সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

যেভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে

৪:৪১ অপরাহ্ন | শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২০ জানা-অজানা, ফিচার
bongo

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্কঃ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার বজ্রকন্ঠে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির মুক্তির কাব্য রচিত হয়েছিল, যার ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার আপামর জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যিনি বলেছিলেন আমাকে কোন বাঙালি হত্যা করতে পারে না তাঁকেই কি না সপরিবারে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট। এই আলোচনায় আমরা জানবো কিভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল-

মাত্র এক ঘণ্টার অপারেশনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। সেই অল্প সময়েই খুন করে ১৮ জনকে। সেই বর্বরোচিত হত্যাকান্ড পাষন্ড ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশু রাসেল, শিশু বাবু, এমনকি অস্তঃসত্ত্বা বধূও।

১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট ছিল শুক্রবার। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে ভাষণ দেয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। কিন্তু কে জানত সে সময়ই চলছে বঙ্গবন্ধু হত্যার মহড়া। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সক্রিয় হয়ে উঠল সেনাবাহিনীর টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের কামানবাহী শকট যানগুলো। রাত ১০টায় বেঙ্গল ল্যান্সারের টি-৫৪ ট্যাংকগুলো রাজকীয় ভঙ্গিতে এসে জড়ো হলো বিমানবন্দরের বিস্তীর্ণ বিরান মাঠে। জড়ো হলো ১৮টি কামান ও ২৮টি ট্যাংক। রাত সাড়ে ১১টায় জড়ো হলো মেজর ডালিম, মেজর নূর, মেজর হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর পাশা, মেজর রাশেদসহ ঘাতকরা। ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহর রাত সাড়ে ১২টায় পরিকল্পনা ব্রিফিং করে মেজর ফারুক।

ভোর ৫টা ১০ মিনিটে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন দুই ট্রাক সৈন্য নিয়ে উপস্থিত হয় ধানমন্ডির শেখ মণির বাসার গেটে। প্রতিদিনকার অভ্যাসমতো তখন ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন শেখ ফজলুল হক মণি। ড্রয়িং রুমে বসে পড়ছিলেন পত্রিকা। খোলা দরজা দিয়ে সটান ঢুকে পড়ে মোসলেম। কিছু বলতে চাইছিলেন শেখ মণি। কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে গর্জে উঠল মোসলেমের হাতের স্টেনগান। লুটিয়ে পড়লেন শেখ মণি। চিৎকার শুনে এগিয়ে এলেন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। ব্রাশফায়ারে প্রাণ হারালেন তিনিও।

এরপর ধানমন্ডির আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসা আক্রমণ করে এক প্লাটুন সৈন্য। পাহারারত পুলিশকে নিরস্ত্র করতে ছোড়া হয় গুলি। গুলির শব্দে জেগে ওঠেন সেরনিয়াবাত। ব্যস্ত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফোন করতে। সে সময় দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে ঘাতকরা। ড্রয়িং রুমে জড়ো করা হয় সবাইকে। তারপর নির্দয়ভাবে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বেবী, ১২ বছরের ছেলে আরিফ, চার বছরের নাতি বাবু (আবুল হাসনাত আবদুল্লার ছেলে), ভাতিজা শহীদ সেরনিয়াবাত, ভাগনে আবদুল নইম খান রিন্টু (আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাতো ভাই), তিন অতিথি এবং চার কাজের লোককে।

ভোর সাড়ে ৫টার দিকে পুরো অপারেশন শেষ করে ঘাতকরা ভিড় করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর সেই ৬৭৭ নম্বর বাড়ির গেটে। ততক্ষণে আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে হত্যার খবর জেনে গেছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়ে ছিলেন দুই গৃহকর্মী মোহাম্মদ সেলিম (আবদুল) ও আবদুর রহমান শেখ (রমা)। নিচতলায় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মহিতুল ইসলাম। মহিতুলকে টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগা…।’ কিন্তু পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না মহিতুল।

সেই কালো রাতের কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শোকে হতবিহল হয়ে পড়েন আবুল। কী ঘটেছিল সেইদনি? ওইদিনের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী আকিব হাসান আবুলের কথা তুলে ধরা হলো:

