সংবাদ শিরোনাম
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় আসামি মাহফুজুর রহমান গ্রেফতার | গাজীপুরে পিবিআইয়ের অভিযানে অপহরণকারী চক্রের  ২সদস্য গ্রেফতার | সিলেট এবং খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের প্রতিবাদে গাজীপুরে ছাত্রদলের বিক্ষোভ | শিল্পপতি হাসান মাহমুদ চৌধুরীর মৃত্যুতে ভূমিমন্ত্রীর শোক | বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড দলকে অভিনন্দন জানালেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী | ‘শেখ হাসিনার জন্যই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে’- মেয়র তাপস | ‘নভেম্বরে আসতে পারে করোনার ভ্যাকসিন’- স্বাস্থ্যমন্ত্রী | শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির বাতিঘর ও কাণ্ডারি: শিক্ষামন্ত্রী | শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও এইচএসসি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন শিক্ষামন্ত্রী | দেশে ইতিহাস বিকৃতির জনক জিয়াউর রহমান: কাদের |
  • আজ ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শতবর্ষে ‘জাতির বাতিঘর’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১১:১৪ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, জুলাই ১, ২০২০ শিক্ষাঙ্গন, সুখবর প্রতিদিন

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- জাতির গৌরব ও গর্বের প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন আজ। ৯৯ বছর পূর্ণ করে আজ এ বিশ্ববিদ্যালয় পা রাখছে শতবর্ষে। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা রাখা বিশ্বের অনন্য এই বিদ্যাপীঠ স্বীকৃত ‘জাতির বাতিঘর’ হিসেবে। শুধু শিক্ষা ও গবেষণায়ই নয়, জাতীয় প্রয়োজনের ক্রান্তিলগ্নে জাগরণের ভিত্তিভূমি হিসেবে কাজ করেছে এ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

১৯২১ সালের ১ জুলাই, আজকের এই দিনে পূর্ববাংলায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এ বিদ্যাপীঠ। সেই থেকে দিনটি পালিত হয়ে আসছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য- ‘শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’

বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী প্রতি বছর জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। কিন্তু এবার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনার কারণে ১০৩ দিন ধরে বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ যে শিক্ষার্থী, তাদের পদচারণাশূন্য ফাঁকা ক্যাম্পাসেই কাটবে দিনটি। তারপরেও এবার স্বল্পপরিসরে দিবসটি উদযাপনের সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এসব কর্মসূচির মধ্যে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। উড়ানো হবে বেলুন। সকাল ১১টায় অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনলাইন ভার্চুয়াল মিটিং প্ল্যাটফর্ম জুমের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম সংযুক্ত হয়ে ‘শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রসঙ্গ: আন্দোলন ও সংগ্রাম’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদর্পণের এই দিনটি উদযাপন প্রসঙ্গে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘মুজিববর্ষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম জন্মবার্ষিকী একই সালে হওয়ায় এর আলাদা একটি তাৎপর্য রয়েছে। তবে করোনা মহামারির কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম জন্মবার্ষিকী পালন করতে পারছি না আমরা। সংক্ষিপ্তভাবে স্বল্প পরিসরেই এবারের আয়োজন সাজানো হয়েছে।’

জানা যায়, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য বাঙালি জাতির স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়। ব্রিটিশ শাসকেরাও বিভিন্নভাবে বাঙালিদের দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। যার ফলে জাতি হিসেবে বাঙালির উন্নতির ধারা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। তবে এর পাশাপাশি বাঙালি সমাজের একটি অংশের শিক্ষিত হওয়ার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। এই শিক্ষিত সমাজই প্রথম বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভব করেন।

তবে বাঙালির আর সব অর্জনের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিল। বাঙালি নাগরিক সমাজের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের দীর্ঘ বোঝাপড়ার ফসল এই বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গভঙ্গ রদের অল্প কিছুদিন পরেই ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সময়টি ছিল ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। এই ঘোষণা পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, মননশীলতায় নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে বাঙালি শিক্ষিত সমাজ।

১৯১২ সালের ২৭ মে গঠিত হয় ১৩ সদস্যবিশিষ্ট নাথান কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব অর্পিত হয় নাথান কমিশনের ওপর। ১৯১৩ সালে নাথান কমিশনের ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সে বছরের ডিসেম্বর মাসেই রিপোর্টটি অনুমোদিত হয়। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হয়। কিন্তু এর পরবর্তী বছরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের পথে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই যুদ্ধ।

তবে এত সব প্রতিকূলতার মধ্যেও নাগরিক সমাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান। ১৯১৭ সালে স্যাডলার কমিশন ইতিবাচক রিপোর্ট দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ধাপ তৈরি হয়ে যায়। অবশেষে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভায় ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ১৯২০’ পাস হয়। ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এই বিলে সম্মতি প্রদান করেন।

এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সব সন্দেহের অবকাশ ঘটে। এই আইনকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইনটির বাস্তবায়নের ফলাফল হিসেবে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’।

প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনার বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের সমাজ-সংস্কৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটতে থাকে। ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ। ছাত্র সংসদ ভূমিকা রাখে ছাত্রদের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামকে সংগঠিত করতে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কার্জন হল প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানায়। ভাষা আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপদান করতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করে। ভাষা আন্দোলনকে সংগঠিত করতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেই গৃহীত হয়। ভাষাশহীদ আবুল বরকত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই। ’

৬২–এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯–এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১–এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি যুক্ত। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। মার্চ মাসজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন–সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। ২৫ মার্চের ভয়াল কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতেই প্রথম আক্রমণ চালানো হয়। সংগ্রামী মনোভাবের কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল।

মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্রাধিক ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীকে হত্যা করা হয়। ছাত্রদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধেও যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি বিশ্লেষণ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে বলা হয়ে থাকে, সাধারণত দেশ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামকে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯০–এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনও এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতারই অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাঙালি ও বাঙালিরই ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত। তাই স্বাভাবিকভাবেই দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই সবার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। দেশের ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনস্বীকার্য অবদান রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এখনো প্রতিবছর দেশের সর্বাধিক গ্র্যাজুয়েট এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তৈরি হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ছাত্র। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

বছরের পর বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের নেতৃত্বের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদবি থেকে শুরু করে শিক্ষা, শিল্প, অর্থনীতিসহ দেশের প্রতিটি সেক্টরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অবাধ বিচরণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখনো পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।