কক্সবাজারে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আবার চাঙ্গা

১২:৩৪ অপরাহ্ন | রবিবার, ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০২১ চট্টগ্রাম
atok

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার সংবাদদাতা: কক্সবাজার জেলায় বিভিন্ন কৌশলে চলছে জমজমাট মাদক ব্যবসা। মাদক ব্যবসায়ীরা প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শহরসহ জেলার সহস্রাধিক স্পট নিয়ন্ত্রণ করে আসছে তারা।

পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসারপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়া বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী কক্সবাজার জেলার সব থানার প্রায় ১,৪০০ পুলিশ সদস্যকে বদলি করার পর ঝিমিয়ে পড়ে অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধ। ফলে কক্সবাজারে দিন দিন বেড়ে চলেছে ইয়াবা ব্যবসায়ীর সংখ্যা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শহরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা ঘরভাড়া নিয়ে গোপনে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে, মটরসাইকেলে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে, স্কুল কলেজের ইউনিফরম পড়ে, পাগল ও ভিখারির বেশে এবং ভ্রাম্যমাণ হকার সেজে অনেক ব্যবসায়ী মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সামগ্রী।

মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজারে ইয়াবা চালান আটকের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ চালান আটক করেছে জেলা পুলিশ। চৌফলদন্ডী ব্রীজ সংলগ্ন হয়ে খালাসের জন্য এই চালানটি কক্সবাজার ৬নং ঘাটে আসছিল। ৬নং ঘাট হয়ে কক্সবাজার শহরেরই এই চালান ছড়িয়ে যেতো। এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন চালানের সাথে আটক দুই পাচারকারী।

এসব কৌশলে নগরীর শতাধিক স্থানে প্রতিদিন মাদক বিকিকিনি হচ্ছে। স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম- শহরের হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, নুনিয়ারছরা, বোদ্ধমন্দির সড়ক, বড় বাজার, পেশকার পাড়া, পাহাড়তলি, ঘোনাপাড়া, সিটি কলেজ, লাইট হাউস, বিডিআর ক্যাম্প, টেকপাড়া, বৈধ্যঘোনার, গোল দিঘীরপাড়, সদরের খরুলিয়া, জানার ঘোনা, মুক্তারকুল, রামু চৌমুহনী, মিঠাছড়িসহ রামু সদরের শতাধিক এলাকা।

তবে পুলিশের খাতায় রয়েছে অর্ধ শতাধিক মাদক বিকিকিনির স্পট। ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা রয়েছে মাত্র ৮৮ জন। কিন্তু কক্সবাজার জেলাজুড়ে ছোট-বড় সহস্রাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবী করেছে। শহরের আলীর জাঁহাল, বাঁচামিয়ার ঘোনা ও সিটি কলেজ এলাকায় পাহাড় দখল করে ঘর তৈরি করে কেউ কেউ ভাড়া নিয়ে কমপক্ষে শতাধিক ঘরে মাদক ব্যবসা চলছে বলে জানা গেছে।

রামু থানা থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে চৌমুহনী ষ্টশনের পাশে রয়েছে ইয়াবা ও বাংলা মদের বিশাল হাট। একটি বিশেষ সূত্রে জানা যায়, আগামী রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে জেলায় অবাধে প্রবেশ করছে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট অনাগ্রা ও ইয়াবা। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও ভারত থেকে অনাগ্রা চোরাই পথে জেলার বিভিন্ন স্থানের মাদকসেবীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষক ও আমদানিকারকরা মাসে কোটি টাকার বাণিজ্য করছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় সদস্য এ সেক্টর থেকে প্রতিমাসে আদায় করছে লাখ লাখ টাকা। আর এভাবেই কক্সবাজার জেলায় ঘটছে মাদকদ্রব্যের প্রসার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার শহরের স্বল্প মূল্যের আবাসিক হোটেল ও কটেজগুলোতে ইয়াবার ব্যবহার বেশি। যুব সমাজও বেশ আসক্ত হয়ে পড়েছে এর প্রতি। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার মাদকসেবীরা নেশা হিসেবে ইয়াবা সেবন করে আসছে বলে জানা গেছে। এখন স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীও নেশায় আসক্ত। নেশাগ্রস্তের তালিকায় এমনকি পুলিশ সদস্য, ডাক্তার, আইনজীবী, সংবাদকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশাজীবী মানুষের নামও রয়েছে। মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলো থেকে এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

কক্সবাজারের সচেতন নাগরিক নেতারা বলছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তাদের কর্মকাণ্ডে মোটেও আন্তরিক নয়। শুধু চাকরি রক্ষার জন্য কতিপয় রুটিন ওয়ার্ক এবং লোক দেখানোর জন্য কিছু মামলা এবং উদ্ধার কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাদের কার্যক্রম। নেশাগ্রস্তদের তালিকা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

তিনি আরোও জানান, মাদক নিরাময়ের জন্য প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের জন্য সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক ব্যবসায়ী জানান, পুলিশের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের মাসোহারা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলেই তারা মাঝে মধ্যে অভিযান চালায়।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সোমেন মণ্ডল প্রতিবেদককে বলেন, মাদক দমনে কক্সবাজারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত এক বছরে এ পর্যন্ত অধিদপ্তরের ১৯০৭টি অভিযান পরিচালনা করেছে।

মামলা হয়েছে ৩৮১টি। আর এতে আসামি করা হয়েছে ৪৫৩ জনকে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪০৭ জনকে। এছাড়া ৫ লাখ ৩৯ হাজার ১শ ২৫ পিস ইয়াবা ও ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫শ ১০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। মাদকবিরোধী এই সাঁড়াশি অভিযান ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে বলে জানান ডিএনসির এই কর্মকর্তা।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বলেন, বিশাল চালান উদ্ধারের আগে থেকেই পুলিশ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নতুন তালিকা করছে। পুরনো তালিকার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন আরও ৮৮ জনের নাম এসেছে। আমরা ইয়াবা চক্রের সবাইকে নজরদারিতে রেখেছি। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।