হায়নাদের কবল থেকে চাঁদপুর মুক্ত আজ

২:৩৩ অপরাহ্ন | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২০ চট্টগ্রাম, দেশের খবর
চাঁদপুর

মাহফুজুর রহমান, চাঁদপুর প্রতিনিধি- আজ ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে চাঁদপুর জেলা মুক্ত হয়েছিল। এদিনে চাঁদপুর থানার সম্মুখে বিএলএফ বাহিনীর প্রধান মরহুম রবিউল আউয়াল কিরণ প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

করোনা ভাইরাসের কারণে এ বছর বড় ধরনের কোনো আয়োজন নেই। তবে সীমিত আকারে আজ মঙ্গলবার দিনের শুরুতেই চাঁদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা কমিটি কর্মসূচি পালন করে। সকাল ৯টায় শহরের অঙ্গীকার পাদদেশে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুস্পস্তবক অর্পন শেষে একটি র‌্যালীতে অংশ নেয় নেতৃবৃন্দ।

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল দখলদার বাহিনীর ২টি সেভারজেট বিমান থেকে চাঁদপুর শহরে বৃষ্টির ন্যায় বোমা বর্ষণ করা হয়। আর এর মাধ্যমে প্রথম আক্রমণের সূচনা করা হয় এই জেলায়। সেদিন শেলিং-বুলেটে পুরানবাজার ও বড় স্টেশন এলাকায় এক নারীসহ দু’জন নিহত হন।

পরদিন বিকেলে পাকিস্তানের প্রায় ৫ শতাধিক সেনার একটি বহর কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে। পথে মুদাফফরগঞ্জ ও হাজীগঞ্জে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের কবলে পড়ে। আক্রমণ এড়াতে সেনা সদস্যরা বাধ্য হয়ে দ্রুত চাঁদপুর শহরের অদূরে সরকারি কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে আশ্রয় নেয়। আর সেনা কর্মকর্তারা ওয়াপদা রেস্ট হাউজ এবং জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় অবস্থান নেয়।

প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠার পর পাকিস্তানি বাহিনী অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থান তৈরিতে সমর্থ হয়। শুরু হয় নিরীহ বাঙ্গালির ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার। চাঁদপুরের বড়স্টেশন, টেকনিক্যাল স্কুল, ওয়াপদা রেস্ট হাউজ, পুরানবাজার পুলিশ ফাঁড়িসহ ৮টি স্থানে নির্যাতন চালানোর জন্য তারা টর্চারসেল তৈরি করে। শহর ও আশপাশসহ ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমারে যারা আসা যাওয়া করছে, এমন কারো ওপর সন্দেহ হলে তাকে ধরে টর্চারসেলে নিয়ে নির্যাতন, ধর্ষণ শেষে হত্যা করে পদ্মা ও মেঘনা নদীতে লাশ ফেলে দিত।

ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনী একাত্তরের ৭ ডিসেম্বর জেলার চিতোষী, হাজীগঞ্জ, মুদাফরগঞ্জ, বাবুরহাট, ফরিদগঞ্জ এলাকায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর দাঁড়াতে পারেনি। গভীর রাতে ২টি জাহাজে করে তারা নৌপথে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

৮ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা ট্যাঙ্ক নিয়ে চাঁদপুর প্রবেশ করে। পাক বাহিনীর পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে ৫শ’ পাকিস্তানি সেনা বহনকারী এমভি লোরাম জাহাজকে বোমা মেরে লন্ডন ঘাট ডাকাতিয়া নদীতে ডুবিয়ে দেয়। চাঁদপুর পুরোপুরি পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়।

দীর্ঘ আট মাসের মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে চাঁদপুর পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৩ সালে বড় স্টেশনের বদ্ধভূমিতে নির্মাণ করা হয় ‘রক্তধারা’। এছাড়াও শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধগুলোর মধ্যে চাঁদপুরের প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কালাম, খালেক, সুশীল ও শংকরের নামে ট্রাক রোডে নির্মাণ করা হয় ‘মুক্তিসৌধ’।

চাঁদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র লেকের উপর দৃশ্যত ভাসমান স্মৃতিসৌধ ‘অঙ্গীকার’ নির্মাণ করা হয়। এছাড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নাম সম্বলিত স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া চাঁদপুর পৌরসভার ৫ রাস্তার মোড়ে নির্মাণ করা হয় ‘শপথ চত্বর’। চাঁদপুরে মোট তিন হাজার ৪শ’ গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন।