সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইউসুফ মোল্লার সংগ্রহে সোনাকাঠি দুধসাগরসহ ৩১২ প্রজাতির লুপ্ত ধান !

৯:৪৩ পূর্বাহ্ন | শুক্রবার, নভেম্বর ১৩, ২০২০ আলোচিত

অসীম কুমার সরকার, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি: সারি সারি কাঁচের বোয়াম। তাতে লেখা হরেক রকমের ধানের নাম। সোনাকাঠি, দুধসাগর, দুধকমল, দলকচু, মধুমালা, কাজললতা, কলকলতা, নীলকন্ঠ, বাদশাভো, মধুমালা, মলামুছা, রতিশাইল, ময়নামতি, রূপকথা, সিঁন্দুরকুঠি, ময়না, হলুদভোগ, বাদশাভোগ, রাধুনীপাগল, চিনি কানাই কতই না সব নাম না জানা ধানের নাম।

নামগুলো পড়ে যে কেউ বিস্মৃত হবেন! দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এই লুপ্ত ধান সংরক্ষক ইউসুফ আলী মোল্লা। তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামে তাঁর বাড়ি। আর বাড়ির পাশেই তিনি স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন পুরাতন দিনের ধান সংগ্রহশালা। নাম দিয়েছেন ‘বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক’। তাঁর বীজ ব্যাংক থেকে কৃষকরা বিনামূল্যে ধানবীজ নিয়ে চাষ করেন। আর ধান উঠার পর তা আবার ফেরত দেন তার বীজ ব্যাংকে। এইভাবেই ইউসুফ মোল্লা শুধু নিজ এলাকায় নয়, উপজেলা থেকে শুরু কওে অন্য উপজেলা, জেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলার কৃষকদের গন্ডি পেরিয়ে এখন তাঁর বীজ ব্যাংকের পুরনো ধানগুলো বিনিময় করছেন বিভিন্ন উপকূল এলাকায়।

৭০ বছর বয়সী উদম্য ইউসুফ মোল্লা তাঁর পুরনো ধান চাষে কৃষককে উবুদ্ধ করতে ছুটে চলেন প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অঞ্চলে। কৃষকদের নিয়ে উঠান বৈঠক, আলোচনাসভা, নবান্ন অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি এই পুরাতন দিনের ধানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং তা কৃষকদের মধ্যে ধানবীজ বিতরণ করেন। আর তাঁকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে যাচ্ছেন বেসরকারি গবেষণা উন্নয়ন সংস্থা বারসিক। তাঁর বীজব্যংকে লুপ্তধান সংরক্ষণের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন তৈজসপত্রের সংরক্ষণ। রয়েছে পুরনোদিনের কলেরগান,কিচ্ছা-কাহিনীর পুঁতিসহ চাষাবাদের বিভিন্ন বইপত্র।

এ নিয়ে স্থানীয় কৃষক মো: আব্দুল হাবিব ও মো: লিয়াকত আলী জানান, কৃষি সম্পর্কে বিভিন্ন বই তারা ইউসুফ মোল্লার কাছ থেকে নিয়ে গিয়ে পড়েন। পড়া শেষে হলে ফেরত দিয়ে আবার অন্য বই নিয়ে যান। তাঁর বই পড়েও স্থানীয় কৃষকরা বিভিন্ন চাষাবাদ সম্পর্কে ধারণা পান বলে জানান তারা।

ইউসুফ মোল্লা ২০১৩ সালে পরিবেশের উপর জাতীয় পদক পান। বয়োবৃদ্ধ এই মানুষটি আজও কাজকর্মে চিরনবীন। ধানবীজ সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, ঔষুধি গাছ লাগিয়েছেন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের কৃষক মুকিত দুলাল বলেন, ‘আমি গোদাগাড়ী থেকে এসেছি ইউসুফ মোল্লার কাছ থেকে পুরাতন দিনের ঝিঙ্গাশাইল ধানবীজ নিতে। তাঁর কাছ থেকে ধান নিলে আবার ফেরত দিতে হয়। কারণ তিনি ওই ধানবীজ আরেক কৃষককে দেন। আমি তাঁর ধান সংরক্ষণশালাটি দেখে মুগ্ধ।’

TANORE

কৃষিবিদ এবিএম তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু লুপ্ত ধান সংরক্ষক হিসেবে নয়, বিভিন্ন তৈজসপত্রের সংরক্ষণ ও বিভিন্ন ঔষুধী, ফলজ গাছ এবং শাকসবজি চাষে ইউসুফ মোল্লা বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় বেশ ভূমিকা রাখছে। আমি মনে করি তাঁর এই সংরক্ষণশালাটি রবেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের যেমন কাজে সহায়তা করবে পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকদের তা উদ্বুদ্ধকরণে সহায়ক হবে।’

বিভিন্ন দেশি- বিদেশী সংস্থা থেকে কৃষিক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ৫০টির বেশি কৃষি সনদপত্র পেয়েছেন তিনি। এছাড়াও প্রায় ২০টি দেশের ধাতব মুদ্রা তাঁর সংগ্রহে রয়েছে।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামিমুল ইসলাম ইউসুফ মোল্লা সম্পর্কে বলেন, ‘বরেন্দ্রবীজ ব্যাংক নি:সন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। আমি মনে করি শুধু তানোর উপজেলা নয় সমস্ত বাংলাদেশে এই বীজ ব্যাংকের ম্যাধমে কৃষক পুরাতন দিনের লুপ্ত প্রায় ধানগুলো চাষাবাদ করতে পারবেন। পাশাপাশি কৃষক পুরাতন দিনের ধানগুলোর স্বাদ পাবেন।’

বরেন্দ্র বীজ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ মোল্লা বলেন, প্রতি বছর শতাধিক কৃষকদেরকে নিয়ে নবান্ন অনুষ্ঠান করি। নতুনধানের পিঠাপুলি, পায়েশ আর ২৫/৩০ রকমের ধানের চাল দিয়ে ভাত খাওয়া দাওয়া হয়। কবিতা আর গানের অনুষ্ঠানে সবাই মিলেমিশে আনন্দ করি। এই নবান্নে কৃষকদের মাঝে ধানবীজ বিতরণ করি, তাদের মুখে পুরাতন ধানের চাষাবাদের গল্প শুনি। এখন আমার স্বপ্ন বীজব্যাংক নিয়ে। যার মধ্য দিয়ে শুধু বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক নয় পুরো বাংলাদেশের কৃষক এই লুপ্ত ধানগুলো পরিবেশবান্ধব চাষ করে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করবে এমনটাই তিনি প্রত্যাশা করেন।