পঞ্চগড়ে দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ, ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২০ দেশের খবর, রংপুর

নাজমুস সাকিব মুন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি- পঞ্চগড়ে দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলায় দুর্যোগ সহনীয় অধিকাংশ ঘর নির্মাণে নিম্মমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে উপকারভোগীদের অভিযোগ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে গৃহহীনদের জন্য ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়।

জানা যায়, প্রতিটি বাড়ি নির্মাণের জন্য ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩১ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিটি বড়িতে দু’টি কক্ষ, দু’টি বারান্দা, একটি রান্নাঘর, একটি করিডরসহ রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবস্থা। থাকছে টিউবয়েল সুবিধাও।

তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বছর গড়াতেই এই ঘরগুলোর টেকসই নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে নির্মিত ঘরগুলোর বেশির ভাগই এতটাই নিম্মমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যে বর্তমানে ঘর ভেঙে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে তারা।

এদিকে গত ১৪ মে দুর্যোগ সহনীয় ঘরের পিলার ও দেয়ালে ফাঁটল এবং পিলার ভেঙে পড়ার কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা পরে ভাইরাল হয়ে যায়।

ছবিগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর ১৭ মে রাতে উপজেলার সোনাহার ইউনিয়নের মল্লিকাদহ জেলেপাড়া এলাকার হাসনা বেগমের বাড়ির দেয়ালের ফাটল লুকাতে নতুন করে পলেস্তারা করা হয়। সেই সাথে ভেঙে পড়া পিলার নতুন করে নির্মাণ করে দেয়া হয়।

সরেজমিন অনুসন্ধানে এবং একাধিক উপকারভোগীদের সাথে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। সোনাহার ইউনিয়নের উপকারভোগী হাসনা বেগম জানান, ঘরের নির্মাণ কাজ এতটাই নিম্মমানের হয়েছে ঝড় বৃষ্টি হলে বাধ্য হয়ে পাশের পুরনো ছাপড়া ঘরে রাত্রি যাপন করেন। সেখানেও বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে। কিন্তু জীবন বাঁচানোর তাগিদে ছাপড়া ঘরেই থাকতে হয়।

সোনাহার বাজারপাড়া এলাকার উপকারভোগী অনিতা রানী রায় জানান, ঘরের ফাউন্ডেশন না থাকায় সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকি। ঘর নির্মাণের সময় রাজমিস্ত্রীদের ভাল করে কাজ করার কথা বললে উল্টো ধমক দিয়ে বলতো এর থেকে ভাল কাজ হবে না। ঘর নির্মাণকালীন সময়ে উপজেলা প্রশাসনের কোন প্রতিনিধি আসেননি বলে জানান তিনি। ঘর পেলাম কিন্তু নিরাপত্তা পেলাম না বলে আক্ষেপ করেন অনিতা।

সুন্দরদিঘী ইউনিয়নের কিত্তিনায়াপাড়া আরাজীর সুবোল চন্দ্র রায় জানান, এখনো ঘরে তেমন ফাঁটল দেখা না দিলেও দেয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়েছে।

চিলাহাটি ইউনিয়নের বলরামপুর প্রধানপাড়া ইউনিয়নের সুবোল চন্দ্র রায় জানান, লিন্টেল ঢালাই ছাড়াই ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সামান্য ঝড় হলেই ঘর কাঁপতে শুরু করে। ঘরের ফাঁটল ঠিক করতে নিজেই সিমেন্ট লাগিয়েছি। ৪ ট্রলি বালুর খরচ দিতে হয়েছে আমাকে। ঘরের নিম্মমানের কাজ নিয়ে প্রশ্ন করায় উল্টো আমাকেই রাগ দেখিয়েছে।

টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের খারিজা ভাজনী চানপাড়া এলাকার বুলবুল জানান, ঘরের ভিত না থাকায় আতঙ্কে দিন কাটছে। ঘরের দেয়ালে চির চির করে ফাটল ধরেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরো উপজেলার চিত্র প্রায় একই। অল্প কিছু ব্যতীত প্রায় সবগুলো ঘরের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। উপকারভোগীরা দরিদ্র হওয়ায় পারছে না নতুন করে ঘর নির্মাণ করতে। অন্যদিকে ঝড় বৃষ্টিতে পাকা ঘরে দিন কাটছে অত্যন্ত শঙ্কায়।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ রোকনুজ্জামানের মুঠোফোনে কল করলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোন রেখে দেন।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির উপদেষ্টা ও উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক চিশতী সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, উপকারভোগীরা অভিযোগ প্রদান করলে কমিটির সদস্যদের মিটিংয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ঘরগুলোর নির্মাণ কাজে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যয় হাসান জানান, ঘরগুলোর ভিত্তি আছে কিনা এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কাজের মান যেমনই হোক না কেন কিছু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক চেষ্টা করছেন সাবটেজ (নাশকতা) করার জন্য। সাবটেজ করার জন্য তারা সেখানে গিয়ে খনন কাজ চালাচ্ছেন, ভাঙচুর চালাচ্ছেন। সরকারের উন্নয়ন কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তারা এমনটা করছেন। তবে উপকারভোগীরা লিখিত অভিযোগ জমা দিলে তাদের সহয়তা করার চেষ্টা করব।

ঘর নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে সোনাহার মল্লিকাদহ ইউপি চেয়ারম্যান রহিমুল ইসলাম বুলবুল ও টেপ্রীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে আমরা থাকলেও ঘর নির্মাণ কার্যক্রম তদারকি করেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়। আমরা শুধু উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়ন করে উপজেলা প্রশাসনে জমা দিয়েছিলাম।