• আজ ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ

১২:১৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২০ ফিচার
ban

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম মধুমতি নদীর তীরের অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। নিভৃত পল্লীর ছায়া ঢাকা গাঁয়ে, কাশফুলের সুভ্রতার মোহমুগ্ধ বাঁকে, মাটির ভালোবাসায়, বাতাসে বিকশিত হয়েছে তাঁর প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। বায়ুর কোমল পরশ শরীর ভেদ করে মর্মে জাগিয়েছে পরম দেশপ্রেম, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, হৃদয়ে জাগিয়েছে বলিষ্ঠ শপথে শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার ঐকান্তিক চেতনা ও প্রেরণা। তাই তো তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে বাঙালি জাতির জন্য এনে দিয়েছেন মহান স্বাধীনতা।

১৭ মার্চ ১৯২০ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান, মাতা সায়েরা খাতুন। তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন টুঙ্গিপাড়া, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে। ছোট সময়ে চাচাতো বোন রেণুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন অভিভাবকেরা।

১৯৩৪ সালে যখন তিনি সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন, তখন বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর পিতা তাঁকে কলকাতায় নিয়ে চিকিৎসা করান। ১৯৩৬ সালে কিশোর মুজিবের চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ায় তাঁকে দ্বিতীয়বার চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।

চোখের চিকিৎসার পরে শেখ মুজিব ফিরে এলেন মাদারীপুরে। বাল্যকাল থেকেই তিনি রাজনীতিমনস্ক ছিলেন। তাঁর পিতা বাড়িতে সংবাদপত্র এবং সাহিত্য পত্রিকা রাখতেন। রাজনীতিতে তাঁর আগ্রহ গড়ে ওঠে সংবাদপত্র পাঠে। এই রাজনীতি-অনুরাগ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয় তৎকালীন বাংলার ইংরেজ উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির অনুষঙ্গে। তখন স্বদেশি আন্দোলনের চাপা উত্তেজনা মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের ঘরে ঘরে।

মূলত ১৯৩৬ সালে মাদারীপুরে স্বদেশি আন্দোলনকারী এবং ভারতের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থকদের সংসর্গেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। বঙ্গবন্ধু এ-বিষয়ে তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম। [তাদের] সভায় যোগদান করতে মাঝে মাঝে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর যাওয়া-আসা করতাম।’

১৯৩৮ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ. কে ফজলুল হক, শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং সমবায়মন্ত্রী মুকুন্দবিহারী মল্লিক গোপালগঞ্জ সফরে আসেন। তাঁদের সংবর্ধনার তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মূল সংবর্ধনা সভা ও প্রদর্শনী উদ্বোধন শেষে হক সাহেব গোপালগঞ্জ পাবলিক হল দেখতে যান, শহীদ সাহেব আসেন মিশন স্কুল পরিদর্শনে। মুজিব তখন ওই স্কুলের ছাত্র। শহীদ সাহেবকে স্কুলে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তিনি সংবর্ধনা সভায় মুজিবের একনিষ্ঠ কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করে স্কুল পরিদর্শন থেকে ফিরে যাবার সময় তাঁকে কাছে ডেকে নিয়ে আদর করেন এবং নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করে নোটবুকে লিখে নেন এবং গোপালগঞ্জে মুসলিম লীগ এবং মুসলিম ছাত্রলীগ করা হয়েছে কিনা জানতে চান।

বিস্ময়কর ব্যাপার, গোপালগঞ্জে সভা করে কলকাতায় ফিরে যাবার কিছুদিন পরেই সোহরাওয়ার্দী পত্র লিখে গোপালগঞ্জের সভা ও প্রদর্শনী আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় তাঁর একাগ্র শ্রমনিষ্ঠা ও চমৎকার নেতৃত্বের জন্য শেখ মুজিবকে ধন্যবাদ জানান এবং কলকাতা গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। সেই সূত্র ধরে ১৯৩৯ সালে কলকাতা বেড়াতে গিয়ে তরুণ মুজিব তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং ধীরে ধীরে সোহরাওয়ার্দী তাঁর রাজনৈতিক গুরু হয়ে ওঠেন। শহীদ সাহেবকে বলেন, ‘গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ এবং মুসলিম লীগ দুই-ই গঠন করা হবে।’ যে কথা সেই কাজ। গোপালগঞ্জে ফিরেই তিনি এমএলএ ও মুসলিম লীগ সদস্য খন্দকার শামসুদ্দীনকে সভাপতি করে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন এবং মুসলিম লীগও গঠন করা হয়। মুজিব ছাত্রলীগের সম্পাদক এবং মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এভাবেই তাঁর প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতির সূত্রপাত।

