চামড়া শিল্পের বিপর্যয় ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি

৩:৫৭ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২০ ফিচার
nstu

এস আহমেদ ফাহিম, নোবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ আমাদের জীবনের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে রয়েছে চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্য। রুচিশীল জীবনযাপন করতে চাহিদার তালিকায় স্থান করে নেয় ভালো ব্র‍্যান্ডের জুতা,ভালো মানের স্যান্ডেল, ভালো মানের বেল্ট,ভালো ব্র‍্যান্ডের মানিব্যাগ, ভালো মানের ব্যাগ। প্রোগ্রামে যাওয়া, কর্পোরেট অফিসে জব কিংবা ঘুরতে যাওয়া সবক্ষেত্রেই আমাদের চাহিদার তালিকায় এই চামড়াজাত পণ্য থাকেই।

এই চামড়া শিল্প যে শুধু আমাদের চাহিদাকে পূরণ করে তাই নয়,এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রফতানির মাধ্যমে অর্জিত হয় বৈদেশিক মুদ্রা যা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সাহায্য করে। বর্তমানে এই শিল্প দেশের ২য় প্রধান রফতানি খাত।

রফতানি খাতে বর্তমানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবদান প্রায় ৯ শতাংশ। দেশের জিডিপি ও শিল্পোৎপাদনে চামড়ার অবদান যথাক্রমে ০.৬ শতাংশ ও ২ শতাংশ। চামড়া শিল্পকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করে ২০১৭ সালে চামড়াকে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয় এবং ২০২১ সালের মধ্যে এই খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এর পরিসংখ্যান হতে জানা যায়, ২০১৭ সালের পর থেকে এইখাতে কমেছে রফতানির পরিমাণ ও কমেছে রফতানি আয়। ফলে বিপর্যয়ের মুখে এই শিল্প। এর ফলে অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে মন্দাবস্থা।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া শিল্পের রফতানি আয় ছিল ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৫ হাজার মার্কিন ডলার যা ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হয় ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার।এরপর থেকেই এ শিল্পের আয় নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া শিল্পের রফতানি আয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ শিল্পের রফতানি আরও কমে হয় ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ৮ হাজার মার্কিন ডলার যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ কম।

সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে চামড়া শিল্পের রফতানি আরও কমে হয় ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি আয় বাড়লেও ২০১৭-২০২০ এই সময়ে রফতানি আয় কমেছে।

বাংলাদেশ হতে কাঁচা চামড়া রফতানি গত তিন দশক ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রক্রিয়াজাত চামড়া, চামড়াজাত পণ্য রফতানি করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত যেসব পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, জুতা (সু), অফিসিয়াল ব্যাগ, জ্যাকেট, মানিব্যাগ, মহিলাদের পার্স, বেল্ট এবং মহিলাদের হাত ব্যাগ। এসব পণ্যের গুণগত মান ও দাম চামড়ার ওপর নির্ভর করে।বাংলাদেশ হতে রফতানিকৃত মোট প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ যায় চীনে। এ ছাড়া ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, জাপান এসব দেশেও কিছু রফতানি হয়।

চামড়াজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানি কারখানার বিষয়ে লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য হতে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ১১০টি রফতানিমুখী কারখানায় চামড়ার জুতা তৈরি হয় এবং শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি। এসব কারখানার মাধ্যমে প্রতি বছর দেশে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন জোড়া জুতা তৈরি হচ্ছে, যা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৫০ শতাংশ মেটানো হচ্ছে।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন ‘অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল’ (অটেক্সা)-এর তথ্য মতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি আয় হয়েছিল ৬ কোটি ১৪ লাখ ডলার যা ২০১৮ সালে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পায়। এশিয়া ফাউন্ডেশন ও পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের এক যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া খাতের মোট রফতানি আয় ছিল ১২৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে ১০৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমেছে এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রফতানি আয় হয়েছে মাত্র ৭৭ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বর থেকে ১৯০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার চামড়ার তৈরি পণ্য ও পাদুকা রফতানির আদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে।

চামড়া শিল্পের প্রধান কাঁচামাল চামড়ার দাম গত এক দশকে কমেছে প্রায় অর্ধেকের মতো, যদিও চামড়া ও চামড়াজাত সব পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ কোটি ৬৫ লাখ পিস কাঁঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয় অর্থাৎ সব মিলিয়ে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। আর এই চামড়ার প্রায় অর্ধেকই পাওয়া যায় কোরবানি ঈদের সময়।করোনা ও বন্যার কারণে এবার কমেছে কোরবানির সংখ্যা, ফলে চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।এছাড়াও চামড়ার দাম হয়েছে নিম্নগামী।

