শ্রমিকদের আরও ৩ মাসের বেতন দিতে প্রণোদনা চান পোশাক মালিকরা

১:১৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২০ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- পোশাক শিল্পের ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিলের কারণ দেখিয়ে শ্রমিকদের চলতি অগাস্টসহ আরও তিন মাস শ্রমিকদের বেতন দিতে সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা।

মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে ‘এখনও সংকট চলছে’ উল্লেখ করে এ শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের অগাস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বেতন-ভাতা দিতে এই প্রণোদনা চাওয়া হয়েছে।

গত ২০ অগাস্ট পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এই প্রণোদনা চেয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে একটি চিঠি দিয়েছে। শ্রমিকদের বেতন দিতে পোশাক শিল্প মালিকদের আরও প্রণোদনা দেওয়া হবে কি না-সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল।

চিঠির বিষয়ে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বুধবার রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, “নতুন অর্ডার আসছে, তবে কম। এখনও আমরা শতভাগ উৎপাদনে যেতে পারিনি। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে যে অর্ডারগুলো স্থগিত হয়েছিল সেগুলোই এখন রপ্তানি করছি। এখনও আমরা অর্থ সংকটে আছি। আরও তিন মাসের বেতন-ভাতা দিতে সহজ শর্তে ঋণ পেলে সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারব। তখন আমাদের বেতন দিতে কোনো সমস্যা হবে না।

“সে কারণে শেষবারের মতো সরকারের কাছে আমরা এই প্রণোদনাটি চেয়েছি।”

তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের এই চাওয়ার বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, “কেন জানি মনে হচ্ছে সরকার পোশাক খাতের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারীতে তো সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে। সব দিকেই সমান মনোযোগ দিতে হবে।

“আর তাছাড়া রপ্তানি খাত তো ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এখন প্রতি মাসেই রপ্তানি বাড়ছে। তাহলে এ খাতে আর প্রণোদনা কেন? অন্য যে সব খাত এখনও সংকটে রয়েছে সেগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

“বিশেষ করে, এসএমই খাতের জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে, তার বাস্তবায়নের অবস্থা কিন্তু খুবই খারাপ। আমি মনে করি, সরকারকে এখন এই দিকেই বেশি জোর দিতে হবে।”

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, “একটা বিষয় বোধ হয় আমরা ভুলে যাচ্ছি, প্রণোদনা দিয়ে কোনো খাতকেই দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। শুধু আমার নয়, দেশের অনেক মানুষের মনেই প্রশ্ন জাগে, পোশাক শিল্প মালিকরা এতদিন যে মুনাফা করেছে সেই টাকা গেল কোথায়? সব সময় সরকারের কাছে সহায়তা চাইতে হবে কেন?”

মহামারী শুরুর পর পোশাক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছিল সরকার। সেই তহবিল থেকে ২ শতাংশ ‘সার্ভিস চার্জে’ (সুদে) ঋণ নিয়ে এপ্রিল, মে ও জুন মাসে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিয়েছেন মালিকরা।

ওই তহবিলের মেয়াদ ফুরোনোর পর আরও তিন মাসের (জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর) বেতন-ভাতা দিতে প্রণোদনা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।

ওই আবেদনের পরিপেক্ষিতে সরকার শিল্প ও সেবা খাতের জন্য যে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছিল, সেখান থেকে শুধু জুলাই মাসের বেতন-ভাতা দিতে ঋণের ব্যবস্থা করা করে। আর সেজন্য ওই তহবিলের আকার ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এখন আবার তিন মাসের বেতন-ভাতা দিতে সরকারের কাছে ঋণ প্রণোদনা চেয়েছে পোশাক খাতের এই দুই সংগঠন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী এমপি বলেন, ‘এটা সত্য যে ইতিমধ্যে আমরা বেশ ভালো রপ্তানি করেছি। কিন্তু সেই টাকাটা এখনো সবার আসতে শুরু করেনি। এখন দেখা গেছে যার টাকা আছে সে বেতন দিয়ে দিল। কিন্তু যার টাকা এখনো আসেনি সে বেতন দিতে পারছে না। এতে শিল্পে একটা অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। তাই সবার কথা বিবেচনা করে এ আবেদন। আমরা এটাকে তো ঋণ হিসেবে চাচ্ছি। শেষবারের মতোই এ সহায়তাটা আমরা চাচ্ছি।’

বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘আমাদের ক্রেতারা রপ্তানির মূল্য নগদে পরিশোধ করছে না। তাই সরকার যদি কোনো কারণে ঋণ দিতে না পারে তাহলে অন্তত আমাদের রপ্তানি বিল সুদবিহীন ক্রয় করার ব্যবস্থা করে দিক।’

এদিকে বাংলাদেশ কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন।

কারখানাগুলোর রপ্তানি বাড়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দাবি করে আসছেন, তাদের বাতিল/স্থগিত হওয়া অধিকাংশ ক্রয়াদেশ আবারও ফিরে এসেছে। নতুন ক্রয়াদেশও যুক্ত হচ্ছে। এ কারণে রপ্তানির এত প্রবৃদ্ধি। তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যদি বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ ফিরেই আসে তাহলে বিজিএমইএর চিঠির যৌক্তিকতা কতটুকু। আবার যদি বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ ফিরে না আসে তাহলে রপ্তানিকৃত পণ্য সবই নতুন ক্রয়াদেশের। তাই বলাই যায় এ শিল্প করোনায় আগের চেয়েও আরও ভালো অবস্থানে আছে।

বর্তমানে কাজের অবস্থা জানার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের ১০ জন পোশাক কারখানা মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে একটি জাতীয় দৈনিক। কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্ট বরাবরই এ খাতে ক্রয়াদেশ কম থাকে। এবার করোনার কারণে এটা যে হারে কমার কথা তার চেয়ে অনেক ভালো। দাম কম হলেও নিয়মিত অর্ডার আসছে। যেসব কারখানা একটু ছোট তাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কাজ না থাকায় কিছু কারখানা আগস্টের প্রথম ১০ দিন ছুটিও দিয়েছে। এমনটা প্রতি বছরই হয়ে থাকে। যেহেতু গত চার মাস ধরে নিজস্ব অর্থায়নে শ্রমিকের টাকা দিতে হয়নি তাই সবার কাছেই কমবেশি নগদ অর্থও আছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, পোশাক খাত করোনায় অনেক প্রণোদনা পেয়েছে। বর্তমানে এ খাতের রপ্তানিও ভালো অবস্থায় গেছে। এছাড়া পোশাক খাতকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। তাই নিজস্ব অর্থায়নেই এ খাতকে এখন চলতে দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘সমস্যা হলো, গার্মেন্টস মালিকরা সারাদিন শুধু দাও দাও করতে থাকে। তাদের কি ১২ মাস লাভ করতে হবে? আমার মনে হয় শ্রমিকের বেতন পরিশোধের জন্য আর কোনো প্রণোদনার যৌক্তিকতা নেই।’