• আজ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইউলো জোনে কর্ণফুলী, দু’লক্ষাধিক মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

৭:০৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, জুন ৪, ২০২০ চট্টগ্রাম
zone

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: ছোট বড় তেঁতাল্লিশটি শিল্প কারখানা ও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী নিয়ে শিল্পজাত উপজেলা কর্ণফুলী ইউলো জোনে অবস্থান করেছে। ধীরে ধীরে করোনা ছোবলে চরম ঝুঁকিতে হাঁটছে। এতে উপজেলার ৩৫-৪০ হাজার গার্মেন্টস কর্মীসহ প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।

এরই মধ্যে রিপোর্ট পাওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়ে জুলধা ইউনিয়নে একজন বৃদ্ধের মৃত্যু ঘটে। এছাড়া প্রথমদিকে করোনা রোগী বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা পালনে উপজেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থান দেখা গেলেও এখন কার্যক্রম তেমন একটা চোখে পড়ার মতো না। তথ্যমতে, উপজেলায় এ পর্যন্ত আক্রান্তদের বেশির ভাগ রোগীই কোন না কোন গার্মেন্টস এর সাথে জড়িত। এদের বে-সামাল ঘোরাঘুরি আর লকডাউন না মানারও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে করোনা সঙ্কটময় পরিস্থিতি চলছে। তার উপর উপজেলায় নেই কোন নিজস্ব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নেই কোন করোনা টেস্টে নমূনা সংগ্রহের বুথ। উপজেলার কেউ আক্রান্ত হলে ৬/৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পটিয়া কিংবা আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে। এছাড়াও আগাম প্রস্তুতি হিসেবে অস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন হিসেবে কোন ভবন বা কমিউনিটি সেন্টারও তৈরি রাখা হয়নি। ফলে চিন্তিত উপজেলার লাখো মানুষ।

অনেকের প্রত্যাশা উপজেলা যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে এসব ক্লিনিকে নজর বাড়িয়ে, উপজেলায় অন্তত দুজন ডাক্তারের সমন্বয়ে একটি মেডিক্যাল টিম গঠনের। যে টিমটি কোভিড ও নন কোভিড রোগীদের বেসিক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। কিন্তু তাও ভাগ্য জুটছে না কর্ণফুলীর দু’লক্ষাধিক মানুষের। অথচ চিকিৎসা জনগণের মৌলিক অধিকার। চরম উদাসীনতা ও সেবা না থাকায় সব মিলিয়ে কষ্টে পড়েছে উপজেলার সাধারণ মানুষজন। এ নিয়ে স্যোসাল মিডিয়ায়ও নানা আলোচনার ঝড় উঠেছে।

অপরদিকে লক্ষ্য করা যায়, উপজেলায় যারা বিদেশ ফেরত/প্রবাসী কিংবা করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা এতদিন কোয়ারেন্টাইনে ছিলো সেসব ব্যক্তিরাও মুক্ত হয়ে রীতিমত বাজারে ঘাটে মিশে একাকার হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেলেও উপজেলা প্রশাসনের তেমন কোন তদারকি না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন শেষ হওয়ার পর খেয়াল খুশি মত বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়িয়েছে অনেক করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি।

এর মধ্যে সিএমপির এই কর্ণফুলী থানা জোনে ৫৮ জনেরও অধিক করোনা রোগীর রিপোর্ট পজিটিভ আসে। চারদিকে কারখানা, গার্মেন্টস, ভাড়া বাসায় বিভিন্ন এলাকার মানুষের বসবাস। আর এতে ভয় আর আতঙ্কে চাপা ক্ষোভে ভেঙে পড়ে উপজেলাবাসী।

যদিও তড়িঘড়ি করে পুলিশ রাতে আক্রান্ত পরিবারগুলোকে লকডাউন করলেও কতজন রোগী সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে এসেছে এসব হিসাব রাখা দুঃসাধ্য। তাছাড়া কিছু রোগীর নাম-ঠিকানাও সম্পূর্ণ না থাকায় এসব রোগীদের সনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ! পাশাপাশি রিপোর্ট আসার আগে রোগীদের বাড়িতে পাঠানোর মত বুদ্ধিহীনতাও হতভম্ব করেছে সচেতন মানুষকে।

সচেতন মহল বলছেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের আরেকটু তদারকি আর কঠোর নজরধারী থাকলে অসংখ্য মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে বলে তাদের ধারণা। এমনকি বিশেষ করে চরপাথরঘাটার পুরাতন ব্রিজঘাট, কলেজবাজার, মইজ্জ্যারটেক ও ফকিরন্নির হাট বাজার এলাকায় স্বাস্থ্য বিধি ও মাস্ক, গ্লাবস পরিধানে প্রশাসনের কঠোর অভিযান চালানো জরুরি। কেনোনা এসব বাজারের দোকান গুলোতে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যে পরিমাণ মানুষের ভীড় জমছে তাতে কর্ণফুলীতে মহামারি আকার ধারণ করতে সময় লাগবে না এমন আশঙ্কা অনেকের।

