“ঢাকা প্রকাশ”: রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র

ddha
❏ বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২০ ইতিহাস-ঐতিহ্য

ইতিহাস-ঐতিহ্য ডেস্কঃ রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ‘ঢাকা প্রকাশ’। এটি একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। যা প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হতো। ঢাকার ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীদের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হলেও মালিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটির চরিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে। আর এ কারণেই বোধ হয় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে থাকা পত্রিকাও ছিল এই ‘ঢাকা প্রকাশ’।

এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ বাবুবাজারের ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ থেকে। প্রথম প্রকাশের সময় পত্রিকার প্রচারসংখ্যা ছিল ২৫০; পরে ১৯ শতকে হিন্দু পুনরুত্থানবাদীদের আন্দোলনের সময় এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫০০০। প্রথম থেকেই পত্রিকাটির জনপ্রিয়তা পায়। ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ঢাকা প্রকাশ ছাড়া রচনা করা সম্ভব হত না।

প্রথম দিকে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার বাঁদিকে থাকত বিজ্ঞাপন, ডানদিকে সম্পাদকীয় বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর বা বিশেষ কোনো বিষয়ের ওপর পত্রিকার নিজস্ব মতামত। পরে থাকত ‘সম্বাদাবলী’। এ বিভাগে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত বা নিজেদের সংগৃহীত সংবাদ ছাপা হতো। পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় কখনও বা শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হতো পাঠকদের চিঠিপত্র। উপরে বড় আকারে ‘ঢাকাপ্রকাশ’ এবং তার নিচে ছোট আকারে ‘সপ্তাহিক’ শব্দ লেখা থাকতো। এর নিচে থাকতো একটি ঋষি বাক্য ‘সিদ্ধিঃ সাধ্যে সমামুস্ত।’ পরে এর সাথে আরও যুক্ত হয় ‘প্রসাদাদিহ ধূর্জ্জটেঃ’। প্রথম বছরে প্রত্রিকাটি রয়েল আকারে আট পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হত এবং ডাকমাশুল সহ বার্ষিক মূল ছিল পাঁচ টাকা।

ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। পরিচালকগণের মধ্যে প্রধান ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ঈশ্বরচন্দ্র বসু, চন্দ্রকান্ত বসু প্রমুখ। কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের পর দীননাথ সেনের পরিচালনায় পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ সময় বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে শুক্রবারে পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। চতুর্থ বর্ষের ২৩ থেকে ৩৬ সংখ্যা পর্যন্ত দীননাথ পরিচালনা করেন। পরে সে ভার অর্পিত হয় জগন্নাথ অগ্নিহোত্রী ও গোবিন্দপ্রসাদ রায়ের ওপর। পঞ্চম বর্ষ থেকে শুক্রবারের বদলে ঢাকা প্রকাশ রোববারে প্রকাশিত হতে শুরু করে।

‘ঢাকা প্রকাশ’-এর সঙ্গে জড়িত ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’-এর নাম। ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ ছিল ঢাকার প্রথম বাংলা মুদ্রণ যন্ত্র। বস্তুত এ মুদ্রণ যন্ত্রটি ঢাকার চিন্তারাজ্যে বিপ্লবের সূচনা করেছিল। কারণ, ‘বাঙ্গালা’ যন্ত্র থেকে শুধু ‘ঢাকা প্রকাশ’ই নয়, অন্যান্য বইপত্রও মুদ্রিত হতে থাকে এবং এতে উৎসাহিত হয়ে কয়েক বছরের মধ্যে আরো কয়েকজন ঢাকায় স্থাপন করেছিলেন মুদ্রণ যন্ত্র। শুরু করেছিলেন পত্র-পত্রিকার প্রকাশ।

‘ঢাকা প্রকাশ’ প্রকাশনার ব্যাপারে পরিচালকের যে ব্রাহ্মমত প্রকাশের ব্যাপারটি উৎসাহিত করেছিল এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। প্রথম কয়েক বছরের ‘ঢাকা প্রকাশ’ দেখলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবং ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর এ ভূমিকার বিরোধিতা করার জন্য গোঁড়া হিন্দুরাও পত্রিকা প্রকাশে বাধ্য হয়েছিলেন। এ ছাড়া, কলকাতার ‘সোম প্রকাশ’ও প্রভাবিত করেছিল পরিচালকদের। ‘ঢাকা প্রকাশ’ নামকরণ থেকে এর পরিচালনা, রচনা পদ্ধতিতেও এ প্রভাব স্পষ্ট।

কিন্তু বিভিন্ন সময়ে মালিকানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। তাই দেখা যায় পত্রিকাটি কখনও ব্রাহ্মদের, কখনওবা রক্ষণশীল হিন্দুদের সমর্থন করেছে। রাজনৈতিক বিষয়ে পত্রিকাটি সব সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করত এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করত। এর ফলে বঙ্গভঙ্গ এবং স্বদেশী আন্দোলনের সময় পত্রিকাটিকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়।

ঢাকাপ্রকাশ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য রয়েছে মুনতাসীর মামুনের ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী বইয়ে। ১৯৯৩ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। এটি ছিল ছিল ঢাকা বিষয়ক প্রথম কোষগ্রন্থ। বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল গ্রন্থটি। তারপর প্রকাশিত হয়েছে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে, ‘ঢাকাপ্রকাশ’ এর সর্বশেষ সংখ্যাটির তারিখ ১২-৪-১৯৫৯। সম্পাদক আবদুর রশীদ খান। প্রকাশিত হয় ৫৯/৩ কিতাব মঞ্জিল, ইসলাম পুর থেকে। বিশ শতকের ষাটের দশকে পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র: headntails

এই বিভাগ থেকে আরও পড়ুন :