• আজ ৮ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

স্টকহোম সিন্ড্রোম: অপরাধীর প্রতি ভিকটিমের সহানুভূতি!

৮:১৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, আগস্ট ৮, ২০২০ জানা-অজানা

জানা-অজানা ডেস্কঃ ‘স্টকহোম সিন্ড্রোম’ একটি মানসিক অবস্থা যার মধ্য দিয়ে একজন বন্দী ও তাকে বন্দীকারীর মাঝে একটি সহানুভূতিশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্টকহোম সিন্ড্রোমের ক্ষেত্রে দুজন মানুষের মাঝে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে ওঠে যেখানে একজন সাময়িকভাবে অন্যজনকে হয়রানি, প্রহার, হুমকি, কটুক্তি অথবা ভয় প্রদর্শন করে। স্টকহোম সিন্ড্রোমকে সর্বপ্রথম চিহ্নিত করেন সুইডিশ মনোস্তত্ববিদ ও অপরাধ বিজ্ঞানী নিলস বেজেরট।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, স্টকহোম সিনড্রোম হচ্ছে ভিকটিমের অবচেতন মনের একরকম “সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি” বা “ডিফেন্স মেকানিজম”। ভিকটিম যখন মনে করে তার বেঁচে থাকা বা না থাকা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ওই অপরাধীর উপর। তার উদ্ধার পাওয়ার কোন আশা নেই তখন অবচেতনভাবে তার অনুভূতিতে এক ধরনের পরিবর্তন আসতে থাকে।অপহরণকারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের পরিবর্তে গড়ে ওঠে ইতিবাচক মনোভাব। তার মন অপরাধীর পক্ষ নেয়াটাকেই নিরাপদ মনে করতে থাকে। শক্তিশালী অপরাধী আর সে একই পক্ষের- এই চিন্তা তার প্রচন্ড মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। বলা বাহুল্য, পুরো ব্যাপারটাই ঘটে তার অবচেতন মনের জগতে।

FBI এর Hostage Barricade Database System অনুযায়ী, “বন্দী দশা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের আট শতাংশ স্টকহোম সিন্ড্রোমে ভোগে।” “স্টকহোম সিন্ড্রোম” কথাটি ১৯৭৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে ঘটে যাওয়া একটি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবির্ভুত হয়।

১৯৭৩ সালের ২৩শে আগস্ট স্টকহোমে ৩২ বছর বয়সী পলাতক অপরাধী জ্যান এরিক ওলসন সুইডেনের অন্যতম বৃহত্ ব্যাংক “ক্রেডিটব্যানকেন” এ ডাকাতি করার জন্য সেখানকার চারজন কর্মকর্তাকে ব্যাংকের ভল্টে ছয় দিন জিম্মি করে রাখে। ব্যাংকের এ ঘটনায় ওলসনের একজন সাবেক জেল সঙ্গীও যোগ দিয়েছিল। এসময় ওলসন তাদের গলায় দড়ি পড়িয়ে দেয় এবং ডিনামাইট দিয়ে তাদের ভয় দেখায়।

বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তির পর তাদের একজন জানায় যে ওলসন তাকে গলায় দড়ি পড়ে ব্যাংকের ভেতর হাটার অনুমতি দেয় যা তার কাছে খুবই দয়ালু একটি আচরণ বলে মনে হয়। আরেকজন বলেন যে ওলসন তাদের সাথে খুবই ভালো ব্যবহার করেছিল যা তাদের কাছে সঙ্কটে ঈশ্বরের মতোই প্রতিয়মান হয়েছিল। মুক্তির পর ঐ কর্মকর্তাদের সবাই ওলসনের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় ভল্টে বন্দী থাকা ক্রিস্টিন এহনমার্কের সাথে ওলসনের বিয়ে হয়েছে। ব্যাংক ডাকাতি চলাকালীন ভল্টের ভিতর থেকে সুইডেনের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ওলোফ পালমের সাথে ফোনে কথা বলার সময় এহনমার্ক অপরাধীদের সাথে চলে যাওয়ার অনুমতি চান।

এহনমার্ক পালমকে আরো বলেন,”আমার মনে হয় আপনি ওখানে বসে আমাদের জীবনের সাথে জুয়া খেলছেন। আমি ক্লার্ক ও ডাকাতটিকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। আমি অস্থির নই। তারা আমাদের কিছুই করেননি। অন্যদিকে তারা আমাদের সাথে খুবই ভালো ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ওলোফ, আমি ভয় পাচ্ছি যে পুলিশ আক্রমণ করে আমাদের মৃত্যু ডেকে আনবে।” ২০০৯ সালে দেয়া সুইডেনের একটি রেডিও ইন্টারভিউতে ক্রিস্টিন এহনমার্ক বলেন,”এটি হলো এমন একটি অবস্থা যার মধ্যে একজন মানুষের মূল্যবোধ ও নৈতিকতা দ্রুত পরিবর্তিত হয়।”

মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল ল্যাং এই ঘটনাটি ঘটার এক বছর পর এতে জড়িত সবার সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেন। বন্দী ও বন্দীকারীদের মাঝে সম্পর্ক অনুধাবনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ইন্টারভিউতে সেদিনের ডাকাতির মূল হোতা ওলসন স্বীকার করে যে তিনি ডাকাতি চলাকালীন সময়ে অনেক পরিবর্তিত হয়েছিলেন। ওলসন খুবই কর্কশভাবে বলে,”এটি ঐ বন্দীদেরই দোষ। আমি তাদের যা যা করতে বলেছিলাম তারা তাই করেছিলো। তারা যদি অন্যথা করতো তাহলে আমি আজ এখানে থাকতাম না। তারা কেন আমাকে আক্রমণ করে নি? তারা হত্যার কাজটিকে কঠিন করে ফেলেছিলো। তারা আমাদের নর্দমার গাধার মতো দিনের পর দিন একসাথে থাকতে বাধ্য করে। একে অপরকে জানা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না।”

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিশ্লেষক জেনিফার ওয়াইল্ড বলেন, “এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ হতে পারে পারিবারিক নির্যাতন যেখানে সাধারণত একজন নারী তার স্বামীর শত অত্যাচার সহ্য করেও তার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে একসাথে বসবাস করে। ক্রোধের বিপরীতে সে নারীর সহানুভূতি অনুভূত হতে পারে। আরেকটি উদাহরণ হতে পারে শিশু নির্যাতন। বাবা-মা শিশুটিকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতন করতে পারে কিন্তু তাদের প্রতি নির্ভরশীলতার কারণে শিশুটি এ কথা স্বীকার করতে রাজি হয় না অথবা মিথ্যা বলে।“

স্টকহোম সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা Post-Traumatic Stress Disorder (PSTD) এর লক্ষণগুলোর কথাই বলেন। এগুলো হলোঃ অনিদ্রা, নিয়মিত দুঃস্বপ্ন, সাধারণ বিরক্তি, মনযোগে সমস্যা, অল্পতে চমকে ওঠা, পূর্বের আনন্দঘন অভিজ্ঞতাগুলোকে পুনরায় আনন্দের সাথে উপভোগ করা, অন্যদের ওপর অত্যাধিক অবিশ্বাস ইত্যাদি।

সুত্রঃ headntails