বারো বছর ধরে বক-পানকৌড়ির বসতি!

১১:১৯ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২০ ফিচার
bokk

এস আই মুকুল, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে চরফ্যাসন-ভোলার আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে ফটো সাংবাদিক নাইম আহমেদ কে নিয়ে যাচ্ছিলাম সংবাদের খোঁজে। চরফ্যাসন উপজেলা ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অতিক্রম করতেই মাথার উপর দিয়ে ডানা জাপটে উড়ে গেল মস্ত বড় সাদা বক।

থেমে গেলাম সড়কের পাশে। পেছনে ফিরে তাকাতেই নজর পড়ে সড়ক ঘেঁষা রেইনট্রি গাছের দিকে। সাদা বকে ঢেকে গেছে সবুজ পাতা। ঠিক যেন সাদার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সবুজ। পাশের গাছগুলোতে হাজার খানেক সাদা বক। বাসা করার উপযোগী কোনো ডালই আর বাকি নেই।

মোটরসাইকেল থেকে নেমে একটু এগুতেই আমাদের সাথে ডেকে নিলাম ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অফিসার মোঃ ইমরান হোসেন কে। পাখির এ অভয়ারণ্য দেখতে কৌতুহলী হয়ে তাকে নিয়েই পাখির দখলে থাকা বাড়ির ভেতর ঢুকতেই নাকে লাগে পাখির বিষ্ঠা আর গায়ের বোঁটকা গন্ধ।

কয়েকটি গাছের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, পুরোগাছ কালো। অবাক হলাম। আবার ভাবলাম হয়ত কাকের বসতি। কিন্তু, আরও কাছে গিয়ে দেখলাম, গাছটি আসলে পানকৌড়িতে ভরা। এ অপরূপ দৃশ্য দেখার মতো! সচরাচর পানকৌড়িদের এভাবে থাকতে দেখা যায় না। কয়েক শতাধিক পানকৌড়ি আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে। ঠিক যেমন করে নিজের বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকে মানুষ। তাদের আবার ভারি সখ্যতা সাদা বকগুলোর সঙ্গে। উভয়ের লক্ষ্য একটাই, মাছ ধরা। কিন্তু তাতে কী! এখানে যেন কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। মিলে-ঝিলেই থাকে তারা। এ চিত্র ভোলার চরফ্যাসন পৌরসভা ২নং ওয়ার্ডের কালু মাঝি বাড়ির গাছগুলোতে।

চরফ্যাসন উপজেলা ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন পূর্ব-দক্ষিণ পাশে বিশাল বাড়ির চারপাশ ঘেরা গাছগুলোতে তাদের বসতি।

ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা তাক করলেও পাখিদের মধ্যে কোনো ভয়-ভাবান্তর নেই। মানুষের সাড়া পেলে পাখিরা যে তীক্ষ্ণ নজর রাখে, এখানে তাও নেই। অবাক করা বিষয় হলো পাকা সড়কের এতো কাছের দৃষ্টিসীমায় পাখিগুলোর নিশ্চিন্ত মনে বসে থাকার ভরসারই বা কারণ কি?

এ সময় কথা হয় বাড়িটির গৃহকর্তা মোঃ ইয়াছিন মাঝি (৬০) এর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘প্রায় ১২ বছর যাবত এই বাড়িতে আবাসস্থল গড়ে তোলে এ পাখিগুলো। এদের কলরবে সবসময় মুখরিত হয়ে থাকে বাড়িটি। সকালে খাবারের উদ্দেশ্যে সবগুলো পাখি বেরিয়ে পড়ে। আবার বিকেলে ধীরে ধীরে বাসস্থানে ফিরতে থাকে। সারা বছর পাখিগুলো এখানে থাকে না। বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত প্রজননকালে তারা এখানে আসে। ১২ বছর ধরে কোনো বছরেই ব্যতিক্রম হয়নি। পাখিগুলো নিশ্চিন্তে বংশবিস্তার করে আবার চলে যায়। পথচারীরা এমন দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যান।’

তবে পাখির কলরবে মুখরিত হলেও লেকসান গুনছে ইয়াছিন মাঝি। তিনি জানান, ‘পাখির বিষ্ঠার কারণে আমার পুকুরের পানি নষ্ট হচ্ছে, দৈনন্দিন কাজে তা ব্যবহৃত করতে পারছিনা। টিনের চালে পাখির বিষ্ঠা পড়ায় মড়িচা ধরে, তাতে প্রতি বছর আমার বসতঘরের টিনের চাল পরিবর্তন করতে হয়। এছাড়াও ফলগাছগুলোর ক্ষতি হচ্ছে। পাখিগুলোর প্রতি ভালোবাসা থাকায় এসব কিছু সহ্য করে যাচ্ছি। পাখিদের এ আবাসস্থল (অভয়াশ্রম) নিরাপত্তা ও আমার এ ক্ষতি সাধন রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নিলে উপকৃত হব।’

চরফ্যাসন উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন অফিসার মোঃ ইমরান হোসেন বলেন, ‘গ্রামগঞ্জের আনাচে কানাচে সচরাচর পাখির বিচরণ দেখা যেতো। সম্প্রতি বিভিন্ন কারণে এসব দৃশ্য আর চোখে পড়ছে না। দেশীয় প্রজাতির প্রাচীনতম গাছ বিলুপ্ত, খাবার সংকট, জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ এসব কারণে পাখি নিরাপদ আবাসভূমি হারাচ্ছে। কালু মাঝি বাড়ির গাছগুলোতে পাখিদের এ আবাসস্থল আমাদের অফিসের পাশে থাকায় কিছুটা নিরাপদ আছে। যেটুকু সম্ভব আমার স্টাফরা খেয়াল রাখে যেন, কেউ পাখিদের বিরক্ত না করে। তবে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হলেও কিছু সংখ্যক শিকারিদের অপতৎপরতা রয়েছে।’

এ বিষয়ে চরফ্যাসন উপজেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তর এর ভেটেরিনারি সার্জন ডাঃ মোঃ আতিকুর রহমান সময়ের কণ্ঠস্বর কে বলেন- ‘পাখিদের প্রতি ইয়াছিন মাঝি’র এমন ভালোবাসা সত্যিই আমি বিস্মিত। পাখিদের এ আবাসস্থল আমি দেখিনি। তবে সরেজমিনে যাব। পাখির অভয়াশ্রমের নিরাপত্তা ও ইয়াছিন মাঝি’র ক্ষতি সাধন রক্ষায় উপজেলা নির্বাহি আফিসার রুহুল আমিন স্যার এর সাথে আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলব।’

তিনি আরো বলেন, বক, পানকৌড়ি প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে পরিবেশের ভারাসাম্য রক্ষা করে। এদের বিষ্ঠা ফসলি জমির উর্বরতা বাড়ায় ও বিল-ঝিলের প্রাকৃতিক মাছের খাদ্যের উৎস হিসেবে কাজে লাগে। সে কারণে পাখি ও প্রকৃতি সংরক্ষণে সবার এ বাড়ির মানুষের মতো পাখিবান্ধব হওয়া দরকার।