নিজ গ্রাম সিরাজগঞ্জে বাধা এলাকাবাসীর, উপ-কর কমিশনারের দাহ হলো টাঙ্গাইলে

৪:৩৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, জুন ১০, ২০২০ ঢাকা, দেশের খবর

খাদেমুল ইসলাম মামুন, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সোমবার (০৮ জুন) রাতে মারা যান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উপ-কর কমিশনার শুধাংশ সাহা।

গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২৭ তম বিসিএসে প্রথম হওয়া এ মেধাবী কর্মকর্তা কর অঞ্চল-৩ এ কর্মরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার গাড়ামাসি গ্রামে।

মৃত্যুর পর নিজ বাড়িতে শুধাংশের মৃতদেহ দাহ করার কথা ছিল। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করায় গ্রামের লোকজন বিরোধিতা করায় সেখানে দাহ করা সম্ভব হয়নি। পরে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাড়াগ্রামে (শুধাংশের শ্বশুর বাড়ি) পারিবারিক শ্মশানঘাটে তাকে দাহ করা হয়।

বুধবার (১০ জুন) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঘাটাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার। নিজে উপস্থিত থেকে তার মরদেহ দাহ করেছেন বলেও জানান তিনি।

শুধাংশ সাহার স্ত্রী মানসী দাশ বলেন, তার স্বামী করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর নিজ বাড়িতে শুধাংশের মৃতদেহ দাহ করার কথা ছিল। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করায় গ্রামের লোকজন বিরোধীতা করায় সেখানে দাহ করা সম্ভব হয়নি।

পরে বাধ্য হয়ে আমার বাবার বাড়ি (শুধাংশের শ্বশুর বাড়ি) টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার আনেহলা ইউনিয়নের পাড়াগ্রামে তার লাশ নিয়ে যায়। সেখানেও দাহ করার জন্য গ্রামের লোকজন রাজি ছিল না। পরে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তার মৃতদেহ পারিবারিক শ্মশানঘাটে দাহ করা হয়।

তিনি আরো বলেন, আমি ও আমাদের ৬ বছরের মেয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছি। করোনা আক্রান্ত হওয়ায় বাসা লকডাউন করা হয়েছে। বাসা থেকে বের হতে দিচ্ছে না। মৃত্যুকালে আমার স্বামীর কাছে যেতে পারি নাই। তার শেষকৃত্য দেখতে পারি নাই। মেয়েও তার বাবাকে শেষ দেখা দেখতে পেলো না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, পুলিশ প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের লোকজন নিয়ে আমি নিজে উপস্থিত থেকে গতকাল মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে উপজেলার পাড়াগ্রামে শুধাংশ সাহাকে শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক শ্মশানঘাটে শুধাংশ সাহার মরদেহ দাহ করি। তার স্ত্রী ও সন্তান করোনা আক্রান্ত থাকায় দাহ কার্যে পরিবারের কেউ উপস্থিত ছিল না।

এ নিয়ে ইউএনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যটাসও দেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘কিছুদিন আগেও যে ছেলেটাকে নিয়ে এলাকাবাসী গর্ব করত? যার পরিচয় দিতে আত্মীয়-স্বজন, ভাই বোন, বন্ধু বান্ধব, প্রতিবেশী গর্ববোধ করত? পরক্ষণেই সেই আদরের ছেলেটি চক্ষুশূল হয়ে গেল? কি তার অপরাধ? তার অপরাধ একটাই সে বৈশ্বিক মহামারীর শিকার। সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে!

ধিক্কার জানাই এ সমাজ ব্যবস্থাকে। যে সমাজ চোর, বাটপার, লুটতরাজ, মুনাফাখোর, ঘুষখোর, নারী পাচারকারী, মাদক পাচারকারী, টেন্ডারবাজ, ধর্ষক, খুনী, দেশদ্রোহীতা কোন কিছুকেই এত ঘৃণার চোখে দেখে না? যতটা না ঘৃণ্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্তকারী অথবা আক্রান্তকারীর পরিবার।

বলছিলাম করোনায় আক্রান্ত হয়ে উপ-কর কমিশনার (বিসিএস ট্যাক্স) শুধাংশ সাহা মৃত্যুবরণ করার পর তার মৃতদেহ গ্রামের বাড়িতে দাহ করতে বাধা দেয়ার কথা? মানবিকতা কোথায় এসে দাঁড়ালো! নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে সময়ের শ্রেষ্ঠ মেধাবীকে সম্মান জানাতে পেরে। শুধাংশু সাহারা কোন অপরাধ করেনি, উনি বৈশ্বিক মহামারির শিকার।’