তেজগাঁও কলেজের নাম ভাঙিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে অভিনব ‘প্রতারণা’

৬:৪১ অপরাহ্ণ | বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২০ ঢাকা, দেশের খবর, শিক্ষাঙ্গন

রবিউল ইসলাম, সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা- ইয়াসমিন জুঁই (২৫)। চলতি বছর রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ থেকে স্নাতক (পাস কোর্স) সম্পন্ন করেছেন তিনি। লেখাপড়ার সুবাদে থাকেন রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় একটি ছাত্রী হোস্টেলে। সেখানে থেকেই স্বল্প বেতনে বেসরকারি একটি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকুরি করছেন।

গত ০৮ আগস্ট সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ অপরিচিত একটি নম্বর থেকে কল আসে তার মুঠোফোনে। নিজেকে শিক্ষাবোর্ড কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে কথা শুরু হলেও একপর্যায়ে উপবৃত্তি দেওয়ার কথা বলে তেজগাঁও কলেজের নাম ভাঙিয়ে অভিনব কায়দায় বিকাশ থেকে হাতিয়ে নেয় তার প্রায় সাড়ে আট হাজার টাকা।

শুধু ইয়াসমিন জুঁই একা নয়। করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রতারকদের পাতা রেশমি জালে একইভাবে ধরা পড়েন প্রতিষ্ঠানটির (২০১৫-১৬) শিক্ষাবর্ষের সরলমনা বেশ কয়েকজন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী। যাদের বেশীরভাগই এখন গ্রামে অবস্থান করছেন।

গত এক সপ্তাহে তেজগাঁও কলেজের নাম ভাঙিয়ে একই নম্বর থেকে যারা ফোনকল পেয়েছেন, তাদের মধ্যে থেকে অন্তত ৮জন শিক্ষার্থীর সাথে মুঠোফোনে কথা হয়েছে সময়ের কণ্ঠস্বরের। তারা বলছেন, যারা উপবৃত্তির টাকা পায় বা পেয়েছে, প্রতারকরা শুধুমাত্র এমন ব্যক্তিদেরকেই ফোন দিচ্ছে। প্রথমে শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়ের নামসহ ব্যক্তিগত সকল তথ্য জানায়, পরে কলেজের অধ্যক্ষ পরিচয় দিয়ে কথা বলে বিকাশের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে এই প্রতারক চক্রটি।

এদিকে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সকল তথ্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে থাকার কথা। সেখানে থেকে এসব তথ্য বাইরে গেল কিভাবে? তাদের ধারণা, এর সঙ্গে হয়তো প্রতিষ্ঠানটির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যোগসাজশ থাকতে পারে।

তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইতিমধ্যে এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতারক যারাই হোক, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে।

এদিকে প্রতারণার শিকার হওয়ার চারদিন পর আজ বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষ বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইয়াসমিন জুঁই। সেখানে প্রতারকদের প্রতারণার জালে আটকা পড়ার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন তিনি।

শিক্ষার্থী জুঁই জানায়, গত ০৮ আগস্ট সকাল ১১টা ২৬মিনিটে ০১৮৫৮৮৯৬০১৫ নম্বর থেকে তাকে কল দিয়ে এক ব্যক্তি নিজেকে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। পরে তুমি সম্বোধন করে শিক্ষার্থী-কলেজের নাম, বাবা-মায়ের নাম ও ভর্তি সেশন জানানো হয়। শিক্ষার্থী এসব তথ্য নিশ্চিত করলে বলা হয়, “উপবৃত্তির টাকা কয়বার পেয়েছ? তোমাদের নতুন করে উপবৃত্তি দেওয়া শুরু হয়েছে। সবাই গত তিন বছরের ২০ হাজার টাকা করে পাবে। তবে এবার আর মোবাইল ব্যাংকিং রকেটের মাধ্যমে নয়, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিকাশের মাধ্যমে এসব অর্থ দেওয়া হবে।”

একপর্যায়ে কলেজের প্রিন্সিপাল পরিচয় দিয়ে ‘বাবা অথবা মা’ সম্বোধন করে কথা বলেন অন্য এক ব্যক্তি। এসময় তিনি কৌশলে নিশ্চিত হয়ে নেন ওই শিক্ষার্থীর বিকাশ একাউন্ট আছে কিনা, আর থাকলে সেটা কোন নাম্বারে। পরবর্তীতে উপবৃত্তির টাকা তার বিকাশ একাউন্টে আসছে না জানিয়ে একটি কোড দিতে বলেন প্রিন্সিপাল পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি। পরে সরল মনে শিক্ষার্থী জুঁই বেশ কিছু কোড থেকে একটি কোড জানালে মুহূর্তেই তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে একাউন্টে থাকা ৮ হাজার ১৯৫ টাকা ০১৭৮৯৫৭২৪৯২ নম্বরে সেন্ট করে নিয়ে নেয় প্রতারকরা। পরবর্তীতে প্রতারকদের দুটি মোবাইল নাম্বারে কল দেওয়া হলে প্রথমে বাজলেও পরে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

শিক্ষার্থী ইয়াসমিন জুঁই সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ঈদের আগের একমাসের আর চলতি মাসের মেস ভাড়া বকেয়া ছিল। যা পরিশোধ করার জন্য নিরাপদ ভেবে বিকাশে টাকাগুলো রেখে দিয়েছিলাম, কিন্তু প্রতারকরা কলেজের নাম ভাঙিয়ে আমার সব টাকা নিয়ে গেল। এখন আমাকে মেস ছাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে, কি করব ভেবে পাচ্ছি না।

জানতে চাইলে আজ বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে তেজগাঁও কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক মোঃ হারুন অর রশিদ বিষয়টিকে ‘ভয়াবহ প্রতারণা’ আখ্যায়িত করে জানান, গতকাল রাতে বিষয়টি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন তিনি। পরে আজ সকালে অধ্যক্ষ মহোদয়কে অবগত করার সঙ্গে সঙ্গে কলেজে জরুরি মিটিং কল করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অপরাধীদের ধরতে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে।

এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি জানান, কলেজের নাম ভাঙিয়ে তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এটি নিশ্চিত এই ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক তাদের খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়েছি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে কখনো এমন ঘটনার নজির নেই। তবে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য শুধু কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছেই নয়, বোর্ডসহ একাধিক জায়গায় থাকে। তারপরও এই প্রতারণার সঙ্গে যদি কলেজের কেউ জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এসময় দায়িত্বরত এক কর্মকর্তাকে অত্র কলেজের বৃত্তিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষার্থীদের মুঠোফোনে কলেজের নিজস্ব মোবাইল নম্বর থেকে ‘সতর্ক বার্তা’ পাঠানো এবং জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন ভাইস প্রিন্সিপাল মোঃ হারুন অর রশিদ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের’ অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, বিকাশ অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রতারণার শেষ নেই। প্রতিনিয়ত মানুষ নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে। করোনাকালে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রতারকরা হয়তো এখন শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে।

তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অথবা কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে ‘অভিনব’ এই প্রতারণার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসবো, বলেন এডিসি নাজমুল ইসলাম।