রাজনীতিতে নিমগ্ন এই তরুণ নেতা খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা এবং সামাজিক ও দুস্থ মানবতার সেবামূলক কর্মকাণ্ডে প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন। ১৯৪০ সালে শেখ মুজিবকে খেলাধুলায় বিশেষ ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ভলিবল ও হকি খেলতেন, তবে ফুটবলে ছিল তাঁর প্রচণ্ড আসক্তি। এ-খেলায় বেশ পারদর্শিতা ও সাংগঠনিক উদ্দীপনা ছিল তাঁর। শেখ মুজিব ও তাঁর পিতার দলের ফুটবল খেলার তীব্র প্রতিযোগিতা গোপালগঞ্জ শহরে তখন বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালেও ফুটবল খেলায় তাঁর আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। তবে পরবর্তীকালে রাজনীতিই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান এবং সার্বক্ষণিক চিন্তা-চেতনার বিষয় হয়ে ওঠে।

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রাস পাশ করে তিনি ওই বছরেই কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। সেই সুবাদে বেকার হোস্টেলে আবাসিক ছাত্র হবার সুযোগ মিলে। অল্পদিনেই তিনি কলেজে ও হোস্টেলে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। উল্লেখ্য যে, রাজনীতি তাঁর সর্বক্ষণের চিন্তা-চেতনার বিষয় হলেও রাজনীতির শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণে যে সংস্কৃতির সংযোগ অপরিহার্য এ-বিষয়টিও তিনি মাথায় রেখেছিলেন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৪০ সালে তিনি ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের (নিখিল বঙ্গ ছাত্রলীগের জেলা শাখা) সম্মেলনে শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতি জগতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানান। এঁরা ছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক নেতা হুমায়ুন কবির এবং অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ। নজরুল এবং হুমায়ুন কবির সম্মেলনে যোগ দেন। মুসলিম লীগের বিরোধিতায় ইব্রাহিম খাঁ আসেননি। সেই ছাত্র সম্মেলনে নজরুল তাঁর উদ্দীপনাময় গানে ছাত্রদের করে তোলেন প্রবলভাবে আলোড়িত।

বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবনেই রাজনীতি ও সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন ঘটান আজীবন তা রক্ষা করেছেন। ফলে যৌবনকালে কবি জসীমউদদীন, শিল্পী জয়নুল আবেদিন এবং সরদার ফজলুল করিম, মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার প্রমুখ তুখোড় বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও শিল্পী হয়ে ওঠেন তাঁর বন্ধু। তেমনি পরবর্তীকালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, আবুল ফজল প্রমুখ পণ্ডিত-মনীষী স্থান লাভ করেন তাঁর শ্রদ্ধেয়জনের আসন এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপদেশক।

শুধু নাগরিক সুধী-বুদ্ধিজীবীই নন, গ্রামীণ ও লোকশিল্পীদের সঙ্গেও তাঁর সখ্য ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ উষ্ণতায় অনন্য। আব্বাসউদ্দীন, আবদুল লতিফ, শাহ আবদুল করিম, মহিন শাহর সঙ্গে তাঁর সাংস্কৃতিক সংযোগ ছিল হার্দিক।

১৯৪২ সালে মুসলিম লীগপ্রধান মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমায় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সম্মেলনে যোগদান করেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এ-সম্মেলনে এসেছিলেন। তরুণ ছাত্রনেতা ও দক্ষ সংগঠক শেখ মুজিব ফরিদপুর থেকে বিরাট দল নিয়ে যোগ দেন এই সম্মেলনে।

১৯৪৩ সালে বাংলায় নজিরবিহীন দুর্ভিক্ষ হয়। সে-সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাংলা সরকারের সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী। সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তখন কলকাতা শহরে বেশ কিছু লঙ্গরখানা খোলা হয়। মুজিব ওই বছরেই প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। পার্টির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে তিনি বাঙালিজীবনের এই ভয়াবহ দুর্দিনে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের মধ্যে রাতদিন রিলিফের কাজ করেন।

