ফেনীতে বর্জ্য থেকে সার উৎপাদন প্রকল্প: দ্বিতীয় মেয়াদেও হয়নি অবকাঠামো হস্তান্তর

৩:৫৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২০ চট্টগ্রাম, দেশের খবর

আবদুল্লাহ রিয়েল, ফেনী: ফেনী পৌরসভায় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে নির্মাণাধীন বর্জ্য থেকে সার উৎপাদন প্রকল্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হলেও এখনো কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পের অবকাঠামো হস্তান্তর করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে নির্দিষ্ট সময়ে মূল প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, কাজের ধীরগতির কারণেই দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যেও অবকাঠামো হস্তান্তর করা যায়নি। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, গেট ও সীমানা প্রাচীরের নকশা কয়েক দফা পরিবর্তন করায় নির্দিষ্ট সময়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

ফেনী পৌরসভা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০ বছর ধরে ফেনী শহরের প্রবেশদ্বার দেওয়ানগঞ্জসহ একাধিক স্থানে রাস্তার পাশে ফেলা হতো পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের ময়লা ও আবর্জনা। এতে উত্কট গন্ধে স্থানীয়রা পড়তেন চরম ভোগান্তিতে। আক্রান্ত হতেন ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে। ময়লার দূষণে ঘর করেও সেখানে বসবাস করতে পারেনি জনসাধারণ।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, ফেনী পৌরসভায় প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয় তার ৬০ ভাগ পর্যন্ত পৌরসভার পক্ষে অপসারণ করা সম্ভব। বাকি ময়লা নিচু জায়গা, ড্রেন, রাস্তাঘাটে যত্রতত্র পড়ে থাকে। এতে জলাবদ্ধতাসহ বর্জ্য পচে বায়ু ও পানি দূষিত হয়। স্থানীয় সরকার আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়ায় বর্জ্য অপসারণে দক্ষ নয়। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে কঠিন বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করে উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনে ফেলে রাখা হয়, যেখানে বর্জ্য পচে প্রচুর গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গত হয়। এজন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার ২০১০ সালে ‘ন্যাশনাল থ্রি আর (রিডিউস, রিইউজ অ্যান্ড রিসাইকেল) স্ট্র্যাটেজি ফর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’ প্রণয়ন করে। এ প্রকল্প জলবায়ু পরিবর্তনের ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির প্রধান উদ্দেশ্য গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস এবং পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা। সার্টিফায়েড অ্যামিশন রিডাকশন ও ভেরিফাইয়েড অ্যামিশন রিডাকশন বিক্রির মাধ্যমে আয় বাড়ানো এবং এর থেকে তৈরীকৃত জৈব সার ব্যবহার করে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করা হবে।

ফেনী পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী বিপ্লব কুমার নাথ জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৪ হাজার ৮৭ টাকা বরাদ্দে ২০১৮ সালের ১ আগস্ট প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় মেসার্স মঞ্জুরুল হক মঞ্জু নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ওই বছরের ৭ অক্টোবর ফেনী পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ড সুলতানপুর এলাকায় জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মেয়র হাজী আলাউদ্দিন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৭০ শতক জমির ওপর ২০১৯ সালের ১ মে কাজটি শেষ করার নির্দেশনা দেয় পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (সিডিএম) ও ফেনী পৌরসভা। নির্ধারিত সময়ে কাজের ৪০ ভাগ বাকি থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নানা অজুহাতে সময় বৃদ্ধির আবেদন করে। পরে আবেদন বিবেচনা করে দ্বিতীয় মেয়াদে সময় বৃদ্ধি করে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি পার হয়ে গেলেও এখনো প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়নি।

গত শনিবার সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রকল্পের জন্য ১১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি শেড তৈরি করা হয়েছে। শেডের ভেতর ১৯টি আবর্জনা রাখার হাউজ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে প্রধান ফটক। এখন চলছে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ।

প্রকল্পস্থলে দেখা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তদারকির দায়িত্বে থাকা সেন্টু মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, এরই মধ্যে কাজ প্রায় ৯০ ভাগ শেষ হয়েছে। গেট নির্মাণকাজও প্রায় শেষ প্রান্তে। এখন চলছে সীমানা প্রাচীর তৈরির কাজ। অক্টোবরের আগেই এটি হস্তান্তর করার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানান সেন্টু মিয়া।

তিনি আরো জানান, কয়েক দফায় গেট ও সীমানা প্রাচীর তৈরির স্থান ও ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। পরিবর্তনগুলো প্রকল্পের কার্যালয় থেকে অনুমোদন করতে সময় নষ্ট হওয়ায় কাজ যথাসময়ে শেষ করা যায়নি।

ফেনী পৌরসভার বিভিন্ন সূত্র জানায়, প্রতিদিন ফেনী পৌরসভায় ৭০ থেকে ৮০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্য থেকে পচনশীল দ্রব্য ও অপচনশীল দ্রব্য আলাদা করে প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে। ফেনীতে নির্মাণাধীন প্রকল্পের ধারণক্ষমতা দৈনিক সাত টন। প্রাথমিকভাবে দুই বছর পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি এনজিও এটি পরিচালনা করবে।

ফেনী পৌরসভার প্যানেল মেয়র আশ্রাফুল আলম গীটার ও নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী জানান, প্রকল্পটি চালু করতে সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থা খুবই আন্তরিক। এটি চালু হলে ফেনী হবে গ্রিন ও ক্লিন সিটি।

ফেনী পৌরসভার মেয়র হাজি আলাউদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটির কাজ শেষ প্রান্তে। অক্টোবরের শুরুর দিকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করব। এটি চালু হলে একদিকে রাস্তার পাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপের দূষণ থেকে রেহাই পাবে পৌরবাসী। প্রতিদিন প্রকল্পের মাধ্যমে সাত-আট টন জৈব সার উৎপাদন হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৯৬ হাজার টাকা।