আকিব হাসান আবুল বলেন, এদিন ৩২ নম্বর বাড়ির নীচতলার ১১ নম্বর রুমে আমি (আবুল), আবদুল’সহ আরো একজন মোট তিনজন ঘুমিয়ে ছিলাম।

ভোর রাত ৪ টা কী ৫ টা বাজে। চারদিকে কেবল গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমার একটু ঘুম কম হয়। তাই আমি শব্দ শুনতে পাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু নীচে নেমে আসেন। আমাদের ডাক দিয়ে বলেন, এই তোরা কে কে আছিস? আমি দ্রুত লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলে বলি স্যার আমরা তিনজন। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেন, তোরা সাবধানে চারদিক দিয়ে ঘুরে দেখ কী ঘটতে যাচ্ছে। কোত্থেকে গুলি আসছে, আমি উপরে গিয়ে দেখছি। এই বলে বঙ্গবন্ধু উপরে চলে গেলেন। আমরা তিনজন নীচে দাঁড়িয়ে একটু পরেই শেখ কামাল ভাই নীচে নেমে আসেন। আমি ছিলাম তখন কামাল ভাইয়ের সাথে, উপস্থিত ছিলেন মহিতুল ভাইও। যিনি এই হত্যাকান্ডের মামলা করেছেন। তখনই আমরা দেখি ৪-৫জন লোক শুয়ে বন্দুক তাক করে আছে আমাদের দিকে।

তারপর কী ঘটেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে আকিব হাসান আবুল বলেন, মুহুর্তেই তারা উঠে দাঁড়িয়ে কামাল ভাইকে বলে হ্যান্ডস-আপ। কামাল ভাই তখন বলেন মুহিত ওদের বল আমি শেখ কামাল, রাষ্ট্রপতির ছেলে। ওরা মুহিতকে সরে যেতে বলে সাথে সাথেই কামাল ভাইকে কয়েকটা গুলি করে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আমরা তখনও দাঁড়িয়ে। এরপর ওরা চলে যায়। আমি উপরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বললাম স্যার শেখ কামাল ভাইকে ওরা মেরে ফেলেছে। তিনি আমার মুখ চেপে ধরলেন। বললেন আস্তে বল। এরা কারা? স্যার আমি চিনি না।

বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল হত্যার কথা শুনার পর তিনি কেমন ছিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সেই দিনের অন্যতম এই প্রত্যক্ষদর্শী আকিব হাসান আবুল বলেন, স্যার এতটুকুও বিচলিত হননি। তিনি শুধু আমাকে প্রশ্ন করলেন কারা কামালকে গুলি করেছে আর্মি? আমি বললাম জি স্যার আর্মি পোশাক পরা লোকজন।

আমার সামনেই বঙ্গবন্ধু তিন জায়গায় ফোন করলেন। প্রথমে তখনকার সেনা প্রধান সফিউল্যাহকে, দ্বিতীয়ত নাইন ডিভিশনের জিওসি এবং তৃতীয় ফোনটি করেন বঙ্গভনের প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) তথা স্যারের দায়িত্ব পালনকারি কর্ণেল জামিলকে। জেনারেল শফি উল্লাহর সাথে কথা বলে তিনি হতাশ হলেন।

এদিকে গুলির শব্দ কেবল বাড়তে থাকে। জানালার কাঁচ ভেঙ্গে গুলি ঘরের ভেতরেও ভেদ করছে। স্যার দফা দফায় ফোন করছেন। পুলিশ কন্ট্রোল রুম, সেনা প্রধানের কার্যালয় কোথায়ও কোন সাড়া পাননি তিনি। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্ল্যাহকেও ফোন করে বঙ্গবন্ধু বলেন,‘শফিউল্ল্যাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে (শেখ কামাল) মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে যা বুঝলাম তিনি তেমন আশার বাণী শোনাননি বঙ্গবন্ধুকে। স্যার তখন সম্ভবত বলছিলেন তুমি হেলপলেস কেন? শফিউল্ল্যাহর সেই ফোনালাপের পর বঙ্গবন্ধু খুব নাখোশ হন তার ওপর।