শেখ মুজিবের উদ্যোগে গোপালগঞ্জে ১৯৪৩ সালে দক্ষিণ বাংলা পাকিস্তান কনফারেন্স আয়োজন করা হয়। তিনি ছিলেন অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি। এর কিছু পরেই কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগ সম্মেলনেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য কর্মতৎপরতায় উজ্জ্বল। তরুণ বয়সে মুসলিম লীগের কর্মকাণ্ডে তাঁর এই উদ্দীপনাময় অংশগ্রহণের মূলে ছিল এই ধারণা যে, ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাবের মর্মানুযায়ী (States) দুটো পাকিস্তান হবে; একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান – স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; এবং পশ্চিম পাকিস্তান – পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত প্রদেশ ও সিন্ধুকে নিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। লাহোর প্রস্তাবের প্রস্তাবক শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক সেই মর্মেই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন। কিন্তু জিন্নাহ শঠতা ও কূটকৌশল করে অবাস্তব ও ভৌগোলিকভাবে অসম্ভব এক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে স্টেটস শব্দের এস’কে (s) কেরানির ভুল বলে বোম্বে কনফারেন্সে ‘এস’ বাদ দিয়ে স্টেট পাশ করিয়ে নেন।

১৯৪৩ সালের ৭ই নভেম্বর আবুল হাশিম বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সংগঠনটি তখন দুই ধারায় বিভক্ত ছিল, একটি প্রগতিশীল ধারা’; – তার নেতৃত্বে ছিলেন সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম; আর রক্ষণশীল ধারায় ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবার তথা খাজা নাজিমউদ্দীন, ইস্পাহানিরা, মওলানা আকরম খাঁ ও দৈনিক আজাদ পত্রিকা। আবুল হাশিম বাংলার নবাব-নাইট-জমিদার ও রক্ষণশীল রাজনীতিকদের কব্জা থেকে মুক্ত করে মুসলিম লীগের মাধ্যমে এক নবযুগ সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শেখ মুজিব এই প্রগতিশীল ধারায় সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

হাশিম সাহেব ১৯৪৫ সালে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক চেতনার অধিকারী তরুণদের মধ্যে সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি সম্পর্কে গভীরতর ধ্যান-ধারণা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে লীগ অফিসে একটি স্টাডি সার্কেল গঠন করেন। এই স্টাডি সার্কেলে পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাখ্যায় তাঁর মৌলবোধ ও প্রত্যয় যুক্তিতর্কসহ ব্যক্ত করেন এই ভাষায়: ‘পাকিস্তান হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য এবং দুই ভাই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সুখে বাস করতে পারে তারই জন্য। শুধু হিন্দুদের গালাগাল করলে পাকিস্তান আসবে না। … মুসলিম লীগকে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। গ্রাম থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। … জমিদারদের পকেট থেকে প্রতিষ্ঠানকে বের করতে হবে।’

১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ইসলামিয়া কলেজের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা এবং ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ইসলামিয়া কলেজের স্নাতকও বটেন।

সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমদের পক্ষে কোনো পত্র-পত্রিকার জোরালো সমর্থন ছিল না। এই সমস্যা দূর করার জন্যে সোহরাওয়ার্দীর অর্থানুকূল্যে ছাপাখানা স্থাপন করে মিল্লাত নামে একখানি সাপ্তাহিক কাগজ বের করা হলো। হাশিম সাহেব হলেন সম্পাদক। কাজি মুহম্মদ ইদরিস প্রমুখ সাংবাদিককে যুক্ত করা হলো পত্রিকায়। এই পত্রিকাটি প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির জন্য হিন্দু-মুসলমান দুইয়েরই প্রশংসা পায়। শেখ মুজিবসহ তরুণরা এ-পত্রিকা রাস্তায় রাস্তায় হকার হিসেবে বিক্রি করতেন।

শেখ সাহেবের মানস-গঠন ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশে এসব বিষয়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। মাদারীপুরে স্বদেশি আন্দোলনকারী এবং তাঁদের নেতা অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাসের মুক্তিতে নজরুলের কবিতা ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’, এবং তাতে ‘জয়বাংলার’ উল্লেখ ও নেতাজী সুভাষ বসুর দলের সঙ্গে সংযোগ, ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে ওই বিদেশি শাসকদের বৈরিতার ইতিহাস শোনার প্রতিক্রিয়াজনিত সংক্ষোভ, বাল্যকালে বাড়িতে রাখা বিখ্যাত দৈনিক, মাসিক পত্রিকা পাঠ, কবি নজরুল, হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সম্পর্ক, আবুল হাশিমের প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও তাঁর সাপ্তাহিক মিল্লাত পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাঁর প্রগতিশীল রাজনৈতিক মানসগঠনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে আমরা মনে করি।

