রেজাউলের দেশীয় ৬ শতাধিক বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রহশালা যেন একটি যাদুঘর

◷ ৯:১৯ পূর্বাহ্ন ৷ মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১, ২০২০ ফিচার
Mymensing news

ষ্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহঃ যৌবনকালে পুরাতন বেহালা, সেতার ও তানপুড়ার প্রেমে মজেছিলেন রেজাউল করিম আসলাম। ১৯৪৪ সালে দাদা মরহুম নবাব আলী ময়মনসিংহের জি কে এম সি সাহা রোডের বড় বাজারে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নবাব এন্ড কোং’ নামে একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান। বংশপরম্পরায় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসাটি দাদার মৃত্যুর পর বাবা জালাল উদ্দিন পরিচালনা করে আসছিলেন। স্কুল জীবন শেষ করে বাবাকে সহযোগিতা করতে দোকানে আসেন আসলাম।

ঠিক তখন থেকেই দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো তার মন কাড়ে। মানুষের ব্যবহার করা পুরাতন বাদ্যযন্ত্রগুলো সংগ্রহের প্রতি আসক্তি শুরু হয়। তখন থেকে আজ অবধি বাংলাদেশে লোকসংগীতের বিকাশ ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করছেন তিনি। ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া এলাকার বাসিন্দা আসলামের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৬শ’ বিরল বাদ্যযন্ত্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় জাদুঘরের ২৮ নম্বর গ্যালারীতে আসলামের সংগ্রহে থাকা ৩২ টি দেশীয় বাদ্যযন্ত্র স্থান পেয়েছে। সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি এগুলো নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরাতন ভাঙ্গা বাদ্যযন্ত্র নতুনভাবে ঠিক করার জন্য বর্তমানে হারিয়ে যাচ্ছে কারিগর। ফলে নিজেই নতুন করে তৈরি করছেন বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। ইতিমধ্যে ‘এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম’ নামে একটি জাদুঘর গড়ে তুলেছেন তিনি। নগরীর আঞ্জুমান ঈদগাম মাঠের বিপরীত দিকে একটি গির্জার নিচতলায় এই মিউজিয়াম নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মিউজিয়ামের নির্মাণকাজ এখন বন্ধ রয়েছে। করোনার পরেই কাজ শেষ করা হবে।

FB IMG 1605171095530

বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্নয় পরিষদ বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ‘নোভিস ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সাংস্কৃতি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। নোভিন আর্টিস্টিক এডুকেশন সেন্টার নামের একটি শিক্ষালয়ও পরিচালনা করেছেন তিনি। এখানে উপমহাদেশীয় ও পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয়ে সংগীত, নৃত্য, চারুকলা, গিটার, বেহালা এবং দোতারা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

বংশপরম্পরায় তার সংগ্রহে থাকা বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে রয়েছে- একতন্ত্রী বীণা (প্রচলিত নাম একতারা; এটি বাউল, বৈরাগী ও ভিক্ষুকরা বেশী ব্যবহার করেন), সেতার, সারেঙ্গী ( পৌরাণিক কাহিনী, ধর্মীয় ও ভক্তিমূলক গানের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়), এসরাজ (উচ্চাঙ্গ একক যন্ত্র), সুর সংগ্রহ (প্রচলিত নাম স্বরাজ; লোকজ গানে ব্যবহৃত হয়), তম্বুরা (প্রচলিত নাম তানপুরা; গায়ক ও বাদকের সংগীতচর্চায় ব্যবহৃত হয়), বেহালা, গোপীযন্ত্র ( প্রচলিত নাম লাউয়া; এটিও বাউল, বৈরাগী ও ভিক্ষুকরা বেশি ব্যবহার করেন), ব্যাঞ্জো, সারিন্দা (প্রাচীন ও দেশীয় সংগীতে  ব্যবহৃত হয়), আনন্দ লহরি (প্রচলিত নাম গুবগুবি-খমক; বাউল ও ভিক্ষুকরা বেশি ব্যবহার করেন), সুরবাহার (উচ্চাঙ্গ অনুগামী যন্ত্র), ম্যান্ডেলিন (আরবি সুর ও সংগীতে ব্যবহৃত হয়), তুবড়ি (প্রচলিত নাম বীণ ; গ্রামীণ গান ও সাপুড়েদের সাপখেলায় ব্যবহৃত হয়), বাঁশি, শঙ্খ (পূজা অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়)।

