দুদকের জালে আটকে যাচ্ছেন সাবেক ওসি প্রদীপ ও স্ত্রী চুমকি

১১:০১ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২০ আলোচিত বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি- টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসের স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ গড়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলায় যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোজাম্মেল হক খান। এছাড়া সংস্থাটি প্রদীপ দম্পতির ব্যাংক একাউন্টসসহ সম্পদ জব্দ করতে আইনি পক্রিয়াও শুরু করবে বলে জানান তিনি।

কক্সবাজারের টেকনাফ থানাধীন মেরিন ড্রাইভ রোডে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ হত্যার পর আলোচনায় আসেন পুলিশ কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাস। সম্প্রতি তার সম্পদের অনুসন্ধানও শুরু করে দুদক।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটার ৬ তলা একটি বাড়ির মালিক প্রদীপ দম্পতি চুমকি। ২০০৬ সালে শ্বশুরের নামে জায়গাটি কিনেন প্রদীপ। এরপর ওই জায়গায় ৬ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ করেন। ২০১৩ সালে শ্বশুরের নামে থাকা সেই বাড়িটি স্ত্রীর নামে দানপত্র হেসেবে দেখান প্রদীপ কুমার দাস। এছাড়া প্রদীপ দম্পতির মৎস্য ব্যবসা থেকে বছরে দেড় কোটি টাকার হিসেব দেখানো হলেও অনুসন্ধানে মৎস্য ব্যবসার প্রমাণ পায়নি দুদক। আয়কর নথিতে কমিশন ব্যবসা থেকেও আয় দেখিয়েছেন প্রদীপ দম্পতি। কিন্তু কমিশন ব্যবসার লাইসেন্সসহ এ সংক্রান্ত কোনো নথি পায়নি দুদক।

দুদক জানায়, ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা সম্পদের কোনো উৎসই দেখাতে পারেননি প্রদীপ দম্পতি চুমকি। তবে প্রদীপ ও তার স্ত্রীর ভারতসহ বিদেশে বাড়ী ও সম্পদ গড়ার দালিলিক প্রমাণ মেলেনি এখনো। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রদীপ দম্পতি চুমকি একজন গৃহিণী। সে কোনো ব্যবসা করেন না। সম্পদ বৈধ করতেই প্রদীপ দম্পতির এ ফন্দি। এমন কিছু থেকে থাকলে অবশ্য বেরিয়ে আসবে।

স্ত্রী চুমকির নামে যত সম্পদ:

প্রদীপ দাশের স্ত্রী চুমকি গৃহিণী হলেও দুদকে জমা দেয়া হিসাব বিবরণীতে তাকে মৎস্য খামারি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূলধনে শুরু করা মৎস্য খামারে চুমকি প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। মৎস্য চাষের লাভের টাকায় কিনেছেন চট্টগ্রাম নগরীতে জমি, গাড়ি-বাড়ি। হিসাব বিবরণীতে চুমকির স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে- নগরীর পাথরঘাটা এলাকায় চার শতক জমি (দাম ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা)।

ওই জমিতে গড়ে তোলা ছয়তলা ভবনের (মূল্য এক কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার); পাঁচলাইশে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কেনা হয় ৬ গণ্ডা ১ কড়া ১ দন্ত জমি (দাম এক কোটি ২৯ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ টাকা); ২০১৭-১৮ সালে কেনা হয় কক্সবাজারে ঝিলংজা মৌজায় ৭৪০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট (দাম ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা)। সব স্থাবর সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে তিন কোটি ৫৯ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা। এছাড়া অস্থাবর সম্পদের মধ্যে দেখানো হয়েছে- প্রাইভেটকার (দাম পাঁচ লাখ টাকা), মাইক্রোবাস (দাম সাড়ে ১৭ লাখ টাকা) ও ৪৫ ভরি স্বর্ণ। ব্যাংকে ৪৫ হাজার ২শ টাকা দেখানো হয়েছে।

দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোজাম্মেল হক খান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রদীপ দম্পতির আয়বহির্ভূত সম্পদ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন দুদক চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়। প্রতিবেদনটি কমিশন কতৃক গৃহীত হলে মামলা দায়ের হবে। একই সাথে আদালত কতৃক অনুমতি নিয়ে প্রদীপ দম্পতির ব্যাংক একাউন্টসসহ সম্পদ জব্দের পক্রিয়াও শুরু করা হবে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানায়, প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় ২০১৮ সালের জুনের মাঝামাঝি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রদীপ ও তার স্ত্রী চুমকির নামে অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্য পান দুদক কর্মকর্তারা। এরপর সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য তাদের চিঠি দেয়া হয়। একই বছরের মে মাসে তারা সম্পদ বিবরণী দুদকে জমা দেন। একই বছরের ১৮ নভেম্বর দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রদীপ ও তার স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে প্রতিবেদন ঢাকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠান। তবে ঢাকা কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। ফাইলটি সেখানেই স্তিমিত হয়ে পড়ে। সম্প্রতি প্রদীপ বরখাস্ত হওয়ায় ফাইলটি সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে দুদক।

জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন প্রদীপ। ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান। তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের উত্তর কুঞ্জুরী গ্রামে। তার বাবা হরেন্দ লাল দাশ ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) নিরাপত্তা প্রহরী। তার দুই সংসারে রয়েছে পাঁচ ছেলে ও ছয় মেয়ে। প্রদীপের ভাই সদীপ কুমার দাশ সিএমপির ডবলমুরিং থানায় ওসি হিসেবে কর্মরত। তাদের আরেক ভাই দিলীপ কুমার দাশ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হেডক্লার্ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসর নিয়েছেন। গ্রামের বাড়িতে তার সৎ ভাইয়েরা থাকেন।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের শামলাপুরের পাহাড়ি এলাকা থেকে শুটিংয়ের কাজ শেষে ফেরার পথে তল্লাশির সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বর্তমানে কারাগারে আছেন ওসি প্রদীপসহ ৭ পুলিশ সদস্য।