আবুল বলেন, এরপর স্যার তখন আবারো পিজিআরের দায়িত্বে থাকা কর্ণেল জামিলকে ফোন করে বলেন তোমার এখানে কেমন ফোর্স আছে? তিনি উত্তর দিলেন স্যার ২শ ৫০জন। স্যার বললেন আমার বাসায় অ্যাটাক হয়েছে। তাড়াতাড়ি তুমি ফোর্স নিয়ে এদিকে মুভ করো। আমরা পরে জানতে পারলাম কর্ণেল জামিল ধানমন্ডির ২৮ নম্বর পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। সোবহানবাগের মিরপুর রোডের ওপরে একটি মসজিদ আছে ওখানে তাকে হত্যা করা হয়।

কিছুক্ষণ পরেই দরজার সামনে বুটের আয়োজ শুনতে পাই আমরা। তারা দরজা খুলতে বললে বঙ্গবন্ধু তার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। ওরা বঙ্গবন্ধুকে স্যার সম্বোধন করে বলে স্যার আপনি এইদিকে আসেন। এদের মধ্যে একজনকে আমি চিনতে পেরেছি। তবে তারা স্যারের সাথে কথা বলছে বলে আমি তাদের দিকে তাকাইনি। বঙ্গবন্ধু ওদের বললেন, তোরা আমার কামালকে মেরে ফেলছস? ওরা স্যারের কাছাকাছি একটা রেকর্ডার বাক্স’র মাইক সামনে এগিয়ে দিলেন; এরপর তারা স্যারকে একটা কাগজে সই করতে বলেন।

বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে আঙুল স্বভাবসূলভ ভাবে বলেন, তোমরা জানো পাকিস্তানিদের কাছে আমি মাথা নত করিনি। কি হইছে তা বলো? তখন উনাকে তারা একবার তিনতলায় আবার নীচ তলায় উঠা নামানো করে। এদিকে বাইরে থেকে প্রচন্ড গুলি বাড়ির দিকে আসছে। জানালা ভেদ করে ভেতরেও প্রবেশ করছে। স্যার তাদের উদ্দেশ্যে আঙুল তুলে বললেন ওদের গুলি বন্ধ করতে বলো। কোন বুঝে উঠার আগেই স্যারকে তারা আঙ্গুল’সহ বুকের ওপর একের পর এক গুলি করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়েন। পাশেই ছিলেন বেগম মুজিব, তাকেও তারা গুলি করে। এরপর তারা কামাল ভাইয়ের রুমে ঢুকে তার স্ত্রী ভাবীকেও গুলি করে।

আবুল বলেন, শেখ জামাল ভাই আর্মির ইউনিফর্ম তখন পড়ছিলেন। পুরোটা পড়তে পারেননি। এলোপাতাড়ি গুলি করে জামাল ভাই ও ভাবীকে হত্যা করা হয়।

তারপর তারা আমাকে’সহ গৃহকর্মী আবদুল ও রমাকে বাইরে নিয়ে যায়। সাথে রাসেল ভাইকেও। রাসেল ভাইয়ের বয়স মাত্র দেড় বছর ছিল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে মহিতুল, নুরুল ইসলাম, শেখ নাসের আঙ্কেল, আব্দুল মতিন, পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যসহ অন্য সদস্যদের সারি করে দাঁড় করানো হয়। এর মধ্যে ঘাতকদের একজন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যকে গুলি করলে তিনি পড়ে যান। শেখ জামাল ভাইকে গুলি করার সময় একটা গুলি ফেরত এসে আবদুলের পেটে লাগে তখন সে আহত হয়। আমরা বাইরে দেখি কয়েকজনের লাশ পড়ে আছে।

এরপর মেজর ডালিম একটি জীপে করে আসেন। তিনি একে একে আমাদের পরিচয় জানতে চান। তারপর একজন পরিচয় করিয়ে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ডালিম’সহ কয়েকজন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। বিয়ের সময়ের গহনা’সহ উপহার পাওয়া অস্ত্র সবকিছু লুট করে নিয়ে যায় তারা। শিশু শেখ রাসেলকেও প্রাণে বাঁচতে দেয়নি। শেখ নাসের আঙ্কেলকে বাথরুমে নিয়ে গুলি করে।

এভাবে একে একে পরিবারের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তার দু’ মেয়ে ছিলেন না। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে ছিলেন। আর বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানাও বড় বোনের সাথে ছিলেন।

সুত্রঃ headntails