সংবাদ শিরোনাম
কটিয়াদীতে নিখোঁজের পর মাটি খুঁড়ে মা-বাবা ও ছেলের লাশ উদ্ধার | ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু জিনিয়া বাঁচতে চায়, প্রয়োজন সহযোগিতার | সফলতার রঙিন স্বপ্ন: নওগাঁর মাটিতে থোকায় থোকায় ঝুঁলছে মিষ্টি-সুস্বাদু আঙ্গুর | আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গে একদিনে সর্বোচ্চ করোনায় আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রে! | মহানবীকে নিয়ে ব্যঙ্গ কার্টুন প্রদর্শনের প্রতিবাদে ফরিদপুরে বিক্ষোভ মিছিল | স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হলেন নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতেশ্বরী হোমস | ইসলাম অবমাননাকর কার্টুন প্রকাশের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া | সেনেগালে নৌকাডুবে ১৪০ অভিবাসী প্রত্যাশীর মৃত্যু | ইসলামপন্থি সন্ত্রাসের কাছে হার মানবে না ফ্রান্স: ম্যাক্রোঁ | ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায়’- এলজিআরডি মন্ত্রী |
  • আজ ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি, পানি বন্দি লাখ লাখ মানুষ

৫:০৮ অপরাহ্ন | শনিবার, অক্টোবর ৩, ২০২০ দেশের খবর, রংপুর

ফরহাদ আকন্দ, স্টাফ রিপোর্টার- যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছে পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ।

পানির তোড়ে কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে বাঁধ। ভেসে গেছে রাস্তা, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ ও ফসলসহ হাজার হাজার একর আবাদী জমি। সব মিলিয়ে মানববেতর জীবনযাপন করছে বানভাসি মানুষ।

কুড়িগ্রাম: অবিরাম বর্ষণ আর উজানের ঢলে পানি বাড়তে থাকায় পঞ্চম দফায় কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমরসহ সবকটি নদ-নদীর পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ১২০টি চরের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। জেলার ৯টি উপজেলার ৬৭টি উন্মুক্ত পয়েন্টে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বন্যায় নিম্নাঞ্চলগুলোতে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, নলকূপ পানিতে তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সমস্যা। বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। লোকজন গবাদিপশু নিয়ে আবার বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

লালমনিরহাট: বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে লালমনিরহাটের চাষিদের আমন ধান ও সবজি ক্ষেত। দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকায় আমনের চারা গাছ নষ্ট হয়ে ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা করছেন চাষিরা। জানা যায়, গত সপ্তাহ জুড়ে টানা ভারী বৃষ্টিতে লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়। এতে জেলার ৫টি উপজেলার নিচু অঞ্চলের সব আমন ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। টানা ৫-৬ দিন পানিতে ডুবে থাকায় মধ্য বয়স্ক আমনের চারা গাছ পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর মধ্যে তুলনামূলক উঁচু অঞ্চলের আমন ক্ষেতের চারা গাছ দেখা গেলেও নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ ধান ক্ষেত এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেতের আমনের চারা গাছ পচে নষ্ট হয়েছে। এভাবে টানা দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকলে বাকি আমন ক্ষেত পচে নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন জেলার চাষিরা।

রংপুর: রংপুরের পীরগাছা ও মিঠাপুকুর উপজেলার মাঝ দিয়ে ঘাঘট নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৩৬ কিলোমিটার। এর পানি প্রবাহমাত্রা অবস্থাভেদে ৫০ থেকে আড়াই হাজার কিউসেক। দখল হয়ে যাওয়ায় ৫০ ফুট প্রশস্ত ঘাঘট নদ এখন ১০ ফুটে এসে ঠেকেছে। ফলে টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে ঘাঘট নদীটি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। একদিকে পাড় উপচে ফসলের মাঠে ও লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে পানি, অন্যদিকে ভাঙছে নদ। গত পাঁচ দিন থেকে উপজেলার আটষট্টিপাড়া গ্রামসহ আশপাশের ঘাঘটসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে প্রায় অর্ধশত বাড়ি।

স্থানীয় লোকজন বলছে, ঘাঘটের এমন ভয়াল রূপ তারা আগে দেখেনি। জানা যায়, গত কয়েক দিনে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এ অঞ্চলে। বৃষ্টির পানি ঘাঘট নদী দিয়ে নেমে যেতে না পেরে তা উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু উজান থেকে যেভাবে পানির ঢল আসছে, সেভাবে নেমে যেতে পারছে না। গ্রামগুলোর মধ্যে অপরিকল্পিতভাবে ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

গাইবান্ধা: টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার গাইবান্ধা জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। করতোয়ার পানি বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিপৎসীমার ১১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অপরদিকে ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। ফলে গোবিন্দগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, সুন্দরগঞ্জ এবং সদর উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

গোবিন্দগঞ্জে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ১৩টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৫টি ওয়ার্ডে ঢুকে পড়েছে বানের পানি। এ ছাড়া সাদুল্লাপুরের ছয়টি, সুন্দরগঞ্জের দু’টি, সদরের পাঁচটি এবং পলাশবাড়ী উপজেলার একটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। ডুবে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর ভায়া ঘোড়াঘাট আঞ্চলিক মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্লাবিত হয়েছে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলা পরিষদ চত্বরেও পানি উঠেছে।

ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বেশিরভাগ চর এখন পানির নিচে। অনেকে ঘর বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছে। কেউ কেউ বাঁধসহ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বানভাসীদের অভিযোগ, এবার পাঁচবারের বন্যায় সব হারালেও সরকারি সহায়তা জোটেনি। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও খোঁজ নিচ্ছেন না। অনেকের ঘরে চুলা জ্বলছে না। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে তারা। এবারের বন্যায় জেলায় এক হাজার হেক্টর জমির আমনসহ রবিশস্য পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিতে পঁচে গেছে অর্ধ শতাধিক ক্ষেতের সবজি।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ গাইবান্ধার উপ-পরিচালক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বন্যায় জেলায় ১৩ হাজার ১৫ হেক্টর জমির আমন, মাসকলাই এবং শাক-সবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য ১০৮ মেট্রিক টন চাল, শিশুখাদ্যসহ নগদ আড়াই লাখ টাকা এবং ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়েছে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন বলেন, বন্যার্তদের জন্য ৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৫ টন চালসহ নগদ টাকা। বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কাজ করছেন।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, তিন নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে চলে গেছে। তিস্তার পানি ছুঁইছুঁই করছে। তবে দুই একদিনের মধ্যে পানি কমতে শুরু করবে।

মিঠাপুকুর: ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুরের মিঠাপুকুরে ঘাঘট ও যমুনেশ্বরী নদী তীরবর্তী গ্রামে বন্যা দেখা দিয়েছে। এসব গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি। পানির তোড়ে কালভার্ট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে শতাধিক বসতঘর। ভারি বর্ষণে ভেঙে পড়েছে ২ শতাধিক মাটির ঘর। এ ছাড়া ৩ হাজার ৭০০ হেক্টর আমনক্ষেত এবং ৪০০ হেক্টর সবজি পানিতে ডুবে রয়েছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিন উপজেলার পূর্ব এলাকায় ঘাঘট নদ তীরবর্তী মির্জাপুর, বালারহাট, ভাংনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে পানিবন্দি মানুষের দুর্দশার চিত্র। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পক্ষে এসব এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ অব্যাহত আছে।

গোপীপুর এলাকার কুতুবুজ্জামান চৌধুরী হিরণ বলেন, এবারের মতো বন্যা আর দেখা যায়নি। উঁচু এলাকাতেও পানি উঠেছে। বসতবাড়িতে বুক সমান পানি। অনেকেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। ইউএনও মামুন ভুঁইয়া বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

সিরাজগঞ্জ: উজানের পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যমুনা নদীর পানি। সিরাজগঞ্জে ষষ্ঠ দফায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম রফিকুল ইসলাম জানান, শুক্রবার (২ অক্টোবর) বেলা ৩টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ এলাকায় বিপৎসীমার ৯ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর উপজেলা পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। বারবার পানি বাড়ায় জেলার কাজিপুর, সদর, শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী, উল্লাপাড়া ও তাড়াশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

নওগাঁ: চতুর্থ দফায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনিত হয়ে রানীনগর, আত্রাই ও মান্দা উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। রানীনগর, আত্রাই ও মান্দা উপজেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৭টি স্থানের ভাঙা অংশ মেরামত না করায় ওই অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে জেলার বন্যার পরিস্থিতির আরও অবনিত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে। ফসলের মাঠ তলিয়ে যাচ্ছে। জেলায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। শতশত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ উজ্জামান খান জানিয়েছেন, আত্রাই ও যমুনা নদীর পানি একটি পয়েন্টে কমলেও অন্য সব পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, আত্রাই নদীর পানি ধামইরহাট উপজেলার শিমুলতলী পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার, মহাদেবপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার, মান্দা জোতবাজার পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮৮ সেন্টিমিটার এবং আত্রাই রেলওয়ে স্টেশন পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে নওগাঁ ছোট যমুনা নদীর পানি ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছোট যুমনা নদীর বাঁধ বদলগাছি ও সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসক হারুন-অর-রশীদ বলেছেন, ইতিমধ্যেই বন্যা দুর্গত পরিবারগুলোর মাঝে সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে বন্যা কবলিতরা জানান, ত্রাণ সামগ্রী প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

পাবনা: ঈশ্বরদীর পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গতকাল করতোয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ দশমিক ৪৩ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। এছাড়া পদ্মার পানি বেড়ে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন চার গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।