১৯৩৯-৪৩ তাঁর জীবনের এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রকৃত প্রস্তাবে মনোজগতে মাদারীপুরের যে বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনার ছাপ নিয়ে তিনি কলকাতায় আসেন সেখানে একই সঙ্গে তিনটি কিছুটা পরস্পরবিরোধী ধারাকেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন গঠনে সমন্বিত করতে সমর্থ হন। এই ধারাগুলো ছিল – এক : সোহরাওয়ার্দীর আধুনিক পাশ্চাত্য রাজনীতির পরিশীলিত নিয়মতান্ত্রিক ধারা; এর সঙ্গে শরৎ বসু, সোহরাওয়ার্দী, কিরণশঙ্কর রায় এবং আবুল হাশিমের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক যুক্ত বাংলা আন্দোলনের ধারা; এবং দুই : নেতাজী সুভাষ বসু ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনীতির প্রতি গভীর আকর্ষণ; এবং তিন : রাজনীতি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নজরুল, আবুল হাশিম ও হুমায়ুন কবিরের প্রভাব।

শেষ পর্যন্ত সব সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র।

শেষ পর্যন্ত সব সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র। সাম্প্রদায়িকভাবে দেশভাগের ফলে যে ভয়াবহ দাঙ্গা, বিপুল মানুষের নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত নিধনজনিত মানবিক বিপর্যয় শেখ মুজিবকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলেও তিনি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্রতী হয়ে বিদ্যমান ধর্ম-সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে ও নতুন বাস্তবতায় পূর্ব পাকিস্তানে এসে রাজনীতির নতুন কৌশল ও লাগসই কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

১৯৪৭ সালের পর ঢাকায় এসে প্রথমে তরুণদের সংগঠিত করেন। এঁদের অনেকেই আজীবন তাঁর সঙ্গী ছিলেন। শুনতে হয়তো আশ্চর্য লাগবে, ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমদ বা কামারুজ্জামানের বয়স ছিল ৫০-এর নিচে আর বঙ্গবন্ধুর বয়স ছিল ৫১। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর রেহমান সোবহান, কামাল হোসেন প্রমুখ তরুণ বুদ্ধিজীবীকে আওয়ামী লীগের কাছে নিয়ে আসেন। সভাপতি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পুরো বাংলাদেশ তিনি চষে বেড়িয়েছেন এবং তৃণমূলকে সংগঠিত করেছেন। ওই যে তৃণমূলে তিনি আওয়ামী লীগকে গড়ে দিয়েছিলেন তার সুফল আওয়ামী লীগ এখনো ভোগ করছে। ৩৪ বছরে তিনি তৃণমূলে যে-জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন আর কোনো নেতা সেরকম প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী ৭৮ শতাংশ মানুষ ছিলেন এই তৃণমূলের। রাজনীতিতে লোভ, ক্ষুদ্র স্বার্থের ওপরে যিনি উঠতে পারেননি, তিনিই আর বেশি দূরে এগোতে পারেননি। শেখ মুজিব এগুলির ঊর্ধ্বে ছিলেন তাই তিনি বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন।

প্রথমে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হলেন; লক্ষ্য রাজনীতি করা। যুক্ত বাংলার নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সাবেক সক্রিয় ছাত্রনেতাদের ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের অ্যাসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হয়। সেই সভায় গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। নাইমউদ্দিন আহমদ হলেন এর কনভেনর।

বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘অলি আহাদ এর সভ্য হতে আপত্তি করল। কারণ সে সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান করবে না। … আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম এবং বললাম এখনও সময় আসে নাই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশের আবহাওয়া চিন্তা করতে হবে। নামে কিছুই আসে যায় না। আদর্শ যদি ঠিক থাকে, তবে নাম পরিবর্তন করতে সময় লাগবে না। কয়েক মাস হলো পাকিস্তান পেয়েছি। যে আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তান পেয়েছি, সেই মানসিক অবস্থা থেকে জনগণ ও শিক্ষিত সমাজের মত পরিবর্তন করতে সময় লাগবে।’

