• আজ বুধবার। গ্রীষ্মকাল, ৮ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ। সকাল ১০:০৯মিঃ

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: শীতলতা নাকি ‘সোনালি অধ্যায়’?

১১:২৩ পূর্বাহ্ন | বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২০ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনার পটভূমিতে হঠাৎ ঢাকা সফর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাঠানো বার্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দিতে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুইদিনের সফরে ঢাকায় আসেন শ্রিংলা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের শীতলতা বা অস্বস্তি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার মাঝে ঢাকায় দেশ দু’টির পররাষ্ট্র সচিবদের এক বৈঠক থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের জল্পনা ঠিক নয়। এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন জানান, নানা আলোচনার বিপরীতে দুই দেশের ”ভাল সম্পর্কের” বিষয়টিকে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত তুলে ধরার ব্যাপারে তারা একমত হয়েছেন।

অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, দুইদেশের মধ্যে এখন যেকোনও সময়ের তুলনায় ভাল সম্পর্ক রয়েছে। তিনি এটাকে ”সোনালি অধ্যায়” হিসাবে বর্ণনা করেছেন।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ঢাকায় দুইদিনের আকস্মিক সফরে এসে শ্রিংলা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তবে সে বার্তার বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

যদিও দুইদেশের পররাষ্ট্র সচিবরা এখন ”ভাল সম্পর্ক” ও ”সোনালি অধ্যায়ের” কথা বলেছেন, কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কের শীতলতা কাটাতে শ্রিংলার এই সফর কার্যকর হবে কিনা-সেই সন্দেহ রয়েছে বিশ্লেষকদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান মনে করেন, বড় দেশ হিসাবে ভারত প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর সমর্থন তাদের পেছনে আছে বলে এরকম ধরেই নিয়েছে। তবে “বাংলাদেশের জনগণ গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন নীতির কারণে অনেক ক্ষুব্ধ হয়েছে।”

তিনি বলেন তিস্তা চুক্তি, রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক ভাবে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সমর্থন ভারতের কাছে পায়নি। তিনি বলেন তবে তারপরেও প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারতের সবচেয়ে ভাল বন্ধু যদি কেউ থাকে সেটা হল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কখনই আগ বাড়িয়ে কোন পদক্ষেপ নেবে না যেখানে ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়।

রওনক জাহান বলেন, তবে তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ যদি নিজের স্বার্থে কখনও মনে করে যে চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে, সেটা বাংলাদেশকে করতে হবে।

ভারতের আচরণের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চীন একটা জায়গা করে নিচ্ছে। এই অঞ্চলে নেপাল-শ্রীলংকাও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

রওনক জাহান বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ঘাটতির বিষয়টা হয়তো ভারত এখন অনুধাবন করছে। সেজন্য ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের শীতলতা হয়তো কাটানোর চেষ্টা করছে।

যখন দুইদেশের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট আলোচনায় এসেছে। মহামারি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ভ্যাকসিন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়েছে।

এছাড়া পাকিস্তানের সাথেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যোগাযোগ ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেমন নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে, একইসাথে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের গণমাধ্যমেও দেশটির রাজনৈতিক মহলের অস্বস্তির বিষয় শিরোনাম হয়েছে। করোনাভাইরাস দুর্যোগের পাঁচমাস পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এই প্রথম কোনও দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশে এসেছেন।

আর এমন পটভূমিতেই দুইদেশের সম্পর্কের বিষয়ই আলোচনায় অগ্রাধিকার পেয়েছে ঢাকায় দুইদেশের পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠকে।

পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, “দুইদেশের যেসব নিউজ পোর্টাল বা অন্যান্য যেসব সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে ইদানীংকালে যেসব খবর আমরা দেখতে পেয়েছি, সেব্যাপারে আমরা পরস্পরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আমরা একমত হয়েছি যে, আমাদের সম্পর্কের যে বর্তমান অবস্থা বা উন্নত অবস্থায় আমরা আছি, আমরা আপনাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সেই ম্যাসেজটা যেন দিতে পারি।আমরা মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে আমাদের ভাল সম্পর্কের বিষয় তুলে ধরবো।”

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক আরও বেগবান করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বার্তা নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় এই ঝটিকা সফরে এসেছিলেন।

শ্রিংলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করে প্রায় একঘন্টা সময় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সেই বৈঠকের কথা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকারই করা হয়নি। আর ভারতের পক্ষ থেকে বৈঠকের কথা বলা হলেও আলোচনা বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট করা হয়নি।

সফরের শেষদিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে বৈঠকের পর শ্রিংলা দুইদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছেন, “দুইদেশের মধ্যে যেকোনও সময়ের তুলনায় এখন ভাল সম্পর্ক রয়েছে। এটা ”সোনালি অধ্যায় এবং আমরা এটা অব্যাহত রাখবো।”

দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু যেমন রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সহযোগিতা ও সীমান্তে মানুষ হত্যার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে দুই সচিবের বৈঠকে। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন জানান, সীমান্তে মানুষ হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ভারতের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি না হওয়া এবং দ্বিপাক্ষিক কিছু ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে এক ধরণের হতাশা রয়েছে।

সেই পরিস্থিতিতে সম্পর্কও যখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের এই আকস্মিক সফর বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করার চেষ্টার অংশ ছিল বলে ঢাকায় কূটনিতিক সূত্রগুলো বলছে। কিন্তু আশ্বস্তের জায়গা কতটা সফল হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।