এছাড়া সানাই, ক্ল্যারিওনেট, ট্রাম্পেট, হারমোনিয়াম, প্রেমজুড়ি, নাকাড়া, ঢোল, ডমরু, খঞ্জরি, মৃদঙ্গ, তবলা, ঝাঁঝর, ঘণ্টা, খঞ্জনি, করতাল, ঘড়ি, কৃষ্ণকাঠি, মেকুড়, নূপুর, সেকাস, পাখোয়াজ ও শারদ, চেম্পারেঙ, দভণ্ডি, চিকারা, যোগী সারঙ্গী, মুগরবন, অ্যাকোর্ডিয়ান, ঘেরা, পেনা, শিঙা ইত্যাদি তার সংগ্রহে রয়েছে।

এগুলো ছাড়াও জলসাঘরের তৈজসপত্রও আসলামের সংগ্রহে আছে। এগুলো হলো- ফুলের সাজি, ফুলদানি,  প্যাঁচানো ফুলদানি, পানি সাকি, সুরাপাত্র, ঘণ্টা, নর্তকী, হুঁকো, তামাপাত্র, পানিপাত্র, মোমদানি, দেয়াল নকশি, খানদানি হুঁকো, পিকদানি, ছাইদানি জুতা, ছাইদানি প্লেট ও দুধপাত্র।

রেজাউল করিম আসলামের সংগৃহীত বাদ্যযন্ত্রগুলো প্রথম প্রদর্শনী করেন ২০০৩ সালে ময়মনসিংহ লোকজ মেলায়। ২০০৪ সালে জয়নুল সংগ্রহশালায়। ২০০৬ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ঢাকার বৈশাখী উৎসবে, ২০০৮ সালে জয়নুল উৎসবে, ২০১২ সালে মোতাহার হোসেন বাচ্চুর জন্মবার্ষিকী ও ২০১২ সালে হালুয়াঘাটে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহে বাদ্যযন্ত্রগুলো প্রদর্শন করেন। এরপর ২০১৬ সালে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে (ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম), ২০১৭ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সিলেটের লোকজ উৎসবে (আবুল মাল আব্দুল মুহিত ক্রিড়া কমপ্লেক্স) ও ২০১৯ সালে হালুয়াঘাটের ক্ষুদ্র নৃত্বাতীক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরে বাদ্যযন্ত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ ও যুদ্ধাস্ত্রসহ ১৪৯টি নিদর্শন দেন তিনি।

FB IMG 1605171089542

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্র অভিনেতা শহিদুল ইসলাম (শহীদ) বলেন, সময়ের স্রোতে দেশীয় অনেক বাদ্যযন্ত্র হারিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমেই বর্তমান প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।

ছায়ানট সাংস্কৃতিক সংস্থা ময়মনসিংহের সভাপতি আপেল চৌধুরী বলেন, লোকসংগীতের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আসলামের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। বংশপরম্পরায় ধৈর্য নিয়ে এতগুলো দেশীয় বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করা সহজ ছিলোনা।

এ বিষয়ে রেজাউল করিম আসলাম বলেন, সবচেয়ে বেশী বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করেছি প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর কাছ থেকে। এছাড়া যাদের কাছে ভাঙ্গা, পুরাতন বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে তারা মেরামত করতে আমার কাছে আসে। আবার অনেকে যতসামান্য টাকায় বিক্রি করে দেয়। যৌবনকাল থেকে বাদ্যযন্ত্রের প্রেমে পড়ে পুরাতনকে নতুন রুপে তৈরি করে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, সরকারি বা বিশেষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে অন্যান্য দেশে সংরক্ষণ হলেও আমাদের দেশে এমন নেই। ঐতিহ্য ধরে রাখা ও প্রজন্মকে জানানোর জন্যই বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ ও জাদুঘর নির্মাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শেষ হলেই সংগ্রহে থাকা বাদ্যযন্ত্রগুলো স্থায়ী প্রদর্শনী করা হবে।