা থাকছে না। পাশাপাশি এও বলা হচ্ছে বায়ুবাহিত এই রোগ ছড়ানোর কোনও সম্ভাবনা থাকে না। এটি কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির ড্রপলেট থেকে ছড়াতে পারে।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ‘‘দেহ দাহ করার সময় ৮০০ থেকে ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উদ্ভুত হয়। ওই তাপমাত্রায় ভাইরাস বাঁচতে পারে না। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রমাণ মেলেনি দাহ করার সময় যে ধোঁয়া উৎপন্ন হয় তা থেকে করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে।”

এছাড়াও জানানো হয়, যদি প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা হয় তা হলে মৃতদেহ থেকে স্বাস্থ্যকর্মী, মৃতের আত্মীয়স্বজন কিংবা লোকালয়ের কারও শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর কোনও রকম সম্ভাবনা নেই।

পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’-এর বিবৃতি উদ্ধৃত দিয়ে জানানো হয়, করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে কোভিড-১৯ সংক্রমণের কোনও প্রমাণ মেলেনি।

ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইনে বলা রয়েছে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলে সেই দেহের সৎকারের আগে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতেই হবে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দেহটি ঠিকমতো রাখা যায় তাহলে ভাইরাস সংক্রমণের কোনও ঝুঁকি নেই।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির সৎকারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটা গাইডলাইন

করোনায় মৃত ব্যক্তির সৎকারের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটা গাইডলাইন অনুসরণের কথা বলেছে। সে অনুযায়ীই আইইডিসিআরও মৃতদেহ দাফন করার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে।

করোনায় মৃতদের সৎকার নিয়ে এর আগে প্রকাশিত আইইডিসিআরের নির্দেশনায় বলা হয়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বা সন্দেহভাজন কেউ মারা গেলে মৃতদেহ সরানো, সৎকার বা দাফন শুরুর আগে অবশ্যই কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সরকারের চার সদস্যের একটি দল সম্পূর্ণ সুরক্ষা পোশাক পরে মৃতদেহ সৎকার বা দাফনের জন্য প্রস্তুত করবে। মৃত্যুর স্থানেই মৃতদেহ প্লাস্টিকের কাভার দিয়ে মুড়িয়ে রাখতে হবে। দলের নেতা মৃত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের নির্দিষ্ট কোনো অনুরোধ থাকলে তা জেনে নেবেন। কোথায় কবর দেওয়া হবে, সেটিও ঠিক করে রাখতে হবে।

ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে মরদেহ গোসল করানো যাবে না উল্লেখ করে নির্দেশনায় বলা হয়, পরিবারের অনুরোধ থাকলে মরদেহ গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম বা পানি ছাড়া অজু করানো যাবে। আর পরিবারের পক্ষ থেকে কাফনের কাপড়ের জন্য অনুরোধ থাকলে সেলাইবিহীন সাদা সুতি কাপড় কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। কাফনের কাপড় প্লাস্টিকের ব্যাগে রেখে তার ওপর মরদেহ রাখতে হবে এবং দ্রুত ব্যাগের জিপার বন্ধ করতে হবে। ব্যাগে কাফনের কাপড় দেওয়ার সময় যারা মরদেহ উঁচু করে ধরবেন, তাদের অবশ্যই সুরক্ষা পোশাক পরে থাকতে হবে। সৎকারের জন্য মৃতদেহের সব ছিদ্রপথ (নাক, কান, পায়ুপথ ইত্যাদি) তুলা দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে দিতে হবে, যাতে কোনো তরল গড়িয়ে না পড়ে। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে মৃতদেহ সমাধিস্থলে নিয়ে যেতে হবে।

পরিবহনে ব্যবহূত গাড়ি সম্পর্কে নির্দেশনায় বলা হয়, পরিবহনে ব্যবহূত গাড়িতে দুটি অংশ থাকতে হবে, যাতে চালক ও পরিবহন কামরার মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক কাচ বা প্লাস্টিকের আবরণ থাকে। পরিবহনের পর ব্যবহূত বাহনটি জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। এ সময় জীবাণুমুক্ত করার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরতে হবে। দাফনের সময় মৃতদেহ বহনকারী ব্যাগটি কখনোই খোলা যাবে না।

দাফনের পর কবর বা সমাধিস্থল ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার গভীর মাটির স্তর দিয়ে ঢাকার পাশাপাশি দাফন করা স্থানের আশপাশ উপযুক্ত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কারও করার কথাও বলা হয়েছে এই নির্দেশনায়। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তি যে স্থানে মারা গেছেন, সেই স্থানটিও যত দ্রুত সম্ভব জীবাণুমুক্ত করা এবং মৃতদেহ দাফনের পর সেই স্থান ভালোভাবে ঘিরে রাখতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, করোনায় সন্দেহভাজন কারও মৃত্যু হলেও সমান সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আইইডিসিআরে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এসে মৃত ব্যক্তির মুখের লালার নমুনা নিয়ে নিশ্চিত করবেন যে মৃত ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কিনা।
করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ কখনোই ময়নাতদন্ত করা যাবে না উল্লেখ করে নির্দেশনায় বলা হয়, মৃতদেহ পোড়ালেও দেহাবশেষ বা ছাই থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যখন গণহারে মানুষ মারা যায় তখন লাশ পুড়িয়ে ফেলার চেয়ে কবর দেয়া উত্তম। জনস্বার্থের জন্য গণকবর কোন সুপারিশকৃত বিষয় নয়। এতে প্রচলিত সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শগুলো লঙ্ঘিত হতে পারে। তাই লাশ দাফনের সময় সামাজিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো উচিত।

লাশ সৎকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বলেছে, কবরস্থান হতে হবে পানির উৎস, যেখান থেকে পানি পান করা হয় তার থেকে ৩০ মিটার দূরত্বে। আর পানির স্তর থেকে শূন্য দশমিক ৭ মিটার দূরত্বে হতে হবে কবরস্থান।