এতো পানি আগে দেখেনি উপকূলবাসী, ভেসে গেছে কয়েক হাজার মৎস্য ঘের

৬:১৪ অপরাহ্ণ | শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২০ খুলনা, দেশের খবর

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী ১৬ গ্রামের প্রায় ৩ হাজার পরিবার দিনে দুইবার ডুবছে। লঘুচাপের প্রভাবে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব গ্রামের সমস্ত ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানি বেড়েছে তিন থেকে চার ফুট। উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়া সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় আম্ফানেও এতো পানি হয়নি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এবার ভেসে গেছে কয়েক হাজার মৎস্য ঘেরের মাছ। নষ্ট হয়েছে চাষীদের সবজি ক্ষেত। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মৎস্য ও সবজি চাষীরা। অনেকের বাড়ি ঘরেও পানি উঠে গেছে। রান্নাও বন্ধ রয়েছে অনেকের। তবে সঠিক কি পরিমান ক্ষতি হয়েছে তা জানাতে পারেননি মৎস্য ও কৃষি বিভাগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জ পৌর সদর। প্লাবিত হয় রাস্তা-ঘাট আর বাজারের অলিগলি। ব্যবসায়ীরা দোকানে হা-পা গুটিয়ে পানি নেমে যাবার অপেক্ষায় ঘন্টার পর ঘন্টা গুণতে হয় প্রহর। ক্রেতা-বিক্রেতারা কেউবা হাঁটু পানি ভেঙ্গে, কেউবা ভ্যান মটর সাইকেলে ছুটছে। পৌর সদরের বারইখালী পুরাতন থানা ও ফেরিঘাট এলাকায় পানগুছি নদী স্রোতে আছড়ে পড়ছে রাস্তায় উপরে। হুহু করে ঢুকে পড়ছে পানি লোকালয়। কালাচাঁদ মাজার এলাকার স্লুইজ গেট দীর্ঘদিন অকেজো। পৌর বাজারের ড্রেনের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে স্বাভাবিক জোয়োরেও রাস্ত-ঘাট প্লাবিত হয়। ডুবে গেছে উপজেলা প্রশাসন চত্বর, খাদ্য গুদাম এলাকা। পৌর মেয়র এ্যাড.মনিরুল হক তালুকদার জানিয়েছেন, জোয়ারের পানিতে পৌর সভার ২০ কিমি. রাস্তা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এখন জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজন শহর রক্ষা বাঁধ।

বারইখালী ইউনিয়নের পানগুছি নদীর তীরবর্তী ফেরিঘাট থেকে কাশ্মীর হয়ে বহরবুনিয়া হয়ে ফুলহাতা পর্যন্ত প্রায় ৬/৭ কিমি. রাস্তার ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে বলে ইউনিয়ন চেযারম্যান শফিকুর রহমান লাল ও টিএম রিপন জানান। জোয়ারের পানিতে রোপনা আমন ক্ষেত ঢুবে গেছে।

বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ, রামপাল, চিতলমারী, কচুয়া,ফকিরহাট, সদর উপজেলার বিপুল পরিমান মৎস্য ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। মাঠের ঘেরগুলো পানিতে প্লাবিত হয়ে একাকার হয়ে পড়েছে। মাছের ঘের থেকে পানির সাথে মাছ বের হয়ে বিভিন্ন নদী ও খালে চলে যাচ্ছে। এতে চাষীদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে এ অঞ্চলের মানুষের সুপারসাইক্লোন আম্পান ও জোয়ারের পানিতে চিংড়ি ও মাছের অপুরনীয় ক্ষতি হয়েছে। এখন অতিবর্ষনে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মৎস্য ও সবজি চাষীরা চরম সঙ্কট ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন পার করছে।

 

চিতলমারী উপজেলার ঘের ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান জানান,আমি ৫ একর জায়গা অন্যের জমি লিজ নিয়ে ঘের করি ও ঘেরের পাশে সবজি চাষ করি। যা দিয়ে আমাদের সংসার চলে। কয়েকদিন ধরে অতি বৃষ্টির কারনে আমার ঘের পানিতে ডুবে গেছে। চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে।

মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ঘষিয়াখালী গ্রামের পলাশ শরিফ বলেন, ২২ বিঘা জমিতে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা ব্যয় করে মাছ চাষ করেছিলাম। পানিতে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। কীভাবে দেনা শোধ করব জানিনা।

আম্পানের পরে আবার নতুন করে শুরু করেছিলাম সব কিছু। যখন মাছ বিক্রি করব তখনই টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি আবারও ভেসে গেল আমাদের স্বপ্ন। কী করব জানি না।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদী ও সাগরে জাল ফেলতে না পেরে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সুন্দরবনে অবস্থান নিয়েছেন কয়েক হাজার জেলে। কেউ কেউ আবার শরণখোলায় নিজ উপজেলায়ও ফিরে এসেছে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেন, সমুদ্রে ঝড় হলে জেলেরা সাধারণত বনের খালে আশ্রয় নিয়ে থাকেন। অনেক জেলে আবার লোকালয়েও আশ্রয় নিয়েছে। কোনো জেলে যদি সমুদ্রে সমস্যায় পড়ে থাকে তাহলে তাদের আশ্রয় ও উদ্ধারের জন্য বন বিভাগ চেষ্টা করবে।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার রেহেনা পারভীন জানান, বৃষ্টি ও অতিরিক্ত জোয়ারের পানি আরো দীর্ঘ হলে ৬শ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা ও ২শ’ হেক্টর সবজি ক্ষেতের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাগেরহাটর উপ-পরিচালক রঘুনাথ কর জানান, সবজি মৌসুমের এখন প্রায় শেষ সময়। এখনো বৃষ্টিতে সবজির তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। এভাবে যদি আরো ২/১ দিন ধরে বৃষ্টি হয় তাহলে সবজি ও আমনের বীজতলা সহ আগাম শীত কালিন সবজির বীজ তলার ব্যাপক ক্ষতি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক নারায়ন চন্দ্র মন্ডল বলেন, আমরা খবর পেয়েছি অবিরাম বৃষ্টি ও বেড়িবাঁধ উপচে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে বাগেরহাটের কোথাও কোথাও চিংড়ি ঘের ডুবে গেছে। আমরা জেলা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনের জন্য। মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য পেলে সরকারকে পরিমাণ জানানো হবে।