• আজ ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জাতীয় কবি নজরুলের কবিতায় “কোরবানি”

২:৩৪ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, জুলাই ৩১, ২০২০ শিল্প-সাহিত্য
naz

শিল্প-সাহিত্য ডেস্কঃ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক বিস্ময়কর কাব্যমেধার নাম যাঁকে কোন দেশ-কাল-পাত্রের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন। তাঁর কবিতা ও গান প্রথমত স্পর্শ করেছে মানবতাকে। দেশাত্মবোধ, স্বজাত্যবোধ, অসাম্প্রদায়িকতাবোধ সহ সামাজিক ও মানবিক জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর লেখনিতে।

ইসলামের অনন্য উৎসব ঈদুল আজহা। বিশ্বের মুসলমানরা যে মুসলিম পরিচয় বহন করে। সেই পরিচয়ের প্রতিষ্ঠাতা হলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। তাই এ জাতিকে বলা হয় মিল্লাতে ইবরাহিম বা ইবরাহিমের জাতি। ত্যাগের পরীক্ষায় বহুবার তিনি হয়েছিলেন পরীক্ষিত।

প্রাণের চেয়ে প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর নামে কোরবানি করতে এতটুকুও ছিল না দ্বিধা-সঙ্কোচ। মানুষকে বধ করা ছিল না স্রষ্টার উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য ছিল ইবরাহিমের হৃদয় পরখ করা। উত্তীর্ণ হলেন ইবরাহিম (আ.)। আল্লাহ পাঠিয়ে ছিলেন দুম্বা। ইসমাইলের (আ.) পরিবর্তে সেই দুম্বা জবাই হয়ে গেল। সেই থেকে অদ্যাবধি চলছে ঈদুল আজহার পশু কোরবানি।

কিন্তু এ ঘটনার অন্তর্নিহিত শিক্ষা যে ত্যাগ তা ভুলে গিয়ে আমরাও কি আচারসর্বস্ব হয়ে যাইনি। আমাদের আচরণের ভেতর যে দর্শন বিচরণের কথা ছিল তা কোথায়?

নজরুল তো সেই কথাই বলেছেন তার ‘কোরবানি’ কবিতায়।

সময়ের কণ্ঠস্বরের পাঠকদের জন্য কবিতাটি নিচে দেয়া হলঃ

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্‌খা ক্ষুব্ধ মন!
ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,–
আজিকার এ খুন কোর্‌বানির!
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির-সেরা আজি। –রহমান কি রুদ্র নন?
বাস্‍! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর ‘খুন দে, জান দে, শির দে বৎস’ শোন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
খঞ্জর মারো গর্দানেই,
পঞ্জরে আজি দরদ নেই,
মর্দানি’ই পর্দা নেই
ডর্‌তা নেই আজ খুন্-খারাবিতে রক্ত-লুব্ধ মন!
খুনে খেল্‌ব খুন্-মাতন!
দুনো উন্মাদনাতে সত্য মুক্তি আন্‌তে যুঝ্‌র রণ।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
চড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
মুস্‌লিমে সারা দুনিয়াটার।
‘জুল্‌ফেকার’ খুল্‌বে তার
দু’ধারী ধার্‌ শেরে-খোদার রক্তে-পূত-বদন!
খনে আজকে রুধ্‌ব মন!
ওরে শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
‘আজাদি’ মেলে না পস্তানোয়!
দস্তা নয় সে সস্তা নয়!
হত্যা নয় কি মৃত্যুও? তবে রক্ত-লুব্ধ কোন্
কাঁদে-শক্তি-দুঃস্থ শোন্–

‘এয়্‌ ইব্‌রাহিম্ আজ কোর্‌বানি কর শ্রেষ্ঠ পুত্রধন!’
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
এ তো নহে লোহু তরবারের
ঘাতক জালিম জোর্‌বারের!
কোরবানের জোর-জানের
খুন এ যে, এতে গোর্দা ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন!
এতে মা রাখে পুত্র পণ্!
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরাল বলির পূত বসন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
এই দিনই ‘মীনা’-ময়দানে
পুত্র-স্নেহের গর্দানে
ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে
রেখেছে আব্বা ইব্‌রাহিম্ সে আপনা রুদ্র পণ!
ছি ছি! কেঁপো না ক্ষুদ্র মন!
আজ জল্লাদ নয়, প্রহলাদ সম মোল্লা খুন-বদন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
দ্যাখ্ কেঁপেছে ‘আরশ’ আস্‌মানে,
মন-খুনি কি রে রাশ মানে?
ত্রাস প্রাণে?-তবে রাস্তা নে‍!
প্রলয়- বিষাণ কিয়ামতে তবে বাজাবে কোন্ বোধন?
সেকি সৃষ্টি-সংশোধন?
ওরে তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্!–
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
মুস্‌লিম-রণ-ডঙ্কা সে,
খুন্ দেখে করে শঙ্কা কে?
টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি গড়া ভীম কারা লড়ব রণ-মরণ!
ঢালে বাজ্‌বে ঝন্-ঝনন!
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।
জোর চাই আর যাচ্‌না নয়
কোরবানি-দিন আজ না ওই?
বাজ্‌না কই? সাজ্‌না কই?
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্ধরণ?
বল্– ‘যুঝ্‌ব জান্ ভি পণ!’
ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ!
আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।