• আজ ৩রা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ছয় মাসে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা আরও বেড়েছে

১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২০ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- চলতি ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলি ও নির্যাতনে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সংগ্রহ করা তথ্যে দেখা গেছে।

এসব তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত সীমান্তে ২৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের সৈন্যদের গুলিতে।

মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশের অন্যতম বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র এই তথ্য জানিয়েছে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট তৈরি করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বা আসক।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে উন্নতি ঘটলেও তার প্রতিফলন দেখা যায়নি দুই দেশের সীমান্তে। সীমান্তহত্যা বন্ধে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হলেও তাতে সীমান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেনি, বরং মাঝে কিছুটা কমার পর সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আবার বেড়ে চলেছে।

তবে বিএসএফ কর্মকর্তারা বিবিসি বাংলাকে জানান যে সীমান্তে অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা ভারতীয় প্রহরীদের ওপরে আক্রমণ করলে তবেই কেবল প্রাণ বাঁচাতে তারা গুলি চালিয়ে থাকেন।

সীমান্তে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড
গত বছরের প্রথম ছয়মাসে সীমান্তে যতগুলো হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এই বছরের প্রথম ছয়মাসে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছিল, আর নির্যাতনে মারা গেছেন দুই জন।

অথচ ২০২০ সালের প্রথম ছয়মাসে সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পুরো সময়টায় ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বা বিএসএফ’র হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪৩ জন বাংলাদেশি – যাদের মধ্যে ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন গুলিতে, আর বাকি ৬ জনকে নির্যাতন করে মারা হয়।

কিন্তু ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালে সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন এমন বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ১৪ জন। সে হিসেবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০১৯ সালে প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়।

চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোয়। অন্যদিকে, জুন মাসেই যশোরে বিএসএফের গুলিতে একজন নিহত আর একজন আহত হয়েছেন।

সেখানকার স্থানীয় সাংবাদিক সাজেদ রহমান বলেন, যশোরের বেনাপোল সীমান্তে যে এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নেই কিংবা নদী এলাকা, সেখানেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেশি ঘটছে।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন যে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে মোট ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন।

বছরভিত্তিক সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০০৯ সালে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে মারা যান ৬৬ জন বাংলাদেশি, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ ও ২০১২ সালে ২৪ জন করে, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন এবং ২০১৮ সালে ৩ জন মারা যান সীমান্তে।

তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে সীমান্তে হত্যার সংখ্যা অনেক বেশি।

সীমান্তে হত্যা বন্ধ হয় না কেন?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে।

সীমান্তে হত্যা বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালের এপ্রিলে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয় দুই দেশের মধ্যে। সেখানে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনায় প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার না করতে একমত হয় দুই দেশ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন দেখা যায়নি সীমান্তে।

যশোরের সাংবাদিক সাজেদ রহমান বলেন, “আমাদের এখানে যারা হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের ৯০ শতাংশ গরু আনতে ভারতে গিয়েছিলেন। আর ১০ শতাংশের বিরুদ্ধে চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। সবগুলো গুলির ঘটনা ঘটেছে রাতের বেলায়।”

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংখ্যাগত দিক থেকে দেখলে এ রকম ঘটনা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে মনে হতে পারে।

“কিন্তু এই অপরাধ তো সীমান্তের একটা নৈমিত্তিক ঘটনা, সে কারণে পদ্ধতি অনুযায়ী ওদের সাথে আমাদের যে যোগাযোগ করার কথা, সেটা সবসময়েই চলমান রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সীমান্ত মানেই কিছু অপরাধ ঘটে। সেগুলো বন্ধ করার জন্য আমাদের কার্যক্রম যা যা করার, সেটা আমরা নিয়মিত করে যাচ্ছি।”

গুলি করে হত্যা করা ছাড়া কি আর কোন বিকল্প নেই?
সীমান্তে হত্যা শূন্যতে নামিয়ে আনা আর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার ব্যাপারে দুই দেশের সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেকবার সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার চলছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলছেন, “দুই দেশের সরকারের নানা বৈঠকে সীমান্তে হত্যা জিরোতে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি আমরা দেখেছি। কিন্তু সেটার ব্যত্যয় সব সময়েই ঘটছে, যা উদ্বেগজনক।”

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “সীমান্তে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়, তাদের পর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বার্তা যায় কি-না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। নাকি এটা মিটিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে?”

তিনি বলেন, দারিদ্র বা ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে মানুষ অনেক সময় সীমান্ত পারাপারের চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে তাদের গুলি করে হত্যা না করে সহনশীল আচরণের মাধ্যমে তাদের বিরত করা উচিত।

তাঁর মতে, সেটা নির্ভর করে সীমান্তে যারা দায়িত্বরত রয়েছেন, তারা কেমন আচরণ করেন – তার ওপর।

“সরকারের উচ্চপর্যায়ে কাগজে-কলমে মিটিংয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেটাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্য যা যা করা দরকার, দুই পক্ষ থেকে যদি সেটা করা হতো, তাহলে সীমান্তে এমন হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা আর ঘটতো না,” বলছেন নীনা গোস্বামী।

বিজিবির মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান বলছেন, “আমরা তো সার্বক্ষণিকভাবেই সীমান্তে নিয়োজিত আছি। সীমান্তহত্যা বন্ধে সারাবছর ধরেই আমাদের কর্মকাণ্ড চলমান আছে। বিএসএফের সাথে আমাদের যোগাযোগও সবসময় চলমান আছে। বর্ডার কিলিংয়ের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পতাকা বৈঠক – সেগুলো নিয়মিতভাবে করা হয়।”

বাংলাদেশিরাও যেনো অবৈধভাবে সীমান্তে না যায় সে ব্যাপারেও সীমান্ত এলাকার মানুষকে সতর্ক করার কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, এক সময় ভারত থেকে আসা গরুকে বাংলাদেশের খাটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে আইনি একটা ভিত্তি দেয়া হতো। কিন্তু গত ছয়মাস ধরে সীমান্ত এলাকার খাটালগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।