হবিগঞ্জে লোকসানের মুখে শিম চাষিরা

১০:১২ অপরাহ্ন | রবিবার, নভেম্বর ২২, ২০২০ সিলেট
hobiganag

মঈনুল হাসান রতন, হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ কয়েক বছর ধরে দাম না পাওয়ায় ধান চাষে লোকসান গুণতে হয়েছে হবিগঞ্জের চাষিদের। যে কারণে অনেকেই ধান চাষ বাদ দিয়ে শিম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেন। এতে বেশ সফলতাও পেয়েছেন।

কিন্তু এ বছর আগাম বৃষ্টির কারণে শিমের ফুল ঝরে গেছে। এতে লোকসানের শঙ্কা করছেন চাষিরা। চাষিদের অভিযোগ, এমন দূর্নিনেও তাদের পাশে ছিলেন না কৃষি কর্মকর্তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর হবিগঞ্জে মোট ২ হাজার ৯শ’ ১৯ হেক্টর জমিতে শিমের আবাদ হয়। শিম চাষ হয় ৩১ হাজার ৪শ’ ১ মেট্রিক টন। গত বছর ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় এ বছর চাষিরা আবাদ আরও বাড়িয়েছেন। জেলায় চলতি বছর ৩ হাজার হেক্টর জমিতে শিমের আবাদ হয়েছে। ফলনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজারের অধিক মেট্রিক টন।

এ অঞ্চলে সবচেয়ে ভালো চাষ হয়, আশ্বিনা, কইটা, আদা সুন্দরি, ঘুতুম, বোয়াল, গাদা জাতের শিম। এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি এসকল শিমের জন্য উপযোগী হওয়ায় চাষিরা উৎপাদন করেন। এছাড়া দেশে এসব শিমের চাহিদাও বেশি।

জেলার বাহুবল, নবীগঞ্জ ও মাধবপুরে সবচেয়ে বেশি শিমের আবাদ হয়। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় শীতকালীন এ সবজিটি চাষ করে ইতোমধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন কয়েকশ’ চাষি। আগে যে জমিতে ধান চাষ হতো সেই জমিতে এখন শিমের আবাদ হচ্ছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে এই শিমের চাষ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা সরাসরি ক্ষেত থেকে শিম কিনে নেন। এতে চাষিদের খরচ অনেক কমে, বাড়ে লাভের পরিমাণ। এ বছর শিম চাষে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। ভালো ফলন না হওয়ায় লাভতো দূরের কথা, মোটা অংকের লোকসান গুণতে হবে; এমনটাই আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

তাদের দাবি, এ বছর আগাম বৃষ্টির কারণে একদিকে শিমের ফুল ঝরে গেছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে গাছ। এ অবস্থায় অন্য বছরের তুলনায় অর্ধেক ফলনও আসবে না। ভালো ফলন না পাওয়ার শঙ্কায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা।

বাহুবলের দ্বীগম্বর এলাকার শিম চাষি আব্দুল মতিন বলেন, ‘আগাম বৃষ্টিতে ফুল ঝড়ে যাওয়ার কারণে গাছের অতিরিক্ত পরিচর্যা করতে হয়েছে। এতে অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ব্যায় বেড়েছে অনেক। ফুল ঝরে যাওয়ার সাথে গাছ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় অতিরিক্ত পরিচর্যার পরও কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায়নি।’

একই এলাকার চাষি সুমন আলী খাঁন বলেন, ‘একসময় এই জমিগুলোতে ধান চাষ করতাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধানের দাম পাওয়া যায়নি। তাই শিম চাষ শুরু করি। গতবছর শিম চাষ করে ভালো লাভ হয়েছে। কিন্তু এ বছর বৃষ্টির কারণে ফুল ঝরে গেছে এবং গাছগুলো প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।'

তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের যে অবস্থা লাভতো দূরের কথা, পূঁজিই হারাতে হবে।’

নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুর এলাকার চাষি সাদ্দাম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্ষতির মুখে পড়েও কৃষি অফিসের কোন সহযোগিতা পাচ্ছি না। নিজেদের সাদ্যমতো শিম গাছের পরিচর্যা করলেও জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তারা আমাদেরকে খোঁজও নেননি।'

শুধু শিম চাষিদেরই মাথায় হাত নয়, একই সাথে কপাল পুড়েছে অন্তত ৫শ’ নারী শ্রমিকেরও। যারা শিম ক্ষেতে দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে পরিচর্যা ও শিম উত্তোলনের কাজ করে সংসার চালাতেন। এ বছর সিমিত কয়েকজন নারী ছাড়া বাকিরা বেকার রয়েছেন।

ঢাকা থেকে শিম নিতে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী মোয়াজ্জিম হোসেন বলেন, ‘অন্য বছর এ অঞ্চলে প্রচুর শিম চাষ হতো। ফলে আমরা কম দামে শিম নিতে পারতাম। কিন্তু এ বছর অন্য বছরের চেয়ে শিম কম হওয়ায় দাম একটু বেশি।'

তবে কৃষকদের অভিযোগের সম্পূর্ণ উল্টো দাবি করলেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ তমিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিতে প্রথমে ফুল ঝরে গেলেও তেমন কোন ক্ষতি হবে না। বরং পরবর্তীতে সেচ ও সার প্রয়োগ করায় ফলন আরও ভালো হবে। এছাড়া এ বছর শিমের বাজারদর অন্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় লোকসানের শঙ্কা নেই।'

তিনি আরও বলেন, ‘যদি কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে তাদেরকে সরকারি সহযোগিতা করা হবে। এছাড়া সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা হবে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের।’