লালপুরে পালিত হলো গোঁসাই আশ্রমের ৩২৫তম নবান্ন উৎসব

৪:৫৭ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০২০ রাজশাহী
natore

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধিঃ নাটোরের লালপুরের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সুমহের মধ্যে গোঁসাই আশ্রম অন্যতম। প্রায় সোয়া তিন শত বছরের পুরাতন এই গোঁসাই আশ্রম। আশ্রমের অন্যতম প্রধান উৎসব হল নবান্ন উৎসব।

করোনা মহামারিও এই ঐতিহাসিক উৎসবকে ম্লান করতে পারেনি। হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে এবছর মহা ধুম ধামের সাথে পালিত হলো দুই দিন ব্যাপি ৩২৫ তম নবান্ন উৎসব।

বৃহস্পতিবার হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আশ্রমের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধায় শেষ হবে দুই দিন ব্যাপি এ অনুষ্ঠানের। এর আগে বুধবার (১৬ ডিসেম্বর) দুপুরে আশ্রম কমিটির সভাপতি শ্রী রঞ্জন কুমারের সভাপত্বিতে, লালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন ঝুলফু প্রধান অতিথী থেকে দুই দিন ব্যাপি এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।

এ সময় বক্তব্য রাখেন লালপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ইসহাক আলী, দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পারভীন আক্তার বানু, আশিস কুমার সুইট, সঞ্জয় কুমার প্রমুখ।

আশ্রমের প্রধান সেবাইত শ্রী পরমানান্দ সাধু জানান, বাংলা ১২১৭ সালে উপজেলা সদর থেকে আট কিলো মিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে দুড়দুড়িয়ার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের গহীন অরণ্যে একটি বটগাছের নিচে আস্তানা স্থাপন করেন ফকির চাঁদ বৈষ্ণব। এখানেই সাধু ধ্যান-তপস্যা ও বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার আরম্ভ করেন। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা, গঙ্গা স্নান ও নবান্ন উৎসব উপলক্ষে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্ত সাধক সমবেত হন।

সাধু ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের মৃত্যুর পর নওপাড়ার জমিদার তারকেস্বর বাবু তাঁর (সাধুর) স্মরণে সমাধিটি পাকা করে দেন। এ ছাড়াও ভক্তদের সুবিধার্থে ৬৮ বিঘা জমি ও সান বাঁধানো বিশাল দুটি পুকুর দান করেন। আশ্রম চত্বরে দালান কোঠা নির্মানেও তিনি সহযোগিতা করেন। আশ্রমের প্রবেশ পথে রয়েছে ময়‚র, বাঘ ও বিভিন্ন প্রাণির ম‚র্তি এবং লতা-পাতা কারুকার্য খচিত সুবিশাল ফটক।

প্রধান দ্বার প্রান্তে ডান পাশে রয়েছে ভক্ত সাধু ও সাধু মাতাদের আবাসন। বাম পাশে রয়েছে ৬ জন সাধুর সমাধি মন্দির। একটু সামনেই রয়েছে শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের চার কোনা প্রধান সমাধি স্তম্ভ। বর্গাকৃতির ৪০ ফুট সমাধি সৌধের রয়েছে আরেকটি ৩০ ফুট গৃহ। এর একটি দরজা ছাড়া কোন জানালা পর্যন্ত নেই। মূল মন্দিরে শুধুমাত্র প্রধান সেবাইত প্রবেশ করেন।

কাথিত আছে, মন্দিরের মধ্যে সাধু ফকির চাঁদ স্বশরীরে প্রবেশ করে ঐশ্বরিকভাবে স্বর্গ লাভ করেন। তাঁর শবদেহ দেখা যায় নি। পরিধেয় বস্ত্রাদি সংরক্ষণ করে সমাধি স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। গম্বুজ আকৃতির সমাধির উপরিভাগ গ্রিল দিয়ে ঘেরা রয়েছে। ঘরের দেয়াল ও দরজায় বিভিন্ন প্রাণি, গাছ, লতা-পাতা খচিত কারুকার্য শোভা পাচ্ছে।

সমাধির মাত্র পাঁচ গজ দূরে রয়েছে বিশাল আকৃতির এক কুয়ার একটি সিঁড়ি পথ রয়েছে পাশের রান্না ঘরের সাথে সংযুক্ত। এই সিঁড়ি পথে সাধুগণ স্নানে যেতেন এবং রান্নাসহ পানিয় জল সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে কুয়ার পানি ব্যবহার অযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। আশ্রম চত্বরে রয়েছে ১৪১ জন ভক্ত সাধুর সমাধি।

প্রধান সমাধিগুলোর কয়েকটি স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের পানসিপাড়া- রামকৃষ্ণপুর গ্রামে বাংলা (৩২৫ বছর পূর্বে) শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোসাইজীর আশ্রম স্থাপিত হয়। আশ্রমটি ৩২ বিঘা জমির উপর অবস্থিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দুই দিনব্যাপী নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

এ অনুষ্ঠান উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার ভক্ত বৃন্দের আগমন ঘটে। তিন শতাব্দির স্মৃতিবাহী ফকির চাঁদ গোসাই আশ্রম দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের কোলাহলে মুখরিত আশ্রমটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।