• আজ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

টাঙ্গাইলে ফারুক হত্যা মামলায় সাবেক মেয়র কারাগারে

◷ ১০:১১ অপরাহ্ন ৷ বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০ ঢাকা
tangail

অন্তু দাস হৃদয়, স্টাফ রিপোটারঃ টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমদ হত্যা মামলায় ছয় বছর পলাতক থাকার পর পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি বুধবার (২ ডিসেম্বর) আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন।

পরে টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সিকান্দার জুলকার নাঈম জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সাবেক মেয়র মুক্তি ওই মামলার প্রধান আসামি টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানার ছোট ভাই।

সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তির বাবা টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান ও ভাই সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানার সঙ্গে সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রবেশ করেন।

আদালতে আত্মসমর্পণ করে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন প্রার্থনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি মনিরুল ইসলাম খান এবং বাদিপক্ষের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম জামিনের বিরোধিতা করেন।

এ সময় আদালতে উপস্থিত হয়ে নিহত ফারুক আহমদের স্ত্রী ও মামলার বাদি নাহার আহমদ ন্যায়বিচারের স্বার্থে সহিদুর রহমান খান মুক্তিকে জামিন না দেওয়ার জন্য আদালতের প্রতি অনুরোধ জানান। শুনানি শেষে বিচারক সিকান্দার জুলকার নাঈম বুধবার দুপুরের পর আদেশ দেবেন বলে জানান। পরে বেলা তিনটার দিকে আদালতের বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে সহিদুর রহমান খান মুক্তিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালত সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ৫ মার্চ এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তারপর করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন নাহারের সাক্ষী গ্রহণ করা হয়। এই মামলায় এ পর্যন্ত ২৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মামলার অপর আসামি সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানার বড় ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন ও ছোট ভাই সানিয়াত খান বাপ্পা ২০১৪ সালে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু সহিদুর রহমান খান মুক্তি গা ঢাকা দিয়ে ঢাকায় অবস্থান করেন। বছরখানেক গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও পরে প্রকাশ্যে আসেন তিনি।

ঢাকায় অবস্থান করে টাঙ্গাইলে তাঁদের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। টাঙ্গাইল থেকে কর্মী-সমর্থকরা ঢাকায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। সেই ছবি ফেসবুকেও দেখা গেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিদুর রহমান খান মুক্তি টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত বাবা আতাউর রহমান খানের পক্ষে প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে অংশ নেন। সেই সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

দলীয় সূত্রগুলোর মতে, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিদুর রহমান খান মুক্তি আবার সক্রিয় হয়েছেন। তাঁর অনুসারীরা টাঙ্গাইলে তৎপরতা শুরু করেছেন। আগামী নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন চাইবেন এজন্য তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন।

গত ২৩ নভেম্বর (সোমবার) সহিদুর রহমান খান মুক্তি তাঁর বাবা টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খানের সঙ্গে টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে উপস্থিত হন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে আদালতের বিচারক সিকান্দার জুলকান নাঈম আদালতে আসবেন না জানার পর তারা আদালত ত্যাগ করেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০১৪ সালের ১১ আগস্ট টাঙ্গাইল শহরের বেবীস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ফারুক আহমদ হত্যা মামলায় আনিসুল ইসলাম রাজাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। একই অভিযোগে মোহাম্মদ আলী নামে আরও একজনকে গোয়েন্দা পুলিশ ওই বছরের ২৪ আগস্ট গ্রেপ্তার করে। তারা দু’জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

তাদের জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যাকান্ডে টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী খান পরিবারের চার ভাই তৎকালিন সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান কাকন, টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা জড়িত রয়েছে।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামি রাজা জানায়, ঘটনার দিন (২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি) তৎকালিন সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা তাকে (রাজাকে) দায়িত্ব দেন ফারুক আহমদকে আওয়ামী লীগ অফিস থেকে কলেজ পাড়ায় তার একটি প্রতিষ্ঠানে ডেকে আনার জন্য। আওয়ামী লীগ অফিসে যাওয়ার সময় পথেই রাজার সঙ্গে ফারুক আহমদের দেখা হয়।

রাজা তখন নিজের রিকশা ছেড়ে ফারুক আহমদের রিকশায় উঠেন এবং তাকে এমপি রানার প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। সে সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হওয়া নিয়ে ফারুক আহমদের সঙ্গে রানার কথা হয়। এক পর্যায়ে ফারুক আহমেদকে ওই পদে প্রার্থী না হওয়ার অনুরোধ করেন। ফারুক আহমদ এতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে ফারুক আহমেদ সেখান থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে তাকে গুলি করা হয়। এ সময় অন্যরা তার মুখ চেপে ধরেন। তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর প্রভাবশালী নেতার নির্দেশে সেখানকার রক্ত মুছে ফেলা হয়। পরে একটি অটো রিকশায় ফারুক আহমদের মরদেহ নিয়ে আসামি রাজাসহ দু’জন দু’পাশে বসেন এবং ফারুক আহমদের বাসার কাছে ফেলে রেখে আসেন।

২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রাতে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমদের গুলিবিদ্ধ লাশ তার কলেজপাড়া এলাকার বাসার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনার তিনদিন পর তার স্ত্রী নাহার আহমদ বাদি হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

পরে গোয়েন্দা পুলিশ আনিসুল ইসলাম রাজা ও মোহাম্মদ আলী নামে দুইজনকে ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার করে। ওই দুই আসামির জবানবন্দিতে এই হত্যার সাথে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের তৎকালিন সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা এবং তার অপর তিন ভাই পৌরসভার তৎকালিন মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পার জড়িত থাকার বিষয়টি বের হয় এলেই আমানুর রহমান খান রানা ও তার ভাইয়েরা আত্মগোপনে চলে যান।

দীর্ঘ ২২ মাস পলাতক থাকার পর আমানুর রহমান খান রানা আদালত আত্মসর্মপন করেন। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগার পাঠানোর আদেশ দেন। প্রায় দুই বছর হাজতে থাকার পর তিনি জামিন মুক্ত হন। বুধবার এক ভাই সহিদুর রহমান খান মুক্তি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তার অপর দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন ও সানিয়াত খান বাপ্পা এখনও পলাতক রয়েছেন।