জানা যায়, ২৮ শে এপ্রিল কর্ণফুলীতে প্রথম করোনা রোগি শনাক্ত হন ইছানগর গ্রামে ৬৩ বছর বয়সী এক মহিলা। যিনি আক্রান্ত হয়ে জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশনে মারা যান। এরপরে যথাক্রমে- চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে সৈন্যারটেক ডিভাইন ফ্যাক্টরীতে চাকরিরত ৩২ বছর বয়সী গার্মেন্টসকর্মী, শিকলবাহা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে ৩৫ বছর বয়সী যুবক, চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের খোয়াজনগর ৫নং ওয়ার্ডে ৯ বছর বয়সী শিশু, চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে গার্মেন্টসকর্মী ও অন্যজন সিএনজি চালাক, চরপাথরঘাটা ৩নং ওয়ার্ডে ২১ বছর বয়সী নারী গার্মেন্টসকর্মী, চরলক্ষ্যা ৭নং ওয়ার্ড ২৫ বছর বয়সী আরেক নারী গার্মেন্টসকর্মী, শিকলবাহা ২নং ওয়ার্ডে ৪২বছর বয়সি পুরুষ, শাহমীরপুরে ৩০ বছর বয়সি যুবক। এভাবে কর্ণফুলী থানাধীন আনোয়ারার কিছু অংশসহ কোস্টগার্ড এবং বিএফডিসি মিলে উপজেলায় প্রায় ৫৮ জনের মতো আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়। এরমধ্যে দুজনের মৃত্যু ঘটে। আক্রান্ত বাকি রোগীরা চিকিৎসাধীন কেউ নিজস্ব বাসায় বা শহরের হাসপাতালে।

এসব বিষয় নিয়ে বড়উঠানের ইউপি চেয়ারম্যান মো. দিদারুল আলম বলেন, ‘যে কোভিড-১৯ ভাইরাস দেখা যায় না, ধরা যায় না। আক্রান্ত হলে লক্ষণও আবার এখন বুঝা যাচ্ছে না। এ রকম একটি ভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে কি রকম সচেতন ও স্বাস্থ্য বিধি মানতে হবে তা ডবিউএইচও বার বার বলছে। সমস্ত টিভি ও মিডিয়া বার বার শোনাচ্ছে। সরকারও চেষ্টা করছেন। কিন্তু সত্য হলো-কেউ কাউকে বলে স্বাস্থ্য বিধি মানাতে পারবে না সব সময়। মানুষকে নিজ পরিবারের স্বার্থে হলেও নিজেকে সচেতন হতে হবে। তা না হলে কারো আশা করা বোকামি হবে এবং সামনে উপজেলাবাসীর জন্য খারাপ সংবাদ বয়ে আনবে।’

ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর ১২ থানাকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হটস্পট বা রেড জোন হিসেবে শনাক্ত করেছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ। থানা এলাকা করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ এর উপরে গেলে এসব থানাকে রেড জোন হিসেবে শনাক্ত করছেন সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। জেলা স্বাস্থ্য অফিসের তথ্যমতে কর্ণফুলীতে ৫৮জন করোনা আক্রান্ত ফলে যে সব থানা এলাকায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ থেকে ৯০ এর মধ্যে সেসব থানাকে ইউলো জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এরই মধ্যে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহে কর্ণফুলীতে অন্তত দুটি বুথ বসানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর জন্য নেপথ্য থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাননীয় ভূমিমন্ত্রী এবং ব্রাক এনজিও’র সাথে বারংবার যোগাযোগ করছেন উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম হক।

এসব বিষয়ে কর্ণফুলী জোনের সহকারি পুলিশ কমিশনার (এসি) ইয়াসির আরাফাত জানান, ‘করোনা প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মানুষকে ঘরে রাখতে এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা রাত দিন কাজ করছে। আমরা আক্রান্তদের বাড়িতে গিয়ে লকডাউন করেছি। তারা যাতে বাড়িতে অবস্থান করে সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে। এই মুহুর্তে সকলের সচেতনতার বিকল্প নেই। তাই সবাই বাড়িতে থাকুন, পরিবারকে নিরাপদ রাখুন বলে জানান এসি।’

করোনা সঙ্কটকালে কর্ণফুলীর স্বাস্থ্য সেবার সার্বিক বিষয়ও পরিকল্পনা সর্ম্পকে জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নোমান হোসেন জানান, ‘অস্থায়ী মেডিক্যাল টিম বা আইসোলেশন সেন্টার তৈরির এই মুহুর্তে আমাদের কোন পরিকল্পনা নেই। কারণ এখানে সে পরিমাণ ডাক্তার ও লজিস্টিক সার্পোট আমাদের কাছে নেই। তারপরেও আপনারা এই বিষয়ে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে আলাপ করতে পারেন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে ওনাদের কোন পরিকল্পনা আছে কিনা। আসলে ইচ্ছা করলেই হঠাৎ ডাক্তার নার্সসহ বিভিন্ন জনবল দিয়ে আইসোলেশন সেন্টার করার সুযোগ নাই। তারপরেও সিভিল সার্জন মহোদয় যদি করতে চান আমরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব।’

প্রতিনিধি একাধিকবার রিং করেও উপজেলা চেয়ারম্যান ফোন রিসিভ না করায় কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জানতে চাইলে কর্ণফুলীতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ জাবেদ বলেন, ‘জনবল সঙ্কটের কারণে কর্ণফুলী উপজেলায় সেবা প্রদানে সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন মহোদয়কে জানিয়েছি।’