টুঙ্গিপাড়ার ‘খোকা’ থেকে বাঙালির রাষ্ট্রপিতা

১১:৪২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২০ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- ডাক নাম খোকা। কৈশোরে নিজেদের বিদ্যালয়ের ছাদ সংস্কারের দাবিতে নেতৃত্ব দিয়ে একটি দল নিয়ে যান অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে। সেই থেকে শুরু। টুঙ্গিপাড়ার কাদামাটিতে বেড়ে ওঠা সেই খোকা মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বাংলার মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

টুঙ্গিপাড়ার সেই ছোট্ট খোকা একসময় হয়ে ওঠেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মহানায়ক। পরাধীনতার শিকল থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে হয়ে যান মুক্তির দিশারী। যিনি বঙ্গবন্ধু, বাঙালি বাঙালির রাষ্ট্রপিতা।

টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শৈশব কেটেছে জাতির জনকের। ১৯৩৯ সালে প্রথমে বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষদের গড়ে তোলা গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পড়াশোনা শুরু করেন।

এরপর তিনি গোপালগঞ্জে মিশনারি স্কুলে পড়েছেন। সেখানে ছিল বঙ্গবন্ধুর বাবার কর্মস্থল। তাদের স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শেখ মুজিব তাদের দুজনের কাছে স্কুলের উন্নয়নের জন্য জোর দাবি জানান।

স্কুল জীবনে থাকতেই শেখ মুজিবের নেতৃত্বগুণ প্রকাশিত হতে থাকে। কলেজ জীবনে সেই নেতৃত্ব আরও সমৃদ্ধ হয়। তৎকালীন সময়ের বাঘা বাঘা নেতাদের সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি। তখনকার প্রবীণ নেতারা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন শেখ মুজিব ভিন্ন মানুষ। তিনি আর দশজনের মতো নন।

তিনি আলো ছড়াবেন। এ কথা মওলানা ভাসানী, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীরা বিশ্বাস করতেন। তারাও শেখ মুজিবকে ভালোবাসতেন।

যতগুলো অর্থবহ আন্দোলন হয়েছে তার বেশির ভাগেরই কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে প্রথমবার কারাবরণ করেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতা। এরপর থেকে শুরু হয় তার আজীবন সংগ্রামী জীবনের অভিযাত্রা।

১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে পরিণত হন।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরভাস্বর হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষণটি ইউনেসকো বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তিনি। সে রাতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাবন্দী করে রাখা হয়। সে সময় প্রহসনের বিচার করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্যোগও নেয় পাকিস্তানি শাসকরা। যদিও পরে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে মনোনিবেশ করেন।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে যখন অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত করছিলেন, তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি।

সেদিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যা শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নয়, তিনি সবার, কোটি কোটি মানুষের। তিনি আপামর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন বারবার। কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মানুষকে স্থান দিয়েছেন সবকিছুর উপরে। বার বার বলেছেন, প্রথমে আমি মানুষ, তারপর বাঙালি, তার পরে মুসলমান। তাইতো তিনি সেরা মানুষ! শ্রেষ্ঠ বাঙালি! সেরা রাজনীতিবিদ, সেরা নেতা।

মানবিক গুণে সেরা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় সেরা। দেশ বিনির্মানের কারিগর হিসেবে সেরা। সেরা পণ্ডিত অনেকেই আছেন, যারা নিজেদের পাণ্ডিত্য দিয়ে সভ্যতাকে অনেক এগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মানুষের মুক্তি, মানুষকে স্বাধীনতা দিতে বঙ্গবন্ধুর মতো নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার এমন মানুষ বিশ্বে বিরল।

তাইতো কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে দেখে বলেছিলেনন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখেছি’। বঙ্গবন্ধু সে কারণেই সবাইকে ছাড়িয়ে শ্রেষ্ঠ।