সাভারে ও আশুলিয়ায় করোনাকালে থেমে নেই গ্যাস চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য

১০:৫৪ অপরাহ্ণ | রবিবার, জুন ১৪, ২০২০ ঢাকা
gas

মোঃ মনির মন্ডল, নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভারঃ ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ”। করোনায় গোটা জাতি যখন বিপর্যস্ত, ঠিক তখন এই ভাইরাসকে আশীর্বাদ হিসেবে নিয়েছে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। এসব ব্যবসায়ীরা করোনাকে পুঁজি করে অবৈধভাবে গ্যাসের পুনঃসংযোগ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান চালিয়ে অর্জিত সফলতাকে ব্যর্থতার রূপ দিয়েছে এসব চোরাকারবারিরা।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিপনণ বিভাগ, সাভার শাখার তথ্য মতে, গেলো বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৭ হাজার ১৬০ টাকা ব্যয়ে সাভার ও আশুলিয়ার ২২১ টি স্পটে প্রায় ৬২ টি অভিযান পরিচালনা করে শক্ত অবস্থানের জানান দিয়েছিলেন সাভার তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। সাভার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (বিক্রয়) প্রকৌশলী আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েমের নেতৃত্বে ঘন ঘন উচ্ছেদ অভিযানে মুখ থুবড়ে পড়েছিলো গ্যাস চোরাকারবারিদের চোরাই ব্যবসা।

এসব অভিযানে প্রায় ১৯৮ কিলোমিটার বিভিন্ন সাইজের ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮০ টি চোরাই গ্যাস সঞ্চালনের পাইপ অপসারণ করা হয়। জব্দ করা হয় ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৫ টি বার্নার। একই সাথে ২ হাজার ৯২০ জনকে আসামি করে করা হয় ১০ টি মামলা। এসব মামলায় গ্রেফতার করা হয় দুই জন ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে দুই চোরাকারবারিকে। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হয় ৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। তবে করোনার কারণে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান বন্ধ থাকায় পুনঃসংযোগ দিয়ে তিতাসের ব্যয় করা কোটি কোটি টাকা ফেলেছে জলে ও পণ্ডশ্রমে পরিণত হয়েছে তিতাসের সকল কর্মকান্ড।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বার্থান্বেষী মহলকে ম্যানেজ করে আশুলিয়ার, বাংলাবাজার, নিশ্চিন্তপুর, দিয়াখালি, ঘোষবাগ, তৈয়বপুর, কাঠগড়া, মানিকগঞ্জ পাড়া, নরসিংহপুরসহ প্রায় সকল স্পটে পুনঃসংযোগ দিয়েছে রাষ্ট্রের সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস চোরাকারবারীরা। প্রতি সংযোগ বাবদ হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। কেউ কেউ আবার রাষ্ট্রীয় সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাসকে নিজস্ব সম্পদে পরিণত করে অবৈধ সংযোগ দিয়ে প্রতিমাসে গ্যাসের বিল বাবদ হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

আশুলিয়ার আয়নাল মার্কেট এলাকার বৈধ গ্যাস ব্যবহারকারী এমদাদ হোসেন বলেন, বিচ্ছিন্ন থাকা অবৈধ গ্যাস সংযোগ গুলো পুনঃসংযোগ দেওয়ায় গ্যাসের প্রেসার কমেছে প্রায় ৫ গুন। এখন সারা দিনে কেবল একবার গ্যাস পাচ্ছি। তাও আবার ভোরে। এ সময়ই সারা দিনের রান্নার কাজ শেষ করতে হয়। এসব অবৈধ সংযোগের জন্য বৈধ সংযোগ গ্রহীতারা রয়েছে চরম কষ্টে। এসময় দ্রুত ব্যাবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাড়িওয়ালা বলেন, আমাদের এই এলাকা শিল্প অধ্যুষিত এলাকা। এখানে তেমন কোন ফসল উৎপাদন হয় না। আমারা বাসা ভাড়াকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছি। লাখ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে আমরা বাড়ি নির্মাণ করেছি। এখানে পোশাক শ্রমিকরা গ্যাস না থাকলে বাড়ি ভাড়া নিতে চায় না। মাসের পর মাস বাড়ি খালি থাকে। আমরা ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋনের কিস্তি পরিশোধ করতে পারি না। তাই বৈধ অবৈধ না দেখে অনেক বাড়িওয়ালাই গ্যাসের সংযোগ নিতে বাধ্য হয়।

আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার ভাড়াটিয়া পোশাক শ্রমিক সুবর্ণা বলেন, সময়ের সীমাবদ্ধতায় আমাদের চলতে হয়। সকাল ৮ টার আগে রান্না শেষ করে খেয়ে আবার ৮ টার আগেই কাজে যোগ দিতে হয়। দুপুরে সময় দেওয়া হয় ১ ঘন্টা। রাত ৮ টা কিংবা ১০ টায় ফিরে এই অল্প সময়ের মধ্যে লাকড়ি দিয়ে রান্না করে খাওয়া সম্ভব নয়। তাই গ্যাস সংযোগ থাকা বাড়িতে একটু ভাড়া বেশি হলেও আমাদের সুবিধা হয়।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিপনণ বিভাগ সাভার শাখার উপ-ব্যবস্থাপক ও অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন অভিযানের সমন্বয়কারী আব্দুল মান্নান পুনঃসংযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পুণঃসংযোগের কিছু তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে আমরা আইন শৃঙ্খলাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন ও বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থাসহ তিতাস গ্যাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগীতায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা শুরু করবো।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিপনণ বিভাগ, সাভার শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বলেন, অবৈধভাবে উচ্ছেদকৃত লাইনের পুনঃসংযোগের তথ্য পাওয়া গেলে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।