এ বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয় যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় ২০ থেকে ২৯ শতাংশ কম।বিগত দুই বছরে (২০১৮ ও ২০১৯) কোরবানি ঈদে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ৪০-৫০ টাকা এবং প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম ছিল ১৮-২০ টাকা। এ বছরের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ হয় এবং ঢাকার বাইরে নির্ধারণ হয় প্রতি বর্গফুট ২৮ থেকে ৩২ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা।

সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী বড় আকারের গরুর চামড়ার দাম পড়ার কথা ১২শ থেকে ১৬শ টাকা। মাঝারি গরুর চামড়ার দাম ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা এবং ছোট আকারের গরুর চামড়ার দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা হওয়ার কথা।কিন্তু এতেও কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। এবার পানির দরে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। অনেকে দাম না পেয়ে চামড়া পুঁতে রেখেছেন আবার কেউ কেউ ফেলেছেন নদীতে। শুধু এবারই নয় গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার দামে এ বিপর্যয় চলছে।

ফলে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পারায় সর্বস্বান্ত হয়েছে।শুধুমাত্র ব্যবসায়ীরাই নয় এই চামড়ার আয় দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা শ্রমিক, গরীব, দরিদ্র শ্রেণীর মানুষেরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ফলে আমাদের দেশে চামড়ার বাজার ও চামড়াশিল্প ক্রমেই বিপর্যয়ের দিকেই যাচ্ছে।

চামড়া শিল্পের বিপর্যয়ের কারণের মধ্যে রয়েছে-চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, লবণ ও অন্যান্য ব্যবহৃত কেমিক্যালের মূল্য বৃদ্ধি.ট্যানারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, ট্যানারিগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘাটতি, চামড়া সংগ্রহে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, বাজার মনিটরিং, দ্রত সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে ঘাটতি, সমন্বিত নীতিমালার অভাব। এছাড়াও চামড়া কারখানার বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকায় চামড়া ও চামড়া জাত পণ্য রফতানির পরিমাণ কমেছে।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। বিশাল ওই বাজারে বাংলাদেশ মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করে। উৎকৃষ্ট মানের পশু চামড়া উৎপাদনে বহুকাল ধরে এদেশের সুখ্যাতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এদেশের পাদুকা ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্যেরও রয়েছে বিপুল চাহিদা। চামড়া শিল্প থেকে প্রতি বছরে বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে থাকে। এ খাতের সম্ভাবনা দিন দিন বাড়লেও দীর্ঘসময় যাবত চামড়া রফতানি আয় নিম্নমুখী হয়েছে এবং কাঁচা চামড়ার দামও হয়েছে নিম্নমুখী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এ শিল্প খাতে প্রায় ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।চামড়া শিল্পে ধস কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন এই শিল্পের আধুনিকীকরণ ও রফতানি বাড়ানো।এ ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি,ট্যানারির অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘাটতি। জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য সম্ভাবনাময় এই শিল্পের উন্নয়নের বিকল্প নেই। এই শিল্পের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

চামড়া শিল্পকে এগিয়ে নিতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

১.চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উপকরণের অভাব দূরীকরণের পাশাপাশি লবণ ও অন্যান্য ব্যবহৃত কেমিক্যালের মূল্য না বাড়ানো

২.ট্যানারির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন

৩.সরকারের আর্থিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির লক্ষ্যে আরো লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট স্থাপন ও কর্মসংস্থান তৈরি।

৪.ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা ও চামড়া শিল্পের জন্য আলাদা শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা।

৫. চামড়া শিল্পের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় করণ ও ব্যবসায়ীদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানির বিপরীতে পাওনা শুল্ক ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা নেয়া।

৬.চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়াতে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরো কার্যকর করা

৭.চামড়া শিল্পকে টেকসই করতে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াভিত্তিক শিল্পের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত নীতিমালা নির্ধারণ করা।

৮.চামড়ার মৌসুমে সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণসহ চামড়া চোরাচালান বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ।

৯.চামড়া সংগ্রহে সঠিক ব্যবস্থাপনা,বাজার মনিটরিং, দ্রত সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ।

১০.উন্নতমানের চামড়া প্রস্তুত করার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের সুযোগ বৃদ্ধি।