সভার অধিকাংশ ছাত্রনেতার এই চিন্তা ছিল বাস্তবসম্মত। তাঁরা সমাজবিজ্ঞান ও জনগণের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চৈতন্যের দিকে লক্ষ্য রেখে বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁদের চিন্তাধারায় পরিপক্বতার পরিচয় ছিল এবং সেজন্যই শেখ মুজিব ও তাঁর সমর্থকেরা ইতিহাসে টিকে গেছেন, বিরোধীরা পূর্ব বাংলার রাজনীতির মূলধারা থেকে ছিটকে পড়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে পূর্ব বাংলার বাঙালির মোহভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৪৮ ও ১৯৫২-র ভাষা-আন্দোলন এবং শেষোক্ত আন্দোলনের ছাত্র-শ্রমিক-কর্মচারীর আত্মবলিদানে পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতিসত্তার উদ্বোধন ঘটে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনীতি ও সংস্কৃতি-চিন্তায় এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ সরকারের দুঃসহ জুলুম, নির্যাতন ও স্বৈরশাসনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি এবং শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে নয়া রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে রাজবন্দি ছিলেন। তাঁকে করা হয় যুগ্ম সম্পাদক। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের মোকাবিলা করার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, শেরেবাংলা এ. কে ফজলুল হকের কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও কয়েকটি ছোট দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। এই যুক্তফ্রন্টের নেতা নির্বাচিত হন হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ভূমিধস জয়লাভ করে। ফলে পাকিস্তানিদের শোষণ-শাসনের লক্ষ্যে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের প্রতারণামূলক কৌশলের অপমৃত্যু ঘটে।

পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার স্তরে ধর্মীয় পাকিস্তানবাদী আদর্শের স্থানে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকশিত হতে থাকে। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ বর্জন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান আবার হয়ে উঠতে থাকে নবচেতনার পূর্ব বাংলা। তরুণ শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন এই চেতনার অমিত সম্ভাবনার নেতা ও সংগঠক। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালিত্ব ছিল শেখ মুজিবের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার মর্মমূলে। প্রকৃতপক্ষে এ ছিল তাঁর জীবনদর্শন ও রাজনীতি সাধনার এক অবিনাশী চেতনা।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। এই দাবি তিনি লাহোরে এক জনসভায় ঘোষণা করেন। ৭ জুন এই দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, তাই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হতে থাকে। অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। দীর্ঘদিন মামলা চলতে থাকে। তারা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহিরুল হককে হত্যা করে চেয়েছিল আন্দোলন থামাতে। কিন্তু এতে বাংলার জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে আন্দোলন আরও তীব্রতর করে।

এক সময় ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে এই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় আইয়ুব শাহি। প্রধান আসামি শেখ মুজিবসহ সব বন্দীকে বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেস কোর্সের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। সেদিন থেকে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ নামে বাংলার মানুষের কাছে নতুন করে পরিচিত হন।

এ-ধারার পরিণতিতে ১৯৭১-র ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এবং অবধারিতভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানিদের হাতে তাঁর গ্রেফতারবরণ ও মৃত্যুর মুখ থেকে ১৯৭২-র ১০ই জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের বক্তৃতায় বলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ও বিয়োগান্ত ঘটনা। ঘাতকদের হাতে সপরিবারে প্রাণ হারিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা পিছিয়ে দিয়েছিল। ঘাতকেরা জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করে। আইনের শাসন রুদ্ধ হয়ে যায়। সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্র জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তখন থেকে দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে আসে। পরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে শেখ হাসিনার ওপর একের পর এক হামলা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়।

বিগত দিনের সব ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন স্বপ্নে জীবন ও সমাজকে সাজানোর প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে বাঙালি জাতি। এ বছরটি বাঙালি জাতির আরও একটি উৎসবের বর্ষ। তা হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, অবিসংবাদিত মহান নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী।

বঙ্গবন্ধুর জন্মের শততম সাল হিসেবে ইতিমধ্যে ২০২০ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। ‘মুজিব বর্ষ’ উদ্‌যাপনে সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বছরব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনেসকো ১৯৫টি দেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করবে। তবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন থেকে শুরু হয়ে এই উৎসব শেষ হবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে।

বঙ্গবন্ধু আজ আর শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, তিনি বিশ্বের নেতা, বিশ্ববন্ধু। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর সব স্তরে, জাতীয় পতাকায়, জাতীয় সংগীতে, শস্য খেতে দোল খাওয়া ফসলে, নদীর কলতানে, পাখির কুজনে তিনি আছেন এবং থাকবেন। তিনি আছেন এবং থাকবেন বাঙালির মননে, চেতনায়, ভালোবাসায় অমর অক্ষয় এবং অব্যয় হয়ে। বাস্তবে ফুল ফুটুক, সৌরভ ছড়াক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশের।

লেখকঃ সজীব চন্দ্র সরকার, সাধারণ সম্পাদক, ফজলুল হক হল ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।