• আজ ১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্রশ্ন ফাঁস করে কোটিপতি স্বাস্থ্যের মেশিনম্যান সালাম

২:০৯ অপরাহ্ন | বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২০ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর মেশিনম্যান আব্দুস সালাম। প্রশ্নফাঁসের এ প্রক্রিয়ায় একজন মাস্টারমাইন্ডসহ পাঁচ থেকে ছয়জন অসাধু চিকিৎসক ও তিন থেকে চারটি কোচিং সেন্টারের জড়িত থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সালাম কৌশলে স্বাস্থ্যের প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র বের করতেন এবং চক্রের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড জসিম উদ্দিন মুন্নুর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। জসিম ও সালাম সম্পর্কে খালাতো ভাই। জসিম ফাঁস হওয়া এসব প্রশ্নপত্র তার বিভিন্ন সহযোগীর কাছে সরবরাহ করতেন এবং হাতিয়ে নিতেন মোটা অংকের টাকা।

মঙ্গলবার (৬ সেপ্টেম্বর) সিআইডির সাইবার পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) এস এম আশরাফুল আলম এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা সালামকে কযেকবার গ্রেফতারের চেষ্টা করলেও তাকে ধরা যায়নি। তিনি খুবই ধুরন্দর। সিআইডি পাঁচদিন নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ও অভিযান চালিয়ে গত সোমবার দিনগত রাতে রাজধানীর বনশ্রীর জি ব্লকের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

জানা যায়, আব্দুস সালামের কিছুদিন আগেও পরিবারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ছিল না। ছোট চাকরির বেতন দিয়েই অনেক কষ্টে পরিবার চলতো। কিন্তু প্রেস থেকে সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁস করে রাতারাতি ভাগ্য বদল করে ফেলেছেন। এখন তার বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা, জমি-জমার অভাব নেই। এলাকায় কেউ জমি বিক্রি করলে প্রথমে তার ডাক পড়ে। কারণ নগদ টাকা জমানো নয় জমি কেনাই তার নেশা। ঢাকা ও নিজ এলাকা মানিকগঞ্জ এবং সিংগাইর উপজেলায় তার কি পরিমাণ জমি আছে তার হদিস নাই।

শুধু সালাম নিজে নয় মেডিকেল কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত তার পুরো পরিবারসহ সকল আত্মীয়-স্বজন। প্রত্যেকেই কোটি কোটি টাকার মালিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সালামের অন্তত ডজনখানেক আত্মীয় স্বজনের নামে বেনামে শত শত ব্যাংক একাউন্টের সন্ধান পেয়েছে। এসব একাউন্টে কোটি কোটি টাকা রয়েছে। এছাড়া তাদের নামে কোটি কোটি টাকার অন্যান্য সম্পদের তথ্য পেয়েছে।

সিআইডি দাবি করছে, সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূলহোতা বা মাস্টারমাইন্ড এই সালাম। প্রেস থেকে সালামই প্রথমে কৌশলে প্রশ্ন সরিয়ে নিত। এরপর সেই প্রশ্ন তারই খালাত ভাই ইন্স্যুরেন্সকর্মী জসিম উদ্দিন ভূইয়া মুন্নুকে দিত। পরে জসিমই সারাদেশে সেই প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দিত। বিনিময়ে প্রতিটি প্রশ্নের জন্য চার থেকে ৫ লাখ টাকা নিত। সারা দেশে এসব প্রশ্ন বিক্রির জন্য জসিমের আলাদা নেটওয়ার্ক ছিল।

এই নেটওয়ার্ক আরও বেশি টাকা নিয়ে প্রশ্ন পৌঁছে দিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে। এছাড়াও এই প্রশ্নপত্রকে ঘিরে চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষার্থীসহ আরও অনেককে নিয়ে একটি বড় ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিলো। তারা প্রত্যেকেই টাকার বিনিময়ে এসব প্রশ্ন বিক্রি করে দিত।

সিআইডি জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “ঘ” ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মামলা করেছিল। সেই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সন্ধান পায় সিআইডি। এরপর ঢাবি’র মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় এসএম সানোয়ার হোসেন নামের একজনকে। পরে তার কাছ থেকে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। সানোয়ারের দেয়া তথ্যমতে ১৯ জুলাই ঢাকার মিরপুরে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মাস্টারমাইন্ড জসিম উদ্দিন ভূঁইয়াসহ জাকির হোসেন দিপু ও পারভেজ খানকে। গ্রেপ্তারের সময় জসিমের কাছ থেকে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার চেক, ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকার সঞ্জয়পত্র এবং পারভেজের নিকট হতে ৮৪ লাখ টাকার চেক উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় সিআইডি মামলা করেছিলো। এই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রের আরো সাতজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই বের হয়েছে মুলহোতা মেশিনম্যান আব্দুস সালামের তথ্য। এর পর থেকেই সিআইডি সালামকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু চতুর সালাম তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে গা-ঢাকা দেয়। সিআইডি অনেকবার তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়। একদিন রাতে সিআইডি’র উপস্থিতি টের পেয়ে সালাম জানালার গ্রিল ভেঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলো। অবশেষে সোমবার রাতে ছদ্মবেশে সিআইডি’র একটি অভিযানিক টিম সালামকে বনশ্রী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে।

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সিন্ডিকেট দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তবে সালামের মাধ্যমেই প্রশ্ন ফাঁস হতো। পরে এটি বিভিন্ন মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে যেত। সালামের পুরো পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের বাইরে এখন পর্যন্ত ছয়জন চিকিৎসক ও চারটি কোচিং সেন্টারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। সিআইডি তাৎক্ষণিক সেই চিকিৎসক ও কোচিং সেন্টারের নাম জানাতে পারেনি।

সিআইডি’র সাইবার ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার এসএম আশরাফুল আলম বলেন, প্রেস থেকেই কৌশলে সালাম একটি প্রশ্নপত্র সরাতো। ধারণা করছি ২০০৬ সালের আগে থেকেই সে এই কাজ করতো। তবে ২০০৬ সালের পরে কিছু অভিযোগের কারণে তাকে এককাজ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ২০১৫ সালে একটি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়াতে তাকে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। আমরা এখন পর্যন্ত সালাম, তার খালাত ভাই জসিমসহ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অনেকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য পেয়েছি। এসব হিসাবে কোটি কোটি টাকা রয়েছে। এসব টাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সময়ই তার হিসাবে ঢুকেছে। সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, এই চক্রের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আমরা অনেকের সংশ্লিষ্ট থাকার তথ্য পাচ্ছি। নিশ্চিত না হয়ে এখনই আমরা কাউকে দায়ী করবো না। তদন্তের মধ্যে দিয়ে যাদের সম্পৃক্ততা পাবো তাদেরকেই ডাকা হবে। আমরা তদন্ত করে বের করবো চক্রে কার কি ভূমিকা ছিল। তবে যারাই এই কাজের সঙ্গে জড়িত তারা অনেক স্মার্ট ও চতুর। সালামকে আমরা

অনেক প্রশ্ন করেছি কিন্তু কৌশলে সে এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে। রিমান্ডে এনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা হবে।

সিআইডি জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে মেশিনম্যান সালাম তার খালাতো ভাই জসিমসহ আরও অনেকে। জসিম ছাড়া তার বোন, জামাতা, শশুর, ভায়রাসহ আরো অনেকে জড়িত। তার প্রত্যেকেই কোটিপতি। নামে-বেনামে তাদের অনেক সম্পদের তথ্য পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। সিআইডি জানিয়েছে, সালামের ব্যাংক হিসাবে যে পরিমাণ টাকা পাওয়া গেছে সেটি খুবই সামান্য। তার নেশা ছিল শুধু জমি কেনা। তার কি পরিমাণ জমি আছে সেটি জানার চেষ্টা চলছে। তবে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনের একাউন্টে যে পরিমাণ টাকা আছে সেটি দিয়ে ধারণা করা হচ্ছে সালাম অন্তত শত কোটি টাকার মালিক। এমনি সালাম যে মামলার আসামি ওই মামলাটিও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ থেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূলহোতা হওয়াতে সালাম ও জসিমই বেশি টাকা কামিয়েছে। জসিমের ৩৮টি ব্যাংক হিসাব আছে। এসব অ্যাকাউন্টে ২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা রয়েছে। জসিমের স্ত্রী শারমিন আরা জেসমিনের ১৪টি অ্যাকাউন্টে রয়েছে ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এছাড়া সিংগাইরে হেমায়েতপুর রোডে জসিমের একটি জমি আছে। যার মূল্য ৬ থেকে ৬ কোটি টাকার বেশি।