• আজ ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে উগ্রহিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের ওপর হামলা চালায় পুলিশও: অ্যামনেস্টি

২:২৮ অপরাহ্ন | রবিবার, আগস্ট ৩০, ২০২০ আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ দিল্লিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ভারতীয় পুলিশ বাহিনী মারাত্মকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এমন অভিযোগ ‍তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

বলা হয়, পুলিশ মুসলমানদের পিটিয়েছে, আটক করে নিয়ে মারধর করেছে, উগ্রবাদী হিন্দুদের সঙ্গে মিলে তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে।

ভারতের বিতর্কিত নাগারিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ৪০ জন নিহত হন। যাদের বেশিরভাগ মুসলমান। পুড়িয়ে দেয়া হয় মুসলমানদের বাড়িঘর। জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে অ্যামনেস্টি জানতে চাইলে মুখ খোলেনি দিল্লি পুলিশ।

ফেব্রুয়ারির দাঙ্গার সময়কার পুলিশের নির্মমতা এবং কুকর্ম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসে। অ্যামনেস্টির অনুসন্ধানে সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। যা দিল্লির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা। যদিও তখন পুলিশ জানিয়েছিল তারা অন্যায় কিছু করেনি।

দাঙ্গার একটি ভিডিও তখন সামাজিক মাধ্যম এবং ম্যাসেজিং গ্রুপগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি উত্তর-পূর্ব দিল্লির খাজুরি খা এলাকা থেকে ধারণা করা। এতে দেখা যায়, উগ্রবাদী হিন্দুদের সঙ্গে জোট বেঁধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পাথর নিক্ষেপ করছে পুলিশ।

বিবিসির ভারত প্রতিনিধি যোগিতা লিমিয়া জানান, তারা ওই ভিডিও নিয়ে তদন্ত করেছেন। উভয় সম্প্রদায়ের লোকজনের সাক্ষাতকার নিয়েছেন তারা।

ব্যবসায়ী ভোরা খান জানান, পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেছে। হিন্দুরাও রাস্তায় মুসলমানদের দিকে ইট-পাথর ছুঁড়েছে। রাস্তার পাশেই তার বাড়ি এবং দোকান ছিল। হামলাকারীরা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় সব। তার অভিযোগ, হিন্দুদের সঙ্গে এক হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে পুলিশ।

যোগিতা লিমিয়া জানান, তারা আরেকটি ভিডিও নিয়ে তদন্ত করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ফাইজান নামে এক মুসলমানকে নির্মমভাবে প্রহার করছে একদল পুলিশ সদস্য। কয়েকদিন পরই তিনি মারা যান। তার ভাই নাঈম বিবিসিকে জানান, পুলিশের হাতে নির্মম প্রহারের শিকার হয়ে ফাইজান মারা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে ওই সময় কোনো মন্তব্য করেনি পুলিশ। বিবিসি হিন্দিকে পুলিশ জানায়, ভিডিওতে কী আছে তা খতিয়ে দেখবেন তারা। অ্যামনেস্টিসহ অনেকে প্রশ্ন তুলেছে, নিজের লোকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত করবে পুলিশ। এটা কতোটা বিশ্বাস করা যায়?

বিবিসির প্রতিবেদনের প্রতিধ্বনি হয়েছে অ্যামনেস্টির অনুসন্ধানেও।

অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তথ্য, উপাত্তের ভিত্তিতে প্রমাণ হয়েছে, দাঙ্গায় হিন্দুদের চেয়ে তিনগুণ বেশি মুসলমান হতাহত হয়েছে। জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে মুসলমানদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

তুলনামূলকভাবে মুসলমানদের প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হলেও হিন্দুদের বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বলা হয় প্রতিবেদনে।

গেলো বছর বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে ভারত। এ আইনকে মুসলমিবিরোধী আখ্যা দিয়ে ভারতজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন।

এরকম একটা বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল দিল্লিতেও। যা পরে সংঘাতে রূপ নেয়। জ্বালাও, পোড়াও প্রাণহানিতে জড়ায় আইনের সমর্থক ও বিরোধীরা।

শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যা স্থায়ী হয় তিনদিন। উগ্রহিন্দুরা মুসলমানদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেয়। ভিডিও পর্যালোচনা করে অ্যামনেস্টি জানায়, পুলিশি নিরাপত্তায় বেশ কিছু জাগায় মুসলমানদের স্থাপনায় অগ্নি সংযোগ করে উগ্রহিন্দুরা।

অ্যামনেস্টি জানায়, ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদরা জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। যার কারণে এ দাঙ্গা আরো নৃসংশ হয়ে ওঠে। তবে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যাদের আটক করেছে পুলিশ, তারা মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী। বেশিরভাগই মুসলমান।

বলা হয়, যেসব ভারতীয় রাজনীতিবিদ দাঙ্গায় উস্কানি দিয়েছে তাদের একজনকেও বিচারের আওতায় আনা হয়নি। স্বাধীন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানায় অ্যামনেস্টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দাঙ্গায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। দিল্লি পুলিশেই মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত। কিন্তু এখনো পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো তদন্তই করা হয়নি।

দাঙ্গায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রশ্ন উঠেছে। দিল্লি মাইনোরিটিজ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মুসলমানদের বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে, অগ্নিসংযোগে উগ্রহিন্দুদের সহায়তা করেছে দিল্লি পুলিশ।