শাহবাগের নারী আন্দোলনে চাঁদাবাজির মামলায় জামিনে থাকা সেই পপি

৬:১২ অপরাহ্ন | সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২০ ফিচার

নিজস্ব প্রতিবেদক, সময়ের কণ্ঠস্বর- গত কয়েকদিন ধরে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং বিচার দাবিতে সারাদেশ যখন সোচ্চার, তখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)সহ তিন কর্মকর্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির চাকরিচ্যুত অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিরা সুলতানা পপির বিরুদ্ধে।

জানা যায়, সম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন মনিরা সুলতানা পপি। সেখানে প্রকাশ্যে হাউমাউ করে কেঁদে সিটি ব্যাংকের বর্তমান এমডি মাসরুর আরেফিনের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ প্রশাসনের সব স্তরে অভিযোগ করেও বিচার পাননি। এসময় ওই নারী দেশের বিচার বিভাগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেন। যার বক্তব্যের একটি ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনিরা সুলতানা পপির এই অভিযোগ নতুন নয়। সিটি ব্যাংকের সাবেক এমডির পিএস ওই নারী ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট গুলশান থানায় মাসরুর আরেফিনসহ তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ২১ অক্টোবর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮’র বিচারক মামলাটি খারিজ করে দেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, সিটি ব্যাংকের তিন ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলায় উল্লেখ করা কোনো অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ হয়নি। ট্রাইব্যুনালের সামনে ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারা মোতাবেক জবানবন্দিতে আনা অভিযোগের সমর্থনে ওই সাবেক কর্মকর্তা কোনো প্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য উপস্থাপনে ব্যর্থ হন।

তবে বর্তমানে দেশব্যাপী ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে এমডি মাসরুর আরেফিনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে ফের সরব হয়েছেন এই নারী।

সিটি ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, চাকরিরত অবস্থায় নিয়মবহির্ভূতভাবে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে তাকে গতবছর চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপরই মনিরা সুলতানা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, হেড অব সিএসআরএম আবদুল ওয়াদুদ ও বোর্ড সেক্রেটারি কাফি খানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে হয়রানির চেষ্টা করেন। তবে সেসময় তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেও এখন কৌশল পাল্টিয়ে শুধু মাসরুর আরেফিনকে হেয় করার চেষ্টা করছেন।

তাদের অভিযোগ, ব্যাংকের আগের পাওনা প্রায় ১ কোটি টাকা মওকুফ এবং মামলা খরচ বাবদ আরও ২ কোটি টাকার দাবিতে নতুন নাটক করছেন ওই নারী। এছাড়া এমডি মাসরুর আরেফিনকে নিয়ে তিনি (মনিরা সুলতানা পপি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে প্রতিনিয়ত কুৎসা রটাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, 'গত বছর আমাদের ব্যাংকের তিনজনের বিরুদ্ধে করা তার (মনিরা সুলতানা পপি) যৌন নিপীড়ন মামলা আদালত মিথ্যা মামলা হিসেবে খারিজ করে দেন। কিন্তু আমাদের করা মানহানি, ৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজি (যার ৪৫ মিনিটের অডিও রেকর্ড আমাদের কাছে আছে) এবং সাইবার ক্রাইমে মামলা দায়ের করি। তার একটাতে তিনি দু-তিন মাস জেল খেটে বতমানে জামিনে আছেন। এই জামিনে থাকা অবস্থায় তিনি আমি ও আমার ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের আইন-আদালত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ প্রশাসন, সবাইকে নিয়ে জনসমক্ষে মিথ্যা বিষেদগার করছেন। মূলত শাহবাগের আন্দোলনের হিরোইন হতেই তার এই অপচেষ্টা।'

তিনি আরও বলেন, 'প্রমাণিত টাউট, মিথ্যাবাদী, চাঁদাবাজ ও প্রতারক এক নারী আমার ও প্রতিষ্ঠানের চরিত্রহননে নেমে গেলে আমাদের পক্ষে আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া অন্য আর কোনো পথ খোলা থাকে না। যার কারণে এর বিহিত চেয়ে আমরা এখন আদালতে যাচ্ছি।'

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে ওই নারী অপপ্রচার করছেন জানিয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, 'এই ব্যাংকের ২০ শতাংশ কর্মকর্তা নারী। তাদের যে কারও কাছে জিজ্ঞেস করুন সিটি ব্যাংকে মেয়েদের কাজের পরিবেশ কেমন।'

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মনিরা সুলতানা পপির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে দুইবার কল দিলেও তার ফোন ব্যস্ত পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী পপির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী নানা অভিযোগ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পে-রোল ব্যাংকিং বিভাগে তাকে বদলি করা হয়। বদলির পর থেকে পপি দীর্ঘদিন কর্মস্থলে কোনও ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই অনুপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকের নিয়ম ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে তিনবার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠায় কর্তৃপক্ষ। তারপরও তিনি কর্মস্থলে যোগদান না করায় এবং অননুমোদিত অনুপস্থিত থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি পান।

সূত্র আরও জানায়, প্রভিডেন্ট ফান্ড ঋণ, হাউজ বিল্ডিং ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও গাড়ির ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণখাতে মনিরা সুলতানা পপির কাছে তার চাকরিরত থাকাকালে যাবতীয় প্রাপ্ত টাকা সমন্বয় করার পরও ব্যাংকের প্রায় ১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য তাকে নোটিশও দিয়েছে। নোটিশের কোনও উত্তর পপি দেননি।

পাশাপাশি ব্যাংকে চাকরির আড়ালে লেগেসি মেকওভার (বিউটি পার্লার), লেগেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রি স্কুল অ্যান্ড ডে-কেয়ার (স্কুল), লেগেসি গ্লোবাল কনসালটেন্সি (এজেন্ট ব্যাংকিং), এনএমসি এন্টারপ্রাইজ (এজেন্ট ব্যাংকিং) নামে চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন তিনি। যা সিটি ব্যাংকের সঙ্গে তার চাকরির শর্তের পরিপন্থি।

এইসব অনিয়মের কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হলে পপি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সিটি ব্যাংকের প্রধান তিন প্রধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। এতে প্রত্যাখাত হওয়ার পর চাকরিচ্যুত পপি তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যদিও অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত খারিজ করে দেন। পরে চাকরিচ্যুত ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিরা সুলতানা পপি বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবিতে মামলা করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। যেই মামলায় তিনমাস জেলও খেয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে সিটি ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর সেই মনিরা সুলতানা পপি’র বিরুদ্ধে সংসদ লোগো অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে। জানা গেছে, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ভিজিটিং কার্ডে সংসদের লোগো ব্যবহার করেছেন তিনি। এছাড়া সংসদ ভবনে প্রবেশের পাস ফেরত দেননি তিনি। এ কারণে মনিরা সুলতানার পপি’র বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়।

সময়ের কণ্ঠস্বর/আরআই