আধুনিকায়ন হচ্ছে ঢাকা শিশু হাসপাতাল, উদ্বোধনের অপেক্ষায় ‘সার্জারী বিভাগ’

১:৫৬ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ ফিচার

রবিউল ইসলাম, সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা- রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শ্যামলী এলাকায় অবস্থিত ঢাকা শিশু হাসপাতালে দেশের প্রথম ডিজিটাল হাসপাতাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে শিগগিরই। বিশ্বমানের সার্জারী বিভাগ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে আসন বৃদ্ধি, হাসপাতালের পরিবেশ— সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে হাসপাতালটি।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, শুধু শিশুদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হাসপাতালটিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের যৌথ অর্থায়নে সার্জারী বিভাগের কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম শিশু সার্জিক্যাল আইসিইউ ছাড়াও এখানে থাকছে ৩২ বেডের আধুনিক ওয়ার্ড। যা খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। আর আধুনিক এ সার্জারী বিভাগটি চালু হলে সর্বস্তরের শিশুদের দেশেই উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে হাসপাতালটির অবস্থান ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে শের-ই-বাংলা নগরে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থানান্তরিত হয়। প্রথমে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এবং বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বিচ্ছিন্ন ও সীমিতভাবে দরিদ্র রোগাক্রান্ত শিশুদের জন্য চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে শিশুদের সার্বিক চিকিৎসার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে উঠে আসলেও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে গত দুই বছরে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ব্যাপক উন্নয়ন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ হাসপাতালটিতে বেড়েছে রোগীর হার ও চিকিৎসা সেবার মান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ভারত ও সিঙ্গাপুরের তুলনায় অনেক কম খরচে উন্নত মানের চিকিৎসা দিচ্ছে শিশুদের জন্য দেশের বৃহৎ এই হাসপাতালটি।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও শিশু হাসপাতালের যৌথ অর্থায়নে হাসপাতালটিতে তৈরি হয় একটি বর্ধিত অংশ। যেখানে রয়েছে একটি অপারেশন থিয়েটার, আট শয্যার পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড, চার শয্যার সার্জিকাল আইসিইউ ও চার শয্যার এইচডিইউ ইউনিট। এছাড়া অত্যাধুনিক মডুলার ওটি, অত্যাধুনিক সার্জিক্যাল মেশিনসহ রয়েছে ৩২ বেডের আধুনিক ওয়ার্ড।

জানা গেছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ঢাকা শিশু হাসপাতালের অ্যাডভান্সড শিশু সার্জারি অ্যান্ড স্টেম সেল থেরাপি ইউনিট স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে। আর শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের মোট ব্যয় ২৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন খাত থেকে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের খাত থেকে ৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ধরা আছে। তবে সক্ষমতা না থাকার কারণ দেখিয়ে এই প্রকল্পে এক টাকাও খরচ করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রায় ১৫ কোটি টাকা দিয়েই এসব কাজ সমাপ্ত করা হয়।

এই প্রকল্পের উল্লেখ্যযোগ্য দিক হলো- মডুলার ওটি, সার্জিকাল ওটি, সার্জিক্যাল আইসিইইউসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি। যার মাধ্যমে অনেক জটিল রোগীদের চিকিৎসা অনেকাংশে সহজ হবে।

হাসপাতালের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্বমানের এই সার্জারী বিভাগটি আনুষ্ঠানিক চালু হবে। যদিও উদ্বোধনের আগেই বেশিরভাগ অংশের কাজ বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপরিচালক হেলালউদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও কয়েকমাস আগেই কাজ শেষ হয়ে গেছে। শিগগিরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সব কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এসএম খালিদ মাহমুদ সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, বিশেষায়িত চিকিৎসায় বর্তমানে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে আমরা চিকিৎসা সেবা পরিচালনা করছি।

‘ঢাকা শিশু হাসপাতালকে এশিয়ার বৃহত্তম শিশু হাসপাতালে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এই হাসপাতালে অসংখ্য উন্নয়ন হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসায় এবার হাসপাতালটিতে নতুন সংযোজন হলো বিশ্বামানের সার্জারী বিভাগ।’

তিনি বলেন, আধুনিকায়ন সার্জারী বিভাগ নির্মাণের ফলে এখন থেকে কম খরচে দেশেই বিভিন্ন জটিল অসুখের চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। অনেক ক্রিটিকাল রোগীদের অপারেশন করার পর তাদের সার্জিক্যাল আইসিইউতে রাখতে পারব। এছাড়া আধুনিক এই চিকিৎসা ব্যবস্থার ফলে ক্রিটিকাল রোগীদের দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার প্রবণতাও অনেকাংশে কমে যাবে।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. প্রবীর কুমার সরকার সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, সার্জারী বিভাগের আধুনিকায়নের যাবতীয় কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রকল্পে হাসপাতালের পক্ষ থেকে যে প্রায় ১০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল, সক্ষমতা না থাকায় সেই টাকা দেওয়া হয়নি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের দেওয়া প্রায় ১৫ কোটি টাকা দিয়েই সব কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। আগামী মাসের শুরুতেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হবে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩৩ ভাগ রোগীর বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয় জানিয়ে ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, ৬৬০ জন রোগী ভর্তি করানোর সক্ষমতা রয়েছে হাসপাতালটির। তাই কোনো রোগী যেন এখানে এসে ফেরত না যায় সেজন্য হাসপাতালে আরও বেড বাড়ানো প্রয়োজন। হাসপাতালটির আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার থেকে শিশু হাসপাতালে একটা আর্থিক সহযোগিতা পায়। যা আমরা বিভিন্ন কাজে খরচ করি। তবে ঢাকা শিশু হাসপাতালের অবকাঠামোগত অবস্থান খুব খারাপ। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের সাথে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) একটা ভাগাভাগি আছে।

‘১৯৭১ সালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা জন্য বিদেশি চিকিৎসক অর্থোপেডিক সার্জন ডক্টর আরজে গাষ্টন পঙ্গু হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের চিকিৎসার জন্য একটা অংশ নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু সেই অংশ এখন পর্যন্ত আমরা পরিপূর্ণভাবে বুঝে পাইনি।’

উপ-পরিচালক ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, ভাগাভাগি করে আমরা এখন যে অবস্থায় আছি, তাতে আমাদের জায়গা অনেক কম। আমরা সবসময় সরকারের সহযোগিতা চেয়ে আসছি এবং আরও চাইব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাব শিশু হাসপাতালকে বড় করার জন্য পঙ্গু হাসপাতালের সাথে আমাদের এই সমস্যাটা যেন দ্রুত সমাধান করে দেন।