• আজ ৭ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে হবিগঞ্জের করাতি সম্প্রদায়ের পেশা!

১০:৩৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ ইতিহাস-ঐতিহ্য
karati

মঈনুল হাসান রতন, হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ গাছের শক্ত ডাল আর রসি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি কাঠামো। তাতে উপরে রাখা হয়েছে একটি বিশাল আকারের গাছ। গাছের উপরে অবস্থান করছেন একজন আর নিচে দুইজন। হাতলযুক্ত করাত দিয়ে উপর-নিচে টেনে ছন্দে ছন্দে চিরানো হচ্ছে গাছ।

নিচে ঝরে পড়ছে কাঠের কোমল গুঁড়া। কোন এক বড় গাছের ছায়ার নিচে গাছ চিরানোর এই কাজটি করে চলেছেন করাতিরা। তাদের শরীর বেয়ে ঝরছে ঘাম। করাতের অবস্থান এবং গতি ঠিক রাখতে কিছুক্ষণ পরপর দেয়া হচ্ছে সাময়িক বিরতি।

হাতলযুক্ত করাত দিয়ে গাছ কাটার এ দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। আধুনিক করাতকল কেড়ে নিয়েছে গ্রাম-বাংলার করাতি সম্প্রদায়ের এই পেশাটি। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই পেশাটি অপরিচিত হলেও একসময় কাঠ চিরানোর জন্য এই করাতি সম্প্রদায়ের ওপরই নির্ভর করতে হত মানুষকে। একসময় গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়তই এই দৃশ্য চোখে পড়ত।

আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগেও বৈদ্যুতিক স’ মিলের তেমন দেখা মিলতো না। বড় বড় গাছ কিংবা আসবাব পত্রের কাঠ কাটার জন্য তখন নির্ভর করতে হতো করাতিদের উপর। বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হতে চললেও একসময় এই সম্প্রদায়ের লোকজন প্রায় প্রতিটা অঞ্চলেই দেখা মিলতো। এমনকি গ্রামে গ্রামে ফেরি করে গাছ কাটার কাজ করতেন এই করাতিরা।

কখনও কখনও গাছ কাটার জন্য থাকতো নানান সুরের গান। গানের তালে তালে চলতো গাছ কাটা। আর চারপাশে ভিড় জামাতো ছেলে-বুড়োরা। মুগ্ধ হয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করতেন সবাই। করাতি সম্প্রদায় আজ আর তেমন চোখে পড়ে না। আধুনিক স’ মিল আর কালের বিবর্তন এবং জীবন-জীবিকার তাগিদে তারা অনেকেই পেশা বদল করেছেন। তাই আগের মতো তেমন আর চোখে পড়ে না করাতিদের গাছ কাটার দৃশ্য।

বর্তমানে আধুনিকতার উৎকর্ষের দাপটের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার এক সময়ের এই করাতি পেশা।আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে। প্রগতি ও প্রযুক্তির যুগে কর্মব্যস্ত মানুষের ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে তেমনি যে কোনো কাজ স্বল্প সময়ে কম খরচে দ্রুত সম্পন্ন করতে পারলেই মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে বলে ধারণা জন্মেছে। গ্রাম-গঞ্জেও এখন পুরোপুরি করাতকলের যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে করাতের ছন্দময় শব্দ।

বিভিন্ন হাট-বাজারের, পাড়া-মহল্লায় অগণিত করাতকল অতি কম খরচে অল্প সময়ের মধ্যে চাহিদা মাফিক কাঠ চিরানো হচ্ছে। এক সময় হবিগঞ্জের প্রায় গ্রামেই করাতি সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতেন। মাঝে মাঝে শুকনো মৌসুমে পার্শবর্তী কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোনা জেলা থেকেও এই অঞ্চলে করাতিরা আসতেন। ছয় মাসে ধারাবাহিকভাবে গ্রামের সব গাছ চিরে আবার বর্ষা মৌসুমে নিজ নিজ এলাকায় চলে যেতেন তারা।

কখনও কখনও পূর্ব থেকেই গাছ চিরানোর অর্ডার পেতেন আবার কখনও কখনও গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ফেরি করে গাছ চিরানোর কাজ করতেন তারা। তৎকালীন সময়ে গাছ কাটতে হলে করাতিদের অপেক্ষায় থাকতে হতো গৃহস্থালীদের। কিন্তু বর্তমানে বাপ-দাদার এ পেশা ছেড়ে লাভজনক অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় করাতিরা আজ বিলুপ্ত প্রায়। তবুও জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে এখনো দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে পৈত্রিক সূত্রে বাপ-দাদার এ পেশাকে ধরে রেখেছেন কেউ কেউ।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার এমনই একজন করাতি সুবল সরকার। ৭০ এর দশকে করাতির এই কাজ শুরু করেছিলেন সুবল সরকার। বর্তমানে তার বয়স ৮০ বছর। ৫০ বছর ধরে গাছ চিরানোর এই কাজ করছেন তিনি। তার বাবাও এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

তার সাথে কাজ করছেন আরও দুই সহযোগী। মোহনলাল সরকার ও গৌরচান সরকার। তাদের উভয়েরই বয়স ৭০ বছর। তারা জানান, মাঝারি সাইজের একটি গাছ তিনজনে চিরতে লাগে অন্তত দুইদিন। মজুরি পাবেন ৩ হাজার টাকা। তারা আরও জানান, নিয়মিত কাজ পেলে ভাল আয় হয়। কিন্তু আমাদের এই কাজটা এখন কদাচিৎ করতে পারি।

বানিয়াচং উপজেলার বিদ্যাভূষণ পাড়ার প্রবীণ করাতি সুবল সরকার জানান, পঞ্চাশ বছর ধরে আমি এ পেশার সঙ্গে জড়িত। আগে আমার বাবা তা করতেন। বাবার মৃত্যুর পর থেকে আমি এ কাজ করে আসছি। তবে শুধু এ পেশার উপর নির্ভর করে টিকে থাকা এখন আর কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। তার একছেলে কাঠমিস্ত্রির কাজ করছে বলে জানান সুবল সরকার।

হবিগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল বলেন, একসময় এই পেশাটির অনেক কদর ছিল। গ্রাম-বাংলায় হাতলযুক্ত করাত দিয়ে গাছ চিরানোর এ দৃশ্য ছিল চিরচেনা। কাঠ চিরাতে হলে এই করাতিদের ওপরই নির্ভর করতে হত তখন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সবকিছুতেই পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ এখন স্বল্প সময়ে সবকিছুই করে ফেলতে চায়। তাই এদের কদর নেই বললেই চলে। করাতিরা এখন নিজের বাপ-দাদার পেশা বাদ দিয়ে বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।

ধর্ষকদের যমদূত ছিলেন ফুলন দেবী

মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২০

৫১৩ বছরের সাক্ষী ‘শংকরপাশা মসজিদ’

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০

বঙ্গবন্ধু ও ধানমন্ডি ৩২

শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২০