ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে 'কোটিপতি' জানে আলম! সম্পদের হিসাব চেয়েছে দুদক

৩:৪৯ অপরাহ্ন | বুধবার, নভেম্বর ১১, ২০২০ চট্টগ্রাম, দেশের খবর
মো.জানে আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্রগ্রাম- নেই নিজস্ব কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। করেননি কোন চাকরিও। তবুও তিনি এখন কোটিপতি। থাকেন নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকার কোটি টাকা মুল্যের ফ্ল্যাটে। চার ব্যাংকে লেনদেন হয়েছে ৭ বছরে ৭ কোটি ২৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। নগদে রয়েছে ৪ কোটি টাকা। এত সব কিছুরই মালিক ইউপি চেয়ারম্যান।

তিনি ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো.জানে আলম। যিনি মাত্র দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরই গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। যার সবকিছুই অবৈধ অর্জন বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ মিলেছে দুদকের অনুসন্ধানে।

এদিকে, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় আলােচ্য ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণীর দাখিলের নির্দেশ জারি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকারের কর্মসূজন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযােগের দালিলিক প্রমাণও পাওয়া গেছে দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে।

অন্যদিকে, অর্থ আত্মসাতের সহযােগিতা করায় এবং দায়িত্ব অবহেলার অভিযােগ প্রমাণিত হওয়ায় ফটিকছড়ি উপজেলার সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (বর্তমানে সহকারী প্রকৌশলী, সেতুকালভার্ট প্রকল্প বিভাগ- মহাখালী) মাে. তরিকুল ইসলাম এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসের সাবেক উপ সহকারী প্রকৌশলী (বর্তমানে- খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) মাে, কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সুপারিশ করেছে দুদক।

দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানেও প্রমাণ মেনে ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরের শ্রমিকের তালিকাতে নাম থাকা ৪১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর উপ-সহকারী পরিচালক মাে. শরিফ উদ্দিন।

অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, ৪১ জনের কেউই শ্রমিক নয়। তাদের প্রত্যেকেই স্বাবলম্বী। যাদের কেউই এসব টাকা উত্তোলন করেননি কিংবা টাকা সংগ্রহ করতে ব্যাংক একাউন্টও খােলেননি তারা। বরং শ্রমিকের তালিকায় অন্তর্ভূক্তরা অধিকাংশই ভূয়া। শুধু তাই নয়, এসব মজুরি শ্রমিকদের হিসাবে জমা করার কথা থাকলেও প্রদান না করে ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্টে জমা করেন চেয়ারম্যান। এরমধ্যে শুধুমাত্র ফটিকছড়ির হেঁয়াকো শাখার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রকল্পের একাউন্ট থেকে ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৬ টাকা স্থানান্তর করে নিজ একাউন্টে রাখা হয়।

যারমধ্যে ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ৫ লাখ ২১ হাজার টাকা শ্রমিকদের হিসাব থেকে উত্তোলন করে দুইদিন পর ব্যক্তিগত একাউন্টে রাখেন তিনি।

যত সম্পদ বেকার চেয়ারম্যানের: ২০১১ সালের ১১ জুন প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জানে আলম। পরবর্তী মেয়াদেও তথা ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিলেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে বর্তমানেও দাঁতমারায় জনসেবা করছেন তিনি।

দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগেও জানে আলম ব্যবসা-বাণিজ্য কিছু করতেন না। তবে চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন কোটিপতি। অভিযােগ- চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তারাকো বন বিটের আওতাধীন বনের জমি দখলে নিয়ে মানুষ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ অর্জন করেছেন। গড়েছেন বিপুল সম্পদও। এর মধ্যে নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় এএনজেড প্রােপার্টিজ লিমিটেড থেকে প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যে একটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে।

পাওয়া গেছে চারটি ব্যাংক একাউন্টে থাকা প্রায় ১১ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন। দুদকের ধারণা, সবগুলাে অর্থই অবৈধভাবে অর্জন করেছেন তিনি। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, সােনালী ব্যাংক ফটিকড়ি শাখাতেই ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। ফটিকছড়ির হেঁয়াকো শাখার প্রাইম ব্যাংকের একটি একাউন্টে মাত্র তিন বছরের অর্থাৎ ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে লেনদেন হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

এছাড়া, নগরীর লালদীঘির পূবালী ব্যাংকের একটি একাউন্টে চেয়ারম্যানের নামে আছে প্রায় চার কোটি টাকা এবং ফটিকছড়ির হেয়াকো শাখার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে নিজ একাউন্টে লেনদেন হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫ টাকা। এরমধ্যে ২০১১-২০১২ থেকে ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরের প্রকল্পের ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৬ টাকা হস্তান্তর হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে।

তবে দুদক বলছে, এ চারটি একাউন্টের পাশাপাশি আরও লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা। যদিও ইতােমধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ জারি করেছে দুদক কমিশন।