বগুড়ায় মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ: ৯১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

২:১৭ অপরাহ্ন | বুধবার, ফেব্রুয়ারী ১০, ২০২১ রাজশাহী
bus

সাখাওয়াত হোসেন জুম্মা, বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়ায় মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি দলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশসহ তিনটি পক্ষ বাদী হয়ে মোট ৯১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

মঙ্গলবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে বগুড়া সদর থানায় দায়ের করা পাল্টাপাল্টি মামলায় মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন এবং ওই গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলামকেও আসামি করা হয়েছে।

তবে মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামের কার্যালয় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল আলম মোহনসহ তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার সকাল ৬টা থেকে পরিবহন শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেছেন। এর ফলে বগুড়া থেকে নওগাঁ ও জয়পুরহাটসহ আশ-পাশের কয়েকটি জেলার যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে রাজধানী ঢাকাসহ দূরপাল্লার যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার সংঘর্ষ চলাকালে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত গোয়েন্দা পুলিশের (ডিএসবি) কনস্টেবল রমজান আলীর অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। চিকিৎসকের মতামত পেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়া হতে পারে।

বগুড়া সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবির জানান, সংঘর্ষে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিএসবি) কনস্টেবল রমজান আলীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় উপ-শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর নানু খান বাদী হয়ে ৬ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এছাড়া মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম মোহনের পক্ষে তার ছোট ভাই মশিউল আলম বাদী হয়ে মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই একই ঘটনায় মোটর মালিক আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে মঞ্জুরুল আলম মোহনসহ তার ৫২ অনুসারীর নামে মামলা করেন। ওসি বলেন, সংঘর্ষ চলাকালে এবং পরবর্তীতে আটক ১৪ জনকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

জানা যায়, বগুড়া মোটর মালিক ওসি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি দলের দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন। অপর পক্ষে রয়েছেন দলটির জেলা কমিটির ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক আকতারুজ্জামান ডিউক ও যুবলীগের সদর উপজেলা কমিটির সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম। তবে উভয় পক্ষের বিরোধের জেরে সংগঠনের কার্যালয়ও ভাগ হয়ে যায়। মঞ্জুরুল আলম মোহনের অনুসারীরা শহরের রাজাবাজার এলাকায় সংগঠনের মূল কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ রাখলেও ডিউক-আমিনুলের অনুসারীরা মোটর মালিক গ্রুপের কার্যালয় শহরের চারমাথা এলাকায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তর করেন। নিজেদের নেতৃত্ব বহাল রাখার দাবি নিয়ে উভয় পক্ষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। এমনকি দুই পক্ষের কোন্দলের জেরে ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে মাহবুব আলম শাহীন নামে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এক পরিবহন মালিকও খুন হন।

এমন পরিস্থিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে বলা হয়। দায়িত্ব নিয়ে এডিএম সালাউদ্দিন চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি বগুড়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন মোটর মালিক গ্রুপের কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে বাধার মুখে পড়েন। তার ৬ দিনের মাথায় প্রশাসকের পক্ষ থেকে মোটর মালিক গ্রুপের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। তাতে ৩ এপ্রিল ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

তফসিল ঘোষণার প্রায় এক মাস পর মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম মোহন ৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীকে নিয়ে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নিতে যান। তখন প্রতিপক্ষ আমিনুল গ্রুপের অনুসারীরা তাতে বাধা দেন। এ নিয়ে তখন দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে আমিনুল ইসলামের কার্যালয় ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কনস্টেবল রমজান আলী উপর্যপুরি ছুরিকাহত হন। ঘণ্টাব্যাপী ওই সংঘর্ষ চলাকালে ইট-পাটকেলের আঘাতে জিটিভির ক্যামেরাপার্সন রাজু আহমেদসহ ১০ জন আহত হন। পরে পুলিশ রাবার বুলেট ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ১২ জনকে আটক করে।

ওই ঘটনার পর পরই আমিনুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল আলম মোহন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। তিনি বলেন, ‘হামলার সঙ্গে জড়িত মঞ্জুরুল আলম মোহনসহ তার অনুসারীদের গ্রেপ্তার না করলে বগুড়ার পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করবে।’

অন্যদিকে মঞ্জুরুল আলম মোহন পুরো ঘটনার জন্য তার প্রতিপক্ষ আমিনুল ইসলামকে দায়ী করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমিনুল মাইকে ঘোষণা দিয়ে লাঠি-সোটা নিয়ে হামলা চালিয়েছে। তিনি একটি পেট্রোল পাম্প এবং আমার বেশ কয়েকটি গাড়িও ভাংচুর করেছেন।’

বগুড়ায় পুলিশের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, ডিএসবির কনস্টেবল রমজান আলীকে ছুরিকাঘাতকারীকে এরই মধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের অনেকেই ৩টি মামলার কমন আসামি।

মঞ্জুরুল আলম মোহন এবং আমিনুল ইসলামের দায়ের করা মামলার প্রধান আসামীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মোটর মালিক গ্রুপের এক পক্ষের ডাকা কর্মবিরতির কারণে কয়েকটি রুটে বন্ধ হয়ে যাওয়া যান চলাচলের বিষয়ে প্রশাসন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কি’না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবো। আশা করি, তারা জনগণের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তাদের